ঢাকা, সোমবার 9 October 2017, ২৪ আশ্বিন ১৪২8, ১৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দিশেহারা কৃষক

এম এস শহিদ : দু’দফা বন্যায় দেশের বেশির ভাগ জেলা বিশেষ করে উত্তরের জেলাগুলোতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় আর্থিকভাবে নিঃস্ব কৃষকরা। বন্যা পরবর্তী ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য নতুন করে জমিতে রোপণের জন্য আমন চারার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। চাষের জন্য যে চারা পাওয়া যাচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল এবং  তার দাম স্বাভাবিকের চেয়ে তিন চারগুণ বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকে এখন সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই ঘুরে দাড়ানো চেষ্টা করছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বেশিরভাগ কৃষকের পক্ষেই চড়া মূল্যে নতুন করে চারা কিনে আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। চারা-বীজের জন্য কৃষকদের মাঝে এক ধরণের হাহাকার বিরাজ করছে। তাই কি করবেন কৃষক, ভেবে কূল পাচ্ছে না। এদিকে সরকারিভাবে কৃষকদের কৃষি ত্রাণ হিসেবে আমনের চারা, দানাদার শস্যের বীজ ও সার বিতরনের কথা ঘোষণা করা হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের হাতে এখনো সেগুলো যথেষ্ট পৌঁছায়নি। অথচ কৃষক বন্যা পরবর্তি ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য এখনো সরকারের কাছ থেকে যদি সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় সাহায্য পাই তাহলে জমিতে পরা পলির স্তরের সদ্ব্যবহার করে শীতকালীন সবজি, রবি শস্য ও আমনের বাম্পার ফলন করতে পারে। কৃষকের এ আশা দিনে দিনে দুরাশায় পরিণত হচ্ছে। যদিও গতো ২০ আগষ্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনাজপুরের বন্যাদূগর্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের সময় বলেছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা দেয়া হবে এবং পরবর্তি ফসল না ওঠা পর্যন্ত সরকারি সাহায্য অব্যাহত থাকবে। এদিকে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধরী বলেছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলায়গুলোতে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২০১ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে ৫৮ কোটি ৭৭ লাখ ১৯ হাজার ৩১৫ টাকা প্রণোদনা হিসেবে সার ও বীজ দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বন্যায় দেশের ৩১ উপজেলায় ৬ লাখ ২৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এসব কৃষকের দুর্দশা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার ১৭৭ কোটি টাকার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।
এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ২ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ফসল। এজন্য সরকার আগামী বোরো মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রতি বিঘা জমির জন্য পাঁচ কেজি করে বীজ বিতরণ করবে। এছাড়া কৃষকের সুবিধার্থে বন্যা দূর্গত এলাকায় কৃষিঋণ আদায় বন্ধ এভং সুদ মওকুফ করা হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধরী বলেন, গম,ভূট্টা, সরিষা,খেসারি, গ্রীস্মকালীন মুগ, গ্রীষ্মকালীন তিল, মাষকালাই, চিনাবাদাম, বেগুনের বীজ ও সার বিনামূল্যে কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হবে। এক বিঘা জমি চাষের জন্য প্রত্যেক কৃষকের এসব বীজ ও সার দেয়া হবে। এছাড়া দেশের ৬৪ জেলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদেরও প্রয়োজনীয় সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। এক তথ্যে জানা গেছে, এবারের বন্যায় উত্তরের জেলাগুলোতে ফসলের বিশেষ করে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বন্যায় সময় রোপা আমনের মৌসুম চলছিল। বেশির ভাগ জমির ধানের চারা বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যা শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে এসব চারা জমিতে রোপন করা হয়েছিল। রংপুর, লালমনিহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, পঞ্চগড়, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, ও দিনাজপুর, জেলায় বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া জমির চারা পচে কালো হয়ে গেছে। কৃষকেরা জানিয়েছেন, যারা বন্যার আগে জমিতে চারা লাগিয়ে এক দফা সার দিয়েছিলেন, তাদের জমির পুরো চারাই পচে গেছে। যারা সার দেননি এবং যেসব জমির  পানি দ্রুত নেমে গেছে, সে সব জমিতে কিছু চারা নষ্ট হয়ে যায়নি। সরকারি তথ্যমতে বন্যার পানিতে ৪০ জেলায় ৬ লাখ ৫২ হাজার ৬৫৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। কুষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল এবার প্রতি হেক্টর জমিতে সাড়ে তিন টন চাল উৎপাদনের। সেই হিসেবে বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি অনাবাদি থাকলে এবার আমন মৌসুমে চাল উৎপাদন ২৩ লাখ টন হ্রাস পাবে। খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলাগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম একটি।
এবার এ জেলায় ৩৪ হাজার ৯ শত ২৭ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েগেছে। এক সপ্তাহ বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় জমিতে রোপন করা প্রায় সব চারা পচে গেছে  এবং সেই সাথে ৫০০ হেক্টর জমির বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এ সময় সেখানে রোপা আমনের জমিগুলে সবুজে ভরে থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখন সেখানে মাঠের পর মাঠ হলুদ বিবর্ণ হয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষক মশিউর রহমান জানান, উচুঁ জমিতে লাগানো কিছু চারা রক্ষা পেলেও ওইসব চারা আকাশ ছোঁয়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে চারা কিনে জমিতে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। কুড়িগ্রাম কৃষিবিভাগ তথ্য মতে, এ বৎসর এ জেলায় ৮৮ হাজার ৪৩০ হেক্টর রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এক মাসের ব্যবধানে দু’দফা বন্যায় রোপা আমনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কৃষি বিভাগ রোপা আমনের ক্ষতি নিরুপন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা আশ্বাস দিলেও অনেক কৃষকের আভিযোগ সংশ্লিষ্ট কৃর্তপক্ষের কাছ থেকে তারা আশানারুপ সহযোগিতা পচ্ছে না। ফলে অনেকে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে নিজ উদ্যোগে মাঠে রোপা আমনের চাষ শুরু করেছে। কেউ কেউ আবার সরকারি সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে আছেন। কৃষক মশিউর রহমান জানান, বন্যার আগে ধার দেনা করে কৃষক চাষাবাদের জন্য চারা ও সার ক্রয় করে। তাদের আশা ছিল এবারে চাষাবাদের মাধ্যমে রোপা আমন মৌসুমে প্রচুর ফসল ঘরে তুলবে। কিন্তু বন্যার ফলে কৃষকের সে আশা ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন কি করবেন ভেবে তারা দিশেহারা। অপরদিকে চারা সংকট এবং দাম আকাশ ছোঁয়া হওয়ায় গরিব কৃষকদের পক্ষে চারা কিনে জমিতে লাগানোও সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা। কুড়িগ্রাম সদরের ভোগডাঙ্গার চিকলির বিলের কৃষক হামিদ আলি দুঃখ করে বলেন, ধার দেনা করে-১১ একর জমিতে তিনি রোপা আমনের চারা রোপণ করেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারিভাবে এখনো তারা সাহায্য সহযোগিতা পাননি। কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো: মকবুল হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত তারা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৭০০ জন কৃষকের রোপা আমনের চারা ও ২০০ জনকে নাভিজাত চারা বিতরণ করেছেন। অথচ বন্যায় প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দশ হাজার কৃষক। রংপুর দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে তারাগঞ্জের কলাপাড়া গ্রামের আবদুল ছলেক জানান জমিতে রোপণের জন্য কয়েক দিন ধরে অনেক খুঁজে চড়ামূল্যে তিনি কিছু চারা ক্রয় করেছেন। তিনি বলেন, তাবাগঞ্জ উপজেলায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে পানি সরে গেছে। এরপরই কৃষকরা জমিতে নতুন করে চারা রোপণ শুরু করেছে। তাবে অনেকে জমিতে রোপণ করার জন্য পর্যাপ্ত চারা পাচ্ছেন না। পার্শ¦বর্তী মধুরামপুর গ্রামের চাষী আফজাল হোসেন ও দুলাল হোসেন বলেন, এক বিঘা জমির চারা কিনতে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাক লাগছে। বন্যার আগে এক বিঘা জমির চারা কিনতে তাদের খরচ পড়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। কৃষকরা আক্ষেপের সাথে জানান, চাষাবাদের জন্য তারা এখনো সরকারিভাবে কোনো সাহায্য পাননি। লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাটের চর শিবের কুটি গ্রামের কৃষক শাহ জামাল ও পূর্ব পাড়ের আব্দুর রশিদ বলেন, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য তারা সরকারি-বেসরকারি কোনো তরফ থেকেই কৃষি সহায়তা পাননি।
কেবল রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও লালমনিহাট নয়-সারাদেশেরই একই চিত্র। কৃষি সম্প্রসারণ আধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো: গোলাম মারুফ বলেন, আপাতত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের প্রণোদনা হিসেবে সার ও বীজ দেয়া হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেরার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরও বীজ ও সার দেয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারি সহায়তা হিসেবে দেয়া সার ও বীজের মাধ্যমে কৃষক বন্যায় পর জমিতে পরা পলির সদ্ব্যবহার করে দ্বিগুণ ফসল ফলাতে পারবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সার ও বীজ কেনার জন্য কৃষক প্রাতি ১১শ’ টাকার কিছু বেশি দেয়া হবে। তবে এ অর্থ সার ও বীজ কেনার জন্য যথেষ্ট কিনা জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো: গোলাম মারুফ বলেন, এটা যথেষ্ট নয়, তবে এ দুঃসময়ে এ অর্থ কৃষকদের উপকারে আসবে। তিনি আরও জানান অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের বীজ দেয়া হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পরামর্শ ও সুদমুক্ত ঋণ দেয়া হচ্ছে। সেইসাথে বন্যাকবিলত কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা হিসেবে সার ও চারা সরবরাহ করা হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যে সাহায্য সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এবারের বন্যায় দেশের অধিকাংশ জেলার ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে এবারের রোপা আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তা পূরণ হবে না। ফলশ্রুতিতে দেশে চালের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং চালের দাম বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে। সরকার যদি এ ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহলে দেশের কৃষক তথা জনগণের দুর্দশা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে অনেকেরই অভিমত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ