ঢাকা, সোমবার 9 October 2017, ২৪ আশ্বিন ১৪২8, ১৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অভিমত

১.
ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকুক
-জসিম উদ্দিন খান
সারা দেশে চলছে ভেজালের মহা উৎসব। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমানো পর্যন্ত চলছে ভেজালের সাথে বসবাস। যার ফলে নানা রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ছে কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে বয়সীরা পর্যন্ত। কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না ভেজাল কারবার। সবধরনের মাছ, মাংস, মুরগি, ডিম, টমেটো, শাক-সবজি, তরিতরকারি, ঘি, মসলা, তেল, মিষ্টি, বিস্কুট, নুডুলস, চিপস, জুস, পাউরুটি, চকলেট, কোমল পানীয়, মিনারেল ওয়াটার, আম, জাম, কাঁঠাল, খেজুর, কিসমিস, সেমাই, কলা, পেঁপে, লিচু, কমলা, আপেল, তরমুজ, আনারস, পেয়ারা, আঙ্গুর ইত্যাদি খাদ্যে ভেজালের রমরমা কারবার। বিষাক্ত খাবার খেয়ে ক্যান্সার, জন্ডিস, ডায়বেটিস, হƒদরোগসহ নানা রোগে ভুগছে সব বয়সী মানুষ। শুধু ফরমালিনই নয়- প্রায় সব খাদ্যেই উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে বাজারজাতকালীন ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানবস্বাস্থ্যের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এছাড়াও এসব পণ্যে উচ্চমাত্রার প্রিজারভেটিভ, ক্ষতিকর কৃত্রিম রঙ, উচ্চমাত্রার ব্যাকটেরিয়া, ঈস্ট ও ও মোল্ডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করে বছরে তিন লক্ষ লোক কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ঘরে ঘরে ওষুধ বাক্স। প্রতিদিন ওষুধ কেনা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ওষুধের দাম বাড়ছে খেয়ালখুশি মত। নজরদারি নেই ওষুধের মান ও বিক্রিতে। ওষুধের দোকানে যখন নকল ও ভেজাল ওষুধ পাওয়া যায় তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জনসাধারণ। আয়ের বড়ো অংশ চিকিৎসা ও ওষুধ খাতে ব্যয় হচ্ছে। ডাক্তার ফি, প্যাথলজি টেস্ট ও ওষুধ কিনতে কিনতে মানুষের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে।
খাদ্য আকর্ষণীয় ফুড কালার ১০-১২টা, ব্যবহার করতে পারব বলা হলেও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ফুড কালারের দোকানে ২শ থেকে ৭ হাজার টাকা কেজি দামের কালার বিক্রি হচ্ছে। ল্যাবরেটরির কেমিক্যাল কিনতে যান, সেখানেও ১টা ৫০০ টাকা তো আরেকটা ৪ হাজার টাকা। কোয়ালিটির ডিফারেন্সটা এভাবেই মেশায়। এগুলো মনিটরিং করতে হবে। ফুড কালার এক অর্থে সবই খারাপ। কিছু কালার রয়েছে সেগুলো অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো অতি মুনাফার জন্য কমদামি রঙগুলো ব্যবহার করছে। যেমন-কাপড়ের রঙ জিলাপিতে মেশানো হচ্ছে। অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোর কোনটাতে কী প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা যাবে, কত পরিমাণে করা যাবে বা অন্য কোনো উপাদান ব্যবহার করা যাবে কিনা সেগুলো সম্পর্কে একটা গাইডলাইন দেয়া আছে। কিন্তু নজরদারির অভাবে সেগুলো যথাযথ পালন করা হচ্ছে না। আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো নির্ধারিত মাত্রার ৩ থেকে ৫গুণ বেশি প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করছে। এটি স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়।
সিটি কর্পোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশানের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়মিত ভেজাল বিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। এ কাজে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, বিএসটিআই, পুলিশ প্রশাসন, র‌্যাব, একযোগে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেজাল পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে চলতি বছরের রমজান মাসে ভেজালবিরোধী অভিযানে অভিজাত এলাকার নামী-দামী হোটেল রেস্তোরাঁ শপিং মলকে নোংরা ও ভেজাল খাবার পরিবেশনের দায়ে জরিমানা করা হয়েছিল। এছাড়াও বাজারে নিম্নমানের ভেজাল ঘি কারখানা বন্ধ ও বিক্রিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। কিন্তু এখন আবারো প্রতিদিন খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযানের কথা পত্রিকা ও মিডিয়াতে প্রতিনিয়ত আসছে। প্রতিনিয়ত ভেজাল তেল, ঘি দিয়ে রান্না করা খাবার খেয়ে জনসাধারণ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মূলত বিয়ে, গায়ে হলুদ, মেহেদী, বৌ-ভাত, ওয়ালিমাসহ নানা রকমের অনুষ্ঠানে ভেজাল ঘি বাবুর্চিদের যোগসাজশে বিক্রি হচ্ছে। নগরীর হোটেল রেস্তোরাঁগুলোতে পিছনের রুম তথা রান্না ঘরগুলোতে একবার ঘুরে আসতে পারলে বুঝা যাবে, আমরা আসলে কী খাচ্ছি।
সমপ্রতি খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি ভেজাল ওষুধ বিরোধী অভিযানের কথাও শোনা যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের এই সাহসী ভেজাল বিরোধী অভিযানের কারণে মানুষের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বেড়েছে সচেতনতা, সজাগ হয়েছে নগরবাসী। এই ভেজালবিরোধী অভিয়ান নিয়মিতভাবে ৬ মাস চলতে থাকলে ভেজাল দ্রব্য বিক্রি বিপণন বন্ধ হয়ে যাবে এবং এই বিষয়ে নগরবাসী সোচ্চার ও সচেতন হয়ে উঠবে।
-লেখক : গীতিকার ও ব্যাংকার

২.
হঠাৎ আলোর ঝলকানি!
-মোহাম্মদ আবু নোমান
‘আইজকা কোনো মাফ নাই। দ্যাখেন না সব বড় বড় স্যারেরা আইসা পড়ছে। দুদকের চেয়ারম্যান স্যার আসছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর গাড়িরেও আইজকা মামলা দিছি। প্রতিদিন তো উল্টো যান, আইজকা একটা মামলা নিয়া যান।’ কথাগুলো পুলিশ কর্মকর্তারা গাড়ি চালকদের দাবড়ে বলছিলেন। হঠাৎ আলোর ঝলকানি, না নাটক? বাংলাদেশের আইন রাস্তার ট্রাফিক লাইটের মতই মাঝে মাঝে কাজ করে। এদেশে আইন তো মাকড়সার জাল, যাতে ছোটরা পরলে আটকে যায়, আর বড়রা পরলে ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়।
কিন্তু বেরসিক পুলিশ কেন বুঝলো না- রং সাইড, মানে উল্টো পথে ফকফকা রাস্তা। শাঁ করে টানে, শাঁই করে চলে যাওয়া। একি ওরা আচানক করেছে? এটা কি তাদের আনকোরা খাসিলত? যা ঢাকার প্রথমসারীর সব পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করা হলো। অথচ এটা কোনো রিপোর্ট হল? বরং ওনাদের গাড়ি যেদিন সিঁধা পথে চলবে সেদিনই রিপোর্ট হওয়ার কথা। মানুষ সোজা পথে চলতে চায় না; আর বাঁকা পথে চলতে বলতে হয় না। সেজন্যই মদ বিক্রেতাকে কারো কাছে যেতে হয় না, আর দুধ বিক্রেতাকে বাজারে ও দ্বারে দ্বারে যেতে হয়।
অবশ্য ইতোমধ্যে পরপর ২ দিন উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে ধরা পড়া পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় সচিবের গাড়ি চালক বাবুল মোল্লাকে চালকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দুবার ধরা পড়ার সময় ওই গাড়িতে ছিলেন স্বয়ং সচিব মাফরুহা সুলতানা। সচিব মহোদয় হয়তো কাজের চাপে, না হয় চোখ বুঝে জাতীর উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা করতে থাকায় বুঝতে পারেননি ডান পাশ উল্টো, নাকি বাম পাশ? এছাড়া হতে পারে, সচিব তাকে সোজা পথে যেতে বলেছেন, চালক অবাধ্য হয়ে উল্টো পথে গেছে! তাহলে সচিবের কথায় ড্রাইভার চলে, না ড্রাইভারের কথায় সচিব? আর না হয়তো ড্রাইভার সচিবকে ভুল তথ্য দিয়েছিল। উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে বলেছিল সে সঠিক দিকে গাড়ি চালাচ্ছে। একজন গাড়ি চালকের কি এতো ক্ষমতা থাকে কর্তার কথা ছাড়া গাড়িটা রং রোডে চালাবে? এখানে চালকের শাস্তি, নাকি আইন দুর্বলের জন্য? যাকে বলে- ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’, বা ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’! এতেই বোঝা যায় দেশের সমস্যা কারা করে?
উল্টো পথে যারা যান, তারা কাজের লোক। সাংঘাতিক জরুরি কাজ মাথায় নিয়ে তাদের চলতে হয়। তারা কোন আমজনতা নয়। নয় রাম-শ্যাম, যদু-মধু! ওরা হলো ‘প্রভু’, আর সাধারণ সবাই যেন ‘দাস’। তা ছাড়া আবুল-বাবুল আর এলিট কি এক পথে চলতে পারে! কিন্তু হঠাৎ করেই নিরস পুলিশ এই আপ-ডাউনের ব্যাপার বেমালুম ভুলে গেল কিভাবে? আর ওনাদের অন্যায়টা কী ছিল? সোজা পথ ছেড়ে উল্টো পথে, এই তো! তাতে হয়েছেটা কী? রসকষহীন পুলিশ কি বুঝেন নি! সোজা পথে গাড়ি চালালে জ্যামে পড়ে থাকতে হয়। আধঘণ্টা, ১ ঘণ্টা; কোনো সময় আধাবেলা। আবুলরা লোকাল বাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাঁদুরঝোলা হয়ে সেদ্ধ হবে এটাই নিয়ম ও নিয়তি। আর ওদের আমজনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উল্টো পথে না গেলে ইজ্জত থাকে নাকি? এসব এলিট শ্রেণিরা বুঝে সাধারণ মানুষের তেমন কাজকর্ম নেই। তারা এই জ্যাম আসলে উপভোগ করে। এই সময়টাতে তারা ঘুমায়। রং-ঢঙের খোয়াব দেখে!
খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের উপস্থিতিতেই পুলিশ এ অভিযান পরিচালনা করে। দুদক চেয়ারম্যান সেখানে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ছিলেন। উল্টো পথে গাড়ি চালানোর অপরাধের জন্য শাস্তি আরোপের ধারা দুর্নীতি দমন আইনে আছে কি? আর এ কাজ কি দুদকের? রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ভুরি-ভুরি কাজের ব্যস্ততা নাই কি দুদকের? তবুও দুদকের প্রতি সমর্থন ও সাধুবাদ থাকলো শত পার্সেন্ট।
তাও আবার ২ ঘন্টার অভিযানে এতো! ৫৭টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা, ৭টি গাড়ির কাছ থেকে রেকার বিল আদায়। যার মধ্যে ৪০টিরও বেশি ছিল সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। জরিমানা করে কি লাভ? তাদের কি টাকার অভাব আছে? এদের কারণেই ঢাকা আজকে বিদেশীদের কাছে যানজটের দুঃসহ নগরী। এদেশে সাধারণ জনগণ যতটা আইন ভঙ্গ করে, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি আইন ভঙ্গ করে আইনের লোকেরাই। উল্টো পথে চলা শাস্তি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিল প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ, পুলিশ, সাংবাদিক, বিচারক ও ব্যবসায়ীদের গাড়ি। মানে আমজনতা বাদে সবাই। এরাই না দেশের হর্তাকর্তা! সরকারি লোক এ দেশের জমিদার। তাদের রুখবে সাধ্য আছে কার! এদের বাদ দিলে রাষ্ট্র থাকে? সরকার থাকে? থাকে না। এরাই দেশ চালায়। এরাই সমাজের মাথা। দেশের মাথা। একেবারে সোজা হিসাব।
যাইহোক, এমন ভিআইপিরা এভাবে আইনের মুখোমুখি হতে হবে এটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অকল্পনীয় ব্যাপার। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে বলতে হয়, তাদের গাড়ি শুধু উল্টোপথে নয়, বরং ওনাদের কর্মজীবনে কি পরিমাণ উল্টোপথে, উল্টাপাল্টা কাজ করেন তা হয়তো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতিষিও বলতে পারবেন না। এ জন্যই আজ আমাদের দেশ-বিদেশে, ঘরে-বাইরে, জলে-স্থলে, অফিস-আদালতে দুর্ভোগ ও দুর্নীতির ধারণা সূচকে বিশ্বের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দুর্ভল রেকর্ড রয়েছে।
এ ছাড়াও ঢাবি, জাবি, জবি, ঢাকা কলেজ প্রভৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গাড়িকে জরিমানা করা হোক। এই ছাত্ররাই বিসিএস দিয়ে বড় বড় পজিশনে যাবে। তখন রং সাইডে গাড়ি চালানোকে তারা ক্রেডিট মনে করবে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের বুঝা উচিত, তারাও আইনের উর্ধ্বে নয়। বৃহত্তর স্বার্থেই এই নষ্ট সংস্কৃতি অবসান ঘটাতে হবে।
আইনী লোকদের বেআইনি কাজ বন্ধ করতে পারলেই দেশ উন্নয়নের পথে যাবে। রাস্তা থেকে অফিস-আদালত; কোর্ট-কাছারি, সবখানে মাথাগুলো রং সাইড থেকে সোজা পথে ঘুরিয়ে দেওয়া দরকার। মাথা ঘুরলে বডি ঘুরবে। এভাবেই যদি আমরা নিজেকে শোধরাই এবং অন্যকে শোধরানোয় উৎসাহিত করি- তাহ’লে দেশটা একটা সোনার দেশে, জাতি একটা সভ্য ও মর্যাদাবান জাতিতে পরিণত হতে বেশী দিন লাগার কথা নয়।
-গীরিধারা, কদমতলী, ঢাকা।
abunoman1972@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ