ঢাকা, শনিবার 7 October 2017, ২২ আশ্বিন ১৪২8, ১৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাদীরবাড়িতে আবারও বেপরোয়া পুলিশের হামলা ॥ সকলকে এক কবরে পুঁতে রাখার হুমকি

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা : মাদরাসা সুপারকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা তুলে না নেয়ায় বাদীর বাড়িতে আবারো হামলা চালানো হয়েছে। শুক্রবার দিনভর মামলার বাদী, সাক্ষী ও স্বজনরা কেউ তাদের বাড়িতে যেতে পারেননি। বাড়িতে গেলে স্থানীয় সরকারদলীয় সন্ত্রাসী ও মামলার বাদী আসামীদের উপর হামলা করতে পারে এমন আশঙ্কায়। 

বৃহষ্পতিবার ভোর সাড়ে তিনটার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কাথন্ডা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তারা বাদীর বেহাইয়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে জানালা ভেঙে তার বেহানকে মারপিট করে এবং ছেলের শ্যালক আল মামুনকে ধরে নিয়ে গেছে। তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ আগে বিক্রি করা ট্রলির এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিতে পারায় তিনজনকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাদেরকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন আল মামুন, সিদ্দিকুর রহমান ও মাওলা বক্স।

কাথন্ডা গ্রামের আব্দুল হান্নান বিশ্বাসের স্ত্রী মোসলেমা খাতুন (৬০) জানান, তার মেয়ে ফাহিমা সুলতানার সঙ্গে একই গ্রামের বজলুর রহমানের ছেলে রাকিবুজ্জামানের ছয় বছর আগে বিয়ে দেয়া হয়। বেহাই বজলুর রহমান তার ভাই কলারোয়া উপজেলার বাকসা হঠাৎগঞ্জ দাখিল মাদরাসার সুপার সাঈদুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা সদর থানার চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা আদালতে মামলা দায়ের করেন। ২০ সেপ্টেম্বর অসলে চেয়ারম্যান ও মজনু চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পুলিশের পক্ষে শহরের আলাউদ্দিন চত্বরে মানববন্ধন করা হয়। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ২১ সেপ্টেম্বর ভোর তিনটার দিকে বজলুর রহমানের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর, মারপিট ও লুটপাট করে সাদা পোশাকের পুলিশ ও অসলে চেয়ারম্যানের লোকজন। এ সময় বেহান মঞ্জুয়ারার বুকে বন্দুক ধরে স্বামী বজলুর রহমানের খবর জানতে চাওয়া হয়। মারপিট করা হয় জামাতা রাকিবুজ্জামানকে। ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মামলা তুলে না নিলে ফল ভাল হবে না বলে তারা হুশিয়ারি দিয়ে যায়।

তিনি আরো জানান, বেহাই বজলুর রহমানকে না পেয়ে সদর থানার উপপরিদর্শক বোরহানউদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ ও অসলে চেয়ারম্যানের ২৫/৩০ জন ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী বৃহষ্পতিবার ভোর তিনটার দিকে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় গ্রাম পুলিশ তরিকুল ইসলাম ও রেজাউল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ছেলে আল মামুন খোকনকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলা হয়। কলাপসিবল গেট খুলে না দেওয়ায় ও খোকনের বিরুদ্ধে কোন গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কিনা জানতে চাওয়ায় মেয়ে ও বৌমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সিঁড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে আল আমিন খোকনকে ঘর থেকে টেনে বার করে। বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের পায়ে ধরলে ছেলে কাথন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র সবুজ হোসেনের বুকে লাথি মারা হয়। তার (মোসলেমা) ডান হাঁটুতে কাঠের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয়। একপর্যায়ে ট্রলী বিক্রির এক লাখ টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানায় পুলিশ।

কাথন্ডা গ্রামের রাকিবুজ্জামান জানান, শ্যালক আল মামুনকে ধরে নিয়ে এসে বৃহষ্পতিবার ভোর সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ ও অসলে চেয়ারম্যানের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা তাদের ও প্রতিবেশি মরহুম নজরুল মাস্টারের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় তারা বাড়ির ফটকে লাথি মারে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার মধ্যে তাদেরকে ভারতে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়। নইলে মাদ্রাসা সুপার সাঈদুর রহমানের কবরে সকলকে একসাথে পুঁতে দেওয়া হবে বলে হুশিয়ারি দেওয়া হয়। এ ছাড়া আল মামুনের মত অনেককেই জেলে পঁচতে হবে বলে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করা হয়।

বজলুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ভাইয়ের হত্যার ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করায় তার বাড়িতে দ্বিতীয় দফায় ও বেহাই এর বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। যে কোন মূল্যে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করাতে বৃহস্পতিবার ভোরে আল মামুনকে আটক করা হয়েছে। বিষয়টি পুলিশ ইনভেসটিগেশান ব্যুরো খুলনার পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হয়েছে।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার সকালে কাথন্ডা গ্রামের গেলে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংসদের সাতক্ষীরা জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসীন কবীরসহ কয়েকজন জানান, পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা যৌথভাবে আব্দুল হান্নান বিশ্বাসের সিঁড়ির পাশের দরজা ভেঙে তার ছেলে আল মামুনকে ধরে নিয়ে গেছে। একই সাথে পুলিশ তাদের গ্রামের ছিদ্দিক সানা ও মোশাররফ হোসেনকে ধরে নিয়ে যায়। গ্রাম পুলিশ তরিকুল ইসলাম ও রেজাউল ইসলাম জানান, পুলিশ তাদেরকে আব্দুল হান্নান বিশ্বাসের বাড়ি চিনিয়ে দিতে বলেছিল।

সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক বোরহানউদ্দিন জানান, তিনি আল মামুনকে ধরে এনেছেন ঠিকই। এর বাইরে কিছু জানতে হলে থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে হবে।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মারুফ আহম্মেদ জানান, পুলিশের বিুরদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হামলা, ভাঙচুর ও মারপিটের অভিযোগ ঠিক নয়। কোন প্রকার টাকা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আল মামুনের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা রয়েছে।

পুলিশ ব্যুরো ইনভেসটিগেশনের খুলনা শাখার পরিদর্শক গোলাম রসুল জানান, বিষয়টি লিখিত আকারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে অবহিত করার জন্য বজলুর রহমানকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ১৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় পুলিশের নির্যাতনে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসধীন অবস্থায় মাদরাসা সুপারের মৃত্যুর ঘটনায় দুইজন এসআইও চোর পুলিশ অফিসারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা করেন নিহতের ভাই। নিহতের বড় ভাই মো: বজলুর রহমান বাদী হয়ে ২০ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা আমলি আদালত (১) এ এই মামলা করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তপূর্বক ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার আসামীরা হলেন- সাতক্ষীরা সদর থানার এসআই আসাদুজ্জামান, এসআই পাইক দেলওয়ার হোসেন, এএসআই শেখ সুমন হাসান ও এএসআই আশরাফুজ্জামানসহ অজ্ঞাত দুই কনস্টেবল।

এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মো: বজলুর রহমান বাদী হয়ে দন্ডবিধি ৩০২/৩৪ ধারায় সাতক্ষীরা আমলি এক নম্বর আদালতে উল্লেখিতদের নামে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। বিচারক হাবিবুল্লাহ মাহমুদ বাদীর অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্তপূর্বক ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন। পিবিআই ইত্যোমধ্যে প্রথম দফায় নিহতের ঘটনার তদন্ত শেষ করেছে। প্রাথমিক তদন্ত,বাদী ও স্বাক্ষীদের সাথে আলাপ কালে পিবিআই ঘটনার সত্যতা পান বলে বাদী পক্ষ জানান। এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর শুক্রুবার রাতে বাদীর বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট করে আসামী পক্ষের লোক জন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ