ঢাকা, সোমবার 9 October 2017, ২৪ আশ্বিন ১৪২8, ১৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘মানুষের চেয়ে নহে কিছু বড় নহে কিছু মহিয়ান’

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ‘বহুগামী’ কদর্থবিশিষ্ট শব্দ। যে বহু জায়গায় গমন করে বা যায়, তাকে বহুগামী বলা হয়। বহুগামিতা আর বহুচারিতা সমার্থক। একটি হার্ড। অন্যটি সফট বলতে পারেন। এ উপমহাদেশ বহুগামীবহুল। এখানকার কোটি কোটি মানুষ ব্যক্তি, বস্তু, শক্তি, জীব-জানোয়ার, পাহাড়-পর্বত, নদীনালা, কল্পনার ভূতপ্রেত প্রভৃতির উপাসনা করে। মূর্তি বানিয়ে কিংবা ছবি এঁকে পুজো করে। এসবের কাছে সাহায্য চায়। অর্ঘ্য নিবেদন করে। এমনকি ক্ষুদ্র প্রাণি বা বস্তুও বাদ যায় না। বহুগামী মানুষ ইঁদুর, ছুঁচো, বানর, পাখি, গাছ, পাথরেরও পুজো করে। বহুগামী উপাসক সাপ-বিচ্ছু, পোকা-মাকড়কেও ছাড় দেয় না। চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, তারা, মেঘ, বৃষ্টি, ঝড়, বাদল সবই বহুগামীর পরম পুজ্য। শুধুকি তাই? নরনারীর বিশেষ স্পর্শকাতর অঙ্গেরও একশ্রেণির মানুষ লাজলজ্জার মাথা খেয়ে প্রকাশ্যে পুজো করে। এর প্রমাণ উপমহাদেশের প্রায় সব জাদুঘর ও অনেক মন্দিরে আজও বিদ্যমান।
বিজ্ঞানের যুগে মানুষের মন-মানসিকতার বহু পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু বহুগামিতার অভিশাপমুক্ত হয়নি মানুষ ও সভ্যতা। বহুতে উপগত হওয়াই কেবল বহুগামিতা নয়। যদিও এটা কদর্থ। এর সদর্থ হচ্ছে বহুতে সমর্পিত হাওয়া। বহুকে পুজ্যরূপে স্বীকার করা। ব্যাপকর্থে এটিও সদর্থ নয়। কদর্থই।
বহুগামিতাকে পুজ্যকর্মরূপে গ্রহণ করায় মানবমর্যাদা যেমন ভূলুন্ঠিত, তেমনই সভ্যতা হয়েছে গভীর তিমিরাচ্ছন্ন। উপাসনার আবরণে বহুগামিতা মানুষকে যেমন নির্জীব ও অকর্মণ্য করেছে, তেমনই হিংস্র আর বর্বর বানিয়েছে।
আল হামদুলিল্লাহ। আশার কথা হলো, কেবলমাত্র ইসলামের মূলবাণী কালেমা তাইয়েবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনও ইলাহ নেই, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর রাসূল’। মহাবিপ্লবের এ অমোঘ মহাবারতা মানবসভ্যতাকে প্রত্যাশা ও প্রকৃত মুক্তির সুবর্ণ পথ দেখিয়েছে। চিরস্থায়ী কল্যাণের পথ বাতলেছে। তবে সব মানুষ এবিষয়ে এখনও পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেনি। সার্বিক কল্যাণের পথে পরিচালিত হতে সক্ষম হয়নি। সিংহভাগ মানুষ এখনও এক ও ঐক্যের কালেমামুখী না হয়ে বহুতে সমর্পিত এবং নিবেদিত। বহুগামিতার মতো মহাপাপ মানবসমাজের এক বিরাট অংশের কাছে উপাসনা হিসেবে গণ্য। অথচ বহুতে আত্মসমর্পণ ও নিবেদন আশরাফুল মাখলুক বা শ্রেষ্ঠসৃষ্টি মানববৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। বহুগামিতার পাপভারে মানবতা আজ বিভ্রান্ত ও বিপন্ন। মানুষ তার উঁচু শির গাছ, পাথর, সাপ, বিচ্ছু, ভূত, প্রেত প্রভৃতির কাছে নত করবে কেন? কোন দুঃখে? তাই এ বহুগামিতার অপরাধ ও অপকর্ম থেকে মানুষকে মুক্ত হতেই হবে। এ ছাড়া মানবসভ্যতার কলঙ্ককালিমা অপসারিত হতে পারে না। মানুষের হৃদয়ের দ্বার উন্মোচিত হতে পারে না। মনের চোখই যদি না খোলে তাহলে এমুক্ত জগতের সৌন্দর্যমহিমা কীভাবে অবলোকন করবে সৃষ্টির সেরা মানুষ?
বহুগামিতা বলতে বিশেষভাবে চরিত্রহীন পুরুষদের বহুনারীর কাছে গমনকেই বোঝায়। সমাজে এমন পুরুষ আছেন অনেক। নারীও আছেন। তবে বহুগামিনীদের প্রতি ঘৃণা বর্ষণ হয় বেশি। যদিও অপরাধ সমান। পুরুষদের অপরাধ অনেকের চোখেই পড়ে না যেন। যতো দোষ কেবল নারীদের। এমন একচোখা নীতির জন্য সমাজে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। নারী ও পুরুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাঁধে।
নারী-পুরুষের বহুগামিতা শুধু নৈতিকতার দিক থেকেই অপরাধ বলে গণ্য নয়, সামাজিকভাবেও একটি জঘন্যতম দোষ মনে করা হয়। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্যগতভাবেও বহুগামিতা গ্রহণীয় নয়। এতে মানুষের দেহে সিফিলিসসহ নানাবিধ যৌনরোগ হয়। এসব রোগের বেশিরভাগই দুর্বিষহ ও দুরারোগ্য। এসব রোগে কেউ আক্রান্ত হয়ে পড়লে তার মৃত্যুঘণ্টা বাজে দ্রুতই।
দৈহিক বহুগামিতার চেয়ে বৈশ্বাসিক বা আধ্যাত্মিক বহুগামিতা আরও ভয়ানক। প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা আবার কী রকম বহুগামিতা? হ্যাঁ, বহু মানুষ আছেন যারা চিন্তা-চেতনা ও মননশীলতায়ও বহুগামী। যেমন: কোনও ব্যক্তি যদি মসজিদে গিয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন আবার বিভিন্ন মাযার, খানকা বা দরগায় গিয়ে যদি সিন্নি দেন কিংবা মোম-আগরবাতি দেন অথবা জ্বালান এবং কল্যাণ প্রত্যাশা করেন তাহলে সেটাও বহুগামিতা। এমন আচরণ বা অভ্যাস বহুগামিতার শামিল এবং কালেমা তাইয়েবার যে স্প্রিট তার ঘোর পরিপন্থী। আল্লাহকে ইলাহ স্বীকার করে আবার মাযার, খানকা বা পীরের দরগায় ধর্ণাপাতাও বহুগামিতা, যা তাওহিদের বিপরীত। দৈহিকের চেয়ে বৈশ্বাসিক বহুগামিতা অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক।
যারা বংশপরম্পরায় বৈশ্বাসিক বহুগামী তাদের কাছে এটা কোনও অপরাধবোধই হয়তো জাগায় না। কিন্তু যারা মুখে কালেমার ধারক আবার কার্যকলাপে বহুগামী তারা আসলে আল্লাহদ্রোহী। যারা জানেই না অন্যের কিছু লুকিয়ে নিলে চুরি হয় এবং কেউ যদি চুরি অপরাধ জেনেও সেটাই করে তাহলে দুজনের অপরাধ সমান বলে গণ্য হবার কথা নয়। ঠিক তেমনই যারা কালেমা বা তাওহিদ কী জানে না এবং যারা কালেমা বিশ্বাস করেছে বা আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়েছে এই দুই শ্রেণির মানুষের কার্যকলাপের মধ্যে যেমন ব্যাপক ফারাক, তেমনই এদের কৃত অপরাধের শাস্তিতেও ফারাক হওয়া যৌক্তিক বৈকি।
যারা অজ্ঞতাবশত কালেমা বা তাওহিদের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত তারা অনেক কিছুকে উপাস্য কল্পনা করে। গাছ, পাথর, পাহাড়, পর্বত, নদ-নদী, পশু-পাখি, সাপ, বিচ্ছু, গ্রহ-নক্ষত্র এমনকি নিজহাতে গড়া বিগ্রহকে পর্যন্ত উপাস্য ভাববার মতো চেতনা পোষণ করে অর্থাৎ বহুজনের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। এ এক বিস্ময়কর বহুগামী মানসিকতা। তবে যারা এক আল্লাহতে ঈমান এনে তাকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে ঘোষণা দেয় তাদের আর বহুগামী হবার সুযোগ নেই।
বহুগামিতা একটি অভিশাপ। দুরারোগ্য কর্কটব্যাধি। এর চিকিৎসা বড় কঠিন। বহুগামিতা মানুষকে একমুখিতা থেকে বহুমুখী করে। বিচিত্র এবং লোভনীয় স্বাদ ও গন্ধে মুগ্ধ করে রাখে, যেগুলোর বেশিরভাগই মেকি। বৈশ্বাসিক ঐক্য বিনষ্ট করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে অমানুষে পরিণত করতেও ছাড়ে না।
সমগ্র ইউনিভার্স বা সৃষ্টিজগত একমুখী বা এক লক্ষ্যে নিমগ্ন। যার যে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যেমন: সূর্য আলো দিচ্ছে।পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। মেঘ থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। এসবের ব্যত্যয় নেই। শুধু ব্যতিক্রম ঘটায় মানুষ। মানুষ তার স্রষ্টাকে পর্যন্ত ভুলে যাবার দুঃসাহস করে। অনেক কিছুকে উপাস্য মনে করে। এই বহুগামিতা প্রকৃত অর্থে শুদ্ধাচারীর কাম্য নয়। এটা হচ্ছে পঙ্কিলতার আধার। বহুগামিতা শুধু ব্যক্তিকেই বিনষ্ট করে না। সমাজ ও জাতিকেও ধ্বংস করে দেয়। সমাজের সর্বত্র ভাঙন সূচিত হয়।কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না।
বৈশ্বাসিক বা বিশ্বাসগত বহুগামিতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসুরের জন্ম দেয়। আলোর উজ্জ্বলতা গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে দেয়। দৈহিক বহুগামিতা থেকে যেমন দেহে দুরারোগ্য নানা ব্যাধি বাসা বাঁধতে পারে, তেমনই বৈশ্বাসিক বহুগামিতাও মানুষের বিশ্বাস তথা ঈমানকে ব্যাধিগ্রস্ত করে ফেলে। এমনকি মানুষের মন তখন মন থাকে না। উন্মন হয়ে যায়। অস্থিরতা গ্রাস করে। নিজের সঙ্গে প্রতারণা করতেও মানুষ দ্বিধাবোধ করে না বহুগামিতার দাপটে। বহুগামিতার আগ্রাসন এমনই বিধ্বংসী যে, নিজেকেও বিশ্বাস করতে পারে না মানুষ।
বিশ্বাসের অশুচিতা বা বিভ্রান্তি মানুষের মনোজগতকে বিপর্যস্ত করে দেয়। বহুগামিতায় নিমগ্ন করে। তাই আগে মানুষের বিশ্বাসের শুচিতা জরুরি। যার বিশ্বাসের শুচিতা নেই, সে মানুষ হিসাবেও পুরোপুরি শুচি হয় না।
মানুষ আশরাফুল মাখলুক। সৃষ্টির সেরা এই মানুষ কেন অন্য সৃষ্টির কাছে তার উঁচু মাথা নিচু করবে? তাও আবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সৃষ্টির সমীপে শির নোয়ানো? কী বিস্ময়কর মানবসত্তার অধঃপতন! মানুষ গাছ, পাথর, পাহাড়, পর্বত, নদী, নিজের গড়া মূর্তি, গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতির সমীপে শির ঝুঁকিয়ে নত হওয়া কেবল অবমাননাই নয়। বহুচারিতা বা বহুগামিতাও। মানুষ যখন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বা বড়ত্ব ভুলে যায় বা বিস্মৃত হয়ে পড়ে তখন সে মানুষ থাকে না। পশুতে পর্যবসিত হয়ে পড়ে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ববোধ জাগিয়ে তোলার জন্য বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাই দ্ব্যর্থহীনভাবে উচ্চারণ করেছেন, ‘মানুষের চেয়ে নহে কিছু বড়, নহে কিছু মহিয়ান।’ অর্থাৎ আল্লাহর পর মানুষই বড়। মানুষই সেরা। আল্লাহ ব্যতীত মানুষ কারুর পদানত হয় না। চির উন্নত শির নোয়ায় না। নোয়াতে পারে না। এ মহান নিষ্ঠা যার নেই সে পরিপূর্ণ মানুষ নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ