ঢাকা, সোমবার 9 October 2017, ২৪ আশ্বিন ১৪২8, ১৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগ চাই

মোঃ আঃ ওয়াহেদ : প্রাকৃতিক সম্পদ এই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্ব উপাদান। পৃথিবীর কোন দেশ পৃথিবীর সম্পদে সমৃদ্ধশালী। আবার অনেক দেশ সেই সম্পদ বঞ্চিত। যে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত উৎস আছে যে দেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধশালী। প্রাকৃতিক সম্পদকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে লাগিয়ে অনেক দেশ উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় দেশে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে না।
তবে যে কয়েকটি সম্পদ কাজে লাগিয়েছে সেগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, ভূমি এবং মাটির উর্বরা শক্তি, নদনদী, কৃষি সম্পদ, বনজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ ও মৎস্য সম্পদ ইত্যাদি আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ।
খনিজ সম্পদেও আমাদের বাংলাদেশে কম সমৃদ্ধ নয়। বাংলাদেশের খনিজের মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসই প্রধান। মোট সঞ্চিত গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ১১.১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এছাড়াও বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণ চুনাপাথর, নুড়ি পাথর ও কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর পরিমাণ লবণ তৈরি হয়। যার দ্বারা দেশের সম্পূর্ণ চাহিদা মিটছে। এতদ্ব্যতীত বাংলাদেশের সিলেটের হরিপুরসহ তেল প্রাপ্তির সম্ভাবনাও প্রচুর। খনিজ সম্পদ একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়নে খনিজ সম্পদের অবদান সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশে একমাত্র প্রাকৃতিক ছাড়া তেমন কোন উল্লেখযোগ্য খনিজ সম্পদ আজও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। প্রাকৃতিক গ্যাস ছাড়া আরও যে সমস্ত খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে চুনাপাথর, নুড়ি পাথর, কয়লা উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া সামান্য পরিমাণ কঠিন শিলা, সিলিকা বালু, চীনামাটি ইত্যাদিও আবিষ্কৃত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, বাংলাদেশের উপকূলে প্রচুর পরিমাণ তেল খনিজ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজশাহী, বগুড়া ও সিলেটে বিটুমিন লিজানাইট কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে। এ সমস্ত উন্নতমানের কয়লা রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পত্নীতলা, বগুড়ার জামালগঞ্জ ও সিলেটের লালহাট, লামাকাঠ ও টেকেরহাট নামক স্থানে পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, এ সমস্ত কয়লা উত্তোলন করতে পারলে বাংলাদেশ প্রায় ২ শতক ব্যবহার করতে পারবে।
বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে নিকৃষ্টমানের পিটকয়লাও রয়েছে। এগুলো ফরিদপুর বাসিয়া ও চান্দাবিল, খুলনার কোলাবিল ও সিলেটের কোন কোন অঞ্চলে বিস্তৃত রয়েছে। সম্প্রতি দিনাজপুরে কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ খনিজ তেল রয়েছে। ১৯৮২ সালে সিলেটের হরিপুরে দৈনিক ৬০০ ব্যারেল তেল উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি খনিজ রয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে হলো খনিজ সম্পদ। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত মোট ১৩টি গ্যাস ক্ষেত্রে প্রায় ১১.১ ট্রিলিয়ন কিউসেক ফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সিলেটে ৬টি, কুমিল্লায় ২, নোয়াখালী ২, চট্টগ্রামে ১, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১ ও ঢাকায় একটি। এসব গ্যাস ক্ষেত্রের মধ্যে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, মোমেনশাহী, জামালপুরের মধ্যে তিতাস, ঢাকার শিল্প ও গৃহস্থালী।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা, কৈলাসটিলা হতে সিলেট চট্টগ্রামে সরবরাহ করা হয়। ধাতব খনিজ সম্পদ বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত না পেলেও রাজশাহী, দিনাজপুর, কক্সবাজারে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অধাতব খনিজ সম্পদ অর্থাৎ চুনা পাথর বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সিলেটের টেকেরহাট ও জাফলং এলাকায় প্রায় ৫ কোটি, বগুড়া জামালগঞ্জ ও জয়পুরহাটে প্রায় ১০ কোটি, চট্টগ্রামে সেন্টমার্টিনে ১০ কোটি, সীতাকুণ্ডে ১৮, চুনাপাথর আবিষ্কৃত হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে চুনাপাথরের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে সিমেন্ট কারখানা, রাসায়নিক শিল্প, কাগজ প্রভৃতি শিল্প গড়তে উঠতে পারে। চীনামাটি রাজশাহীর পত্নীতলা এবং ময়মনসিংহের বিজয়পুরে সন্ধান পাওয়া গেছে। বিজয়পুরে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টন চীনা মাটির সন্ধান পাওয়া গেছে। দেশের চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি এখান থেকে উত্তোলন করা সম্ভব।
সিলিকা বালি সিলেটের শাহাজিবাজার, কুলাউড়া, নয়াবাজার, চট্টগ্রামের দোহাজারী, শেরপুরের বালীজুরী, কর্ণঝোরা, তাওয়াকুচা এবং ঝিনাইগাতির গারো পাড়া ও কুমিল্লার বাতিশ এলাকার সিলিকা বালি প্রচুর পরিমাণ পাওয়া গেছে। এই বালি দ্বারা কাচ নির্মাণ, রাসায়নিক দ্রব্য, রং, ইট তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কঠিন শিলা রংপুরের লাল পুকুর ও দিনাজপুরের মধ্যে পাওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদেশিক সহযোগিতায় রাণীপুকুর লোকার কঠিন শিলা উত্তোলনের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। প্রায় ১৭ লাখ টন শিলা উত্তোলন করা সম্ভব। এ শিলা দিয়ে রাস্তাঘাট, রেলপথ ও বাধ নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নুড়িপাথর, সিলেটের ভোলাগঞ্জ ও লুবা, রংপুরের পাটগ্রাম, শেরপুরের শ্রীবরদী থানার কর্ণঝোরা, বাট্টাজোর, পানবর, মালাকুচা, ঝিনাইগাতি থানার সন্ধাকুড়া, হলদিবাটায় প্রচুর নুড়ি পাথর পাওয়া যায়। এসব নুড়ি পাথর সড়কপথ, রেলপথ, সেতু, কালভার্ট, নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
শেরপুরের গারো পাহাড়ে প্রচুর নুড়ি পাথর থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে সরকার কোটি কোটি টাকার আয় বঞ্চিত হচ্ছে।
১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জামালপুর-রাংটিয়া রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও এরশাদ সরকার ক্ষমতায় এসে উক্ত কাজ বন্ধ করে দেয়। জামালপুর-রাংটিয়া রেলপথ নির্মিত হলে নুড়ি পাথরকে কাজে লাগানো সহজ হতো। এদিকে পাথর সংগ্রহের নামে ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চলে আসছে। পাথর সংগ্রহকারী স্থানীয় প্রশাসন থেকে নামে মাত্র লীজ নিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টন সিএফটি পাথর উত্তোলন করছে। এক মাত্র যোগাযোগের কারণে সরকার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এসব প্রাকৃতিক সম্পদকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারলে দেশ উন্নয়নের শিকড়ে পৌঁছবে বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ