ঢাকা, সোমবার 9 October 2017, ২৪ আশ্বিন ১৪২8, ১৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিল্প-সহায়ক অবকাঠামো ঢাকার বাইরে বাড়াতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার : অর্থনীতির গতি প্রতিফলিত হয় শিল্প-কারখানার নিয়োগচিত্রে। আর তার স্পন্দন বোঝা যায় চাকরির বাজারে তরুণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিতে। শ্রমঘন শিল্প হিসেবে দেশে পোশাক খাতের পত্তন সত্তরের দশকের শেষভাগে। ঢাকা-চট্টগ্রাম দিয়ে এ শিল্পের যাত্রা হলেও ঢাকায় এর দ্রুত বিস্তার ঘটে। অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে ঢাকায় বিস্তৃত হয় অন্যান্য শিল্পও। এতে শিল্প কর্মসংস্থানে দেখা দেয় স্থানিক নিবিড়তা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশের শিল্প খাতে মোট কর্মসংস্থানের ৪৫ শতাংশই ঢাকায়।

শিল্পে কর্মসংস্থান ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ার মূলে রয়েছে এখানকার শিল্পের অতি ঘনত্ব। বিবিএসের সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে মোট ইকোনমিক ইউনিট রয়েছে ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫৯০টি। এর মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭০৫টি। এ হিসাবে উৎপাদনশীল খাতে দেশের মোট ইউনিটের ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ ঢাকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্প কর্মসংস্থানের কারণে এখানকার পরিবহন ও আবাসন সংকট প্রকট হচ্ছে। মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিরূপ প্রভাব পড়ছে চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। তার পরও গ্যাস-বিদ্যুত্সহ সার্বিক অবকাঠামোর অভাবে ঢাকার বাইরে শিল্প সেভাবে গড়ে উঠছে না। ফলে শিল্প কর্মসংস্থানও ঢাকার বাইরে সেভাবে হচ্ছে না।

এসব প্রতিবন্ধকতার কথা উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও। জানতে চাইলে সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আমাদের শ্রমঘন শিল্পায়নগুলোর বেশির ভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক। বিনিয়োগ যা হয়, তা মূলত ঢাকার মধ্যে সীমিত। ঢাকায় অবকাঠামোর ঘনত্ব এত বেড়েছে যে, এখানে আর শিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ নেই। আবার ঢাকার বাইরে অবকাঠামো ও পরিষেবা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ঢাকার বাইরে শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের গতি বাড়াতে এ স্থানিক নিবিড়তা কাটাতে হবে।

ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগে শিল্পে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তা ঢাকার চেয়ে অনেক কম। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০০৩ ও ২০১৬ পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে ঢাকায় শিল্পে কর্মসংস্থান বেড়েছে বার্ষিক ৮ শতাংশ হারে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে রংপুর। বিভাগটিতে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার বার্ষিক ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া রাজশাহীতে শিল্পে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৩, খুলনায় ৩ দশমিক ৭, চট্টগ্রামে ৩ দশিমক ৩, সিলেটে ২ দশমিক ৬ ও বরিশালে মাত্র ১ শতাংশ।

ঢাকার বাইরে শিল্পসহায়ক অবকাঠামো নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এ অবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ দেখছেন না বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি কামরান টি চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমান যুগে আমাদের শিল্পগুলো গ্যাসভিত্তিক হয়ে গেছে। শুরু থেকে গ্যাস-বিদ্যুত্ বা অন্যান্য অবকাঠামো সুবিধা ঢাকার বাইরেও যদি নিশ্চিত করা যেত, তাহলে সারা দেশেই শিল্পায়নও ছড়িয়ে পড়ত।

শিল্পে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক শিল্প। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) হিসাবে, দেশের ১৩টি জেলায় পোশাক কারখানা রয়েছে মোট ৪ হাজার ৭৯৩টি। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪৪ লাখ মানুষের। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারাখানা রয়েছে ৩ হাজার ৯৩৩টি। পোশাক শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, শুধু ঢাকাতেই এক হাজারেরও বেশি কারখানা গড়ে উঠেছে।

 পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে যে অঞ্চলগুলোয় শিল্প-কারখানা বেশি, তা পুরোপুরি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়নি, এটা ঠিক। সরকারের অঞ্চলভিত্তিক শিল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তবে ধীরগতিতে এগোচ্ছি। এটাও ঠিক যে, খুব দ্রুত চলতে গেলে হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিকল্পিত শিল্পায়নে শিল্পোদ্যোক্তারা বরাবরই আগ্রহী।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশে সক্রিয় ওষুধ শিল্প রয়েছে ২০০-এর কিছু বেশি। এ খাতের বড় কারখানাগুলোর বেশির ভাগই ঢাকা বিভাগের মধ্যে। শিল্পে কর্মসংস্থানে ঢাকার প্রাধান্যে এটাও ভূমিকা রাখছে।

জানতে চাইলে ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির মহাসচিব শফিউজ্জামান বলেন, ঢাকার পার্শ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জে ভবিষ্যতে যে শিল্প স্থানান্তর হবে তা পরিকল্পিত। তার পরও আমি মনে করি, শিল্প গড়ে তুলতে যে অবকাঠামো প্রয়োজন, তা দেশের সব স্থানে একই রকম হলে শিল্পায়নও সুষম হবে। যে সুবিধা ঢাকায় পাওয়া যায়, তা অন্য স্থানে পেলে উদ্যোক্তা সেখানে না যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

সারা দেশে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ১ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানেরও বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। শিল্পটির ঢাককেন্দ্রিকতা দীর্ঘদিন থাকবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফিনিশ্ড লেদার, লেদারগুডস এন্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আবু তাহের। তিনি বলেন, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন কারখানারও ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। সেজন্য ঢাকার বাইরে অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো নৈতির কাজ বেসরকারি খাতের একার নয়। 

শিল্পে আঞ্চলিক ঘনত্ব একপর্যায়ে বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বলে জানান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী। তিনি বলেন, শুরুর দিকটায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানিসহ বিভিন্ন সুবিধার সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু পরিকল্পিত না হওয়ায় একপর্যায়ে এ ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে বৈষম্যও বাড়ায়। আবার নতুন কোনো স্থানে শিল্পকে টেকসই করাটাও সময়সাপেক্ষ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এলাকাভিত্তিক সুষম শিল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা জরুরি, যার জন্য প্রয়োজন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সঠিক নীতি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ