ঢাকা, সোমবার 9 October 2017, ২৪ আশ্বিন ১৪২8, ১৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘রাজগঞ্জ বে-সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ সংস্থা’র কার্যক্রম

নিছার উদ্দীন খান আযম, মণিরামপুর (যশোর) সংবাদদাতা : যশোরের মণিরামপুরে ‘রাজগঞ্জ বে-সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ সংস্থা’ যেন দেশের আরেক শিক্ষা বোর্ড-এমনটিই মনে করেন অনেকে। ৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত শিক্ষা বোর্ডের আদলে এই সংস্থায় রয়েছে একজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তক সম্পাদক। সরকারি কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও একমাত্র পাবলিক পরীক্ষা ছাড়া বাকি সকল পরীক্ষা সংস্থার সরবরাহকৃত অভিন্ন প্রশ্নপত্রে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ। নি¤œমানের গাইড নিয়ে প্রকাশনী সংস্থার কাছ থেকে নেয়া হয় লাখ লাখ টাকা। কিন্তু সংস্থার সব কিছু নিয়স্ত্রণ করেন গুটি কয়েক কথিত শিক্ষক নেতারা। তার এহেন কর্মকান্ডে ফুঁসে উঠেছেন সংস্থাধীন সিংহভাগ শিক্ষক।
প্রকাশনীর কাছ থেকে নেয়া এ অর্থ, প্রশ্নপত্র বিক্রিকৃত অর্থই হচ্ছে সংস্থার মূল অর্থের উৎস বলে জানাগেছে। সংস্থাটি সমাজ সেবা অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশনভুক্ত হলেও গত ৫ বছর ওই অধিদপ্তরের অনুমোদনহীন কমিটি ছাড়াই গুটি কয়েক শিক্ষক নেতা নামধারি নিয়ন্ত্রণে চলছে সকল কার্যক্রম-অভিযোগ একাধিক শিক্ষকের। ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণকারি ওই শিক্ষকরা ‘সেভেন ষ্টার’ গ্রুপ নামে পরিচিত পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংস্থার একাধিক সাবেক ও বর্তমান সদস্য। সংস্থার গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে সংস্থাটির নামে রাজগঞ্জ গ্রামীন ব্যাংক শাখায় কল্যাণ তহবিল, সাধারণ তহবিল, পারিতোষিক তহবিল ও ফিক্সড ডিপোজিট নামে ৪ টি এ্যাকাউন্টে পরিচালিত লাখ লাখ টাকা বাকী সদস্যদের অন্ধকারে রেখে এই সেভেন ষ্টার গ্রুপের সদস্যরাই নিয়ন্ত্রণ করেন। সংস্থার কোন সদস্য হিসাব চাইতে গেলেই তাকে সংস্থা থেকে বহিস্কারের হুমকি দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, এই ৪ এ্যাকাউন্টে প্রায় কোটি টাকা রয়েছে।
সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি উপজেলার পলাশী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক আনছার আলী ক্ষোভের সাথে জানান, তারা কয়েকজন শিক্ষক মিলে ওই অঞ্চলের মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-বর্মচারীদের কল্যাণে ১৯৯৪ সালে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সমাজ সেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনভুক্ত হয়। যার নিবন্ধন নং-১৩১৫/০৮।
উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ সংস্থাটির কার্যকরী পরিষদের মেয়াদ ২০১৩ সালের ১৫ জুন শেষ হলেও সংস্থার কমিটির কথিত নির্বাচন দেখিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পুনরায় অনুমোদন চেয়ে একই সালের ১৭ জুন আবেদন করা হয়। এরই আলোকে উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার সরদার তারিকুল ইসলাম ( বর্তমান অন্যত্রে বদলী) অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কাছে পত্র প্রেরণ করেন। যার স্মারক নং-৪১.০১.৪১৬১.০০০.১৬.০০৮.১৪.৪০৩ এবং তারিখ ১১/০৮/২০০১৪ ইং। কিন্তু অদ্যাবধি কোন অনুমোদন আর মেলেনি। উপ-পরিচালকের কার্যালয়েও খোঁজ নিয়ে অনুমোদন না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংস্থার সদস্য শহীদ স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম, মাতৃমঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজুর রহমান, গোপিকান্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দীনসহ একাধিক শিক্ষক জানান, সংস্থার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান, ইউনুস আলম, নির্মল সরকার, পরিতোষ সরকার, শওকত হোসেন, ফজলুর রহমান, খোরশেদ আলমসহ ৭ শিক্ষক নেতা নামধারীরা মিলে কথিত কমিটি বানিয়ে সংস্থার নাম ভাঙ্গিয়ে বই প্রকাশনী সংস্থার কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে লুটপাট করে চলেছে। আর সংস্থার সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের গাইড নিতে বাধ্য করা হয়। অন্যথায় দেয়া হয় সংস্থা থেকে বহিস্কারের হুমকি। সংস্থার যে গঠনতন্ত্র রয়েছে তা অনেকাংশে দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক বলেও অনেকেই মনে করেন।
সংস্থার গঠনতন্ত্রের ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ’ ১০ এর ক-তে বলা হয়েছে সংস্থাধীন সকল বিদ্যালয়ে সংস্থার নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যক্রম অনুসরন করিবে ও সংস্থার প্রস্তুতকৃত প্রশ্নপত্রে সকল পরীক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে, খ-তে বলা হয়েছে সংস্থার নির্ধারিত হারে বেতনাদি ও পরীক্ষার ফি ধার্য্য করিবে,গ-তে বলা হয়েছে সংস্থার নির্ধারিত সময়সূচী ও ছুটির তালিকা অনুসরণ করিবে। গঠনতন্ত্রের  ‘অর্থনৈতিক কাঠামো ’ অনুচ্ছেদ-৮ এর খ-তে বলা হয়েছে সংস্থার পক্ষ থেকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করিয়া সংস্থাধীন সকল বিদ্যালয়ে নির্ধারিত হারে বিক্রয় করিয়া লভ্যাংশ গ্রহণ করা, গ-তে বলা হয়েছে পুস্তক বিক্রেতা সমিতির যে কোন  প্রকাশকের পুস্তকাদি সংস্থাধীন সকল বিদ্যালয়ে নির্ধারণ করা ও প্রকাশক প্রদত্ত অর্থ গ্রহণ করা। গঠনতন্ত্রের কার্যনির্বাহী পরিষদের অনুচ্ছেদে সভাপতি-সম্পাদক কোষাধ্যক্ষসহ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তক সম্পাদকের পদও রাখা হয়েছে। সংস্থাধীন সকল বিদ্যালয়ে সংস্থার সরবরাহকৃত অভিন্ন পরীক্ষা নেয়ার দায়িত্ব পালন করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানের নিজ শিক্ষকদের প্রণয়নকৃত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহনের সরকারি কঠোর নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয়নি। গত ৬ সেপ্টেম্বর জেএসসি’র মডেল টেস্ট পরীক্ষাও সংস্থার সরবরাহকৃত অভিন্ন প্রশ্নপত্রে নেয়া হচ্ছিল। এ নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার কঠোরভাবে নিষেধ করলেও তা উপেক্ষা করে পরীক্ষা নেবার সময় উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে প্রতিবছর প্রকাশনীর কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে নি¤œমানের গাইড চালানো হয় সংস্থাধীন ৪২টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে। সংস্থাধীন শৈলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, নিম্নমানের গাইড বিদ্যালয়ে পড়াতে বাধ্য করেছে সংস্থার কথিত ওই শিক্ষক নেতারা। অথচ এর বিপরীতে কতটাকা তহবিলে জমা হয়েছে-তা বাকিদের অন্ধকারেই রাখা হয়েছে। হিসাব চাইতে গেলেই তেড়ে আসেন ওই কথিত শিক্ষক নেতারা। এসব অনিয়ম মানতে না পেরে অনেকেই ওই সংস্থা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। এদের মধ্যে শ্যামকুড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাদের, মুড়োগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান মিঠু অভিযোগ করে বলেন, সংস্থাটি চলছে পুরো অনিয়মতান্ত্রিক  ও কথিত শিক্ষক নেতা নামধারীদের দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে। যে কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় নিয়ে তারা সরে এসেছেন। এসব বিষয় জানতে সংস্থার নিয়ন্ত্রক ও সেভেন ষ্টার গ্রুপের প্রভাবশালী সদস্য হাজরাকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান জানান, সংস্থায় কি হলো, সেটা তাদের  অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, এ ব্যাপারে কাউকে জবাবদিতে বাধ্য নই। অপর এক প্রশ্নের  জবাবে কমিটির অনুমোদন না থাকলে কি হাওয়ায় চলে?-এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। জানতে চাইলে উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মেহেদী হাসান বলেন, তিনি সদ্য যোগদান করেছেন-এমন কিছু থাকলে তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আকরাম হোসেন খান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জানতে চাইলে যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাধব চন্দ্র রুদ্র বলেন, সরকারি নির্দেশনার বাইরে কোন প্রতিষ্ঠান চলার চেষ্টা করলে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ