ঢাকা, সোমবার 9 October 2017, ২৪ আশ্বিন ১৪২8, ১৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মহানন্দার পাথরে পঞ্চগড়ের মানুষের ভাগ্য খুলেছে

মহানন্দার তীরে চলছে পাথর উত্তোলন এবং মেশিনে ব্যবহারের উপযোগী করার প্রক্রিয়া

ইবরাহীম খলিল, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে ফিরে : দেশের সবচেয়ে উত্তরে জেলা পঞ্চগড়কে বলা হয় হিমালয় কন্যা। কয়েক বছর আগেও এই জেলার মানুষের জীবন কাটতো অর্ধাহারে অনাহারে। কিন্তু মহানন্দা নদীর পাথর উত্তোলন আর সমতল ভূমির চা চাষ বদলে দিয়েছে তাদের জীবন মান। তবে ভারত থেকে বয়ে আসা মহানন্দা নদীর পাথর এই অঞ্চলের মানুষকে বিনা পূঁজিতে কোটি কোটি টাকা আয় করার সুযোগ করে দিয়েছে। কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছলতা এনে দিয়েছে লাখ লাখ পরিবারের। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে এসব পরিবারের তাকিয়ে থাকতে হয় মহানন্দার দিকে। মহানন্দার পাথর তুলে যে আয় হয় তা দিয়েই চলে জীবনের চাকা।  
২ অক্টোবর  সোমবার। সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। তবুও থেমে নেই মহানন্দা পাড়ের মানুষের কর্মব্যস্ততা। পাথর নিয়ে কর্মযজ্ঞ। নদী থেকে দল বেঁধে পাথর তোলা। নদীর পাড়েই কিংবা মহাসড়কের পাশে এমনকি বাড়ির আঙ্গিনায়  মেশিন দিয়ে পাথর ভাঙ্গানো চলছে। এর পাশেই রাস্তার দুই ধারে সারি সারি ট্রাক দাড়িয়ে আছে পাথর নিয়ে দেশের  বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাওয়ার জন্য।
পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে এশিয়ান হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটে চলছে তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা স্থল বন্দরের দিকে। জগদলপুর পার হতেই রাস্তার পাশে বাড়ির উঠানে দেখা গেল পাথরের স্তুপ। পাশেই পাথর ভাঙ্গার মেশিন। এরপর যতই সামনের দিকে গাড়ি এগুচ্ছে রাস্তার দুই পাশের প্রতিটি বাড়ির উঠানে দেখা মিলছে পাথরের স্তুপ আর পাথর ভাঙ্গার মেশিন। এই অবস্থা দেখা গেল বাংলাবান্ধা বন্দর পর্যন্ত ১৫/২০ কিলোমিটার জুড়ে। বিশেষ করে জৈনপুরের পর থেকে মহাসড়কের দুইপাশে শত শত  ট্রাকের সারি চোখে পড়লো। গাড়িতে থাকা স্থানীয় লোকজন জানালেন এসব ট্রাক দিয়েই ভাঙ্গানো পাথর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
 মহানন্দা নদী সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার মহালিদ্রাম পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিবঙ্গের উত্তরাংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় ভারতে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা থেকে শুরু করে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার দুদেশের সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে মহানন্দা। মূলত এই অংশটুকুর মধ্যেই পাথর উত্তোলন করা হয়।
পঞ্চগড় জেলার ওয়েব সাইটের তথ্য অনুযায়ী মহানন্দায় ২০টি পাথর মহাল রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল মহানন্দায় শত শত স্থানে শ্রমিকরা পাথর উত্তোলন করছে। এর কোন নীতিমালা নাই। মূলনীতি না থাকার কারণ সম্পর্কে জেলার একজন উর্ধ্বতন  কর্মকর্তা জানালেন, ভারত থেকে পাথর আসে। এই পাথর না উত্তোলন করলে আবার ভারতে চলে যাবে। সুতরাং তা যতোই তোলা যায় ততোই লাভ। এখানে কড়াকড়ি আরোপের দরকার নাই।
তেঁতুলিয়ার লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মহানন্দা নদীর বাংলাদেশের যে অংশটুকুর মধ্যে পাথর উত্তোলন করা হয় এর এক পাশে তেঁতুলিয়া অন্য পাশে ভারতের হাতিয়া গছ ও শিলিগুড়ি। নদীটির উজানে ভারতের ফুলবাড়িতে রয়েছে স্লুইসগেইট। ভারত এই স্লুইস গেইট বন্ধ রাখে আবার কখনও খুলে দেয়। খুলে দিলেই পানির স্রোতের সঙ্গে  ভেসে আসে বিভিন্ন আকৃতির পাথর। সেই পাথরেই জীবিকা তেঁতুলিয়াসহ পঞ্চগড়ের অধিকাংশ মানুষের। বর্তমানে এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষও। কর্মের সন্ধানে পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুর, জয়পুরহাটের অনেক মানুষ এখানে প্রতিদিন ভীড় জমায়।
মহানন্দা থেকে প্রতিদিন কি পরিমাণ পাথর উত্তোলন করা হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও এখান থেকে সারাদেশে হাজার হাজার টন পাথর চলে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বলা হয়ে থাকে দেশের ৭০ ভাগ পাথরের যোগান দেওয়া হয় পঞ্চগড় থেকে।      
 কথা হয় এলাকার তিরনই বাজারের ব্যবসায়ী খলিলুর রহমানের সঙ্গে, ময়মনসিংহ এলাকা থেকে স্বাধীনতার আগে সেখানে গিয়েছেন। তিনি যখন সেখানে যান তখন পঞ্চগড়ের এই অঞ্চল ছিল বন আর জঙ্গল। এখানাকার মানুষ রীতিমত বন্য জীবন যাপন করতো। তরকারী রান্না করতে জানতো না। আগুনে পুড়িয়ে মাছ খেয়ে  ফেলতো। কিন্তু এই এলাকার পাথর তাদের জীবনমান পাল্টে দিয়েছে।
তিনি আরও জানালেন, এই এলাকাায় পাথর রয়েছে তা অনেক আগে থেকেই জানতো মানুষ। কিন্তু এই পাথরের দাম ছিল না। এখন এই পাথরের দাম বেড়ে যাওয়ায় এলাকার মানুষের ভাগ্য বদলে গেছে। এখন পঞ্চগড়ের কোন পরিবারে  অভাব অনটন নাই। কারণ প্রতিটি পরিবারের লোকজন পাথর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাতে রোজগারও প্রচুর। কেউ  মহানন্দা থেকে পাথর তুলছেন। কেউ আবার নদীরঘাট থেকে পাথর কিনে এনে মেশিনের কাছে দিচ্ছেন। আবার কেউ  মেশিন চালিয়ে রোজগার করছেন। এমনকি ট্রাকে পাথর লোড আন লোড করেও অনেকে টাকা কামাচ্ছেন। এর বাইরে অনেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে পাথর সরবরাহ করছেন। 
একই এলাকার বাসিন্দা হামিদুল হক জানালেন, মহানন্দাতে একজন শ্রমিক দুই আড়াই ঘন্টা পাথর উত্তোলন করলেই তার উপার্জন হাজার বারোশ টাকা হয়ে যায়। আর একজন নারী পাথরের মেশিনে কাজ করলেও দিনে তিন শ’ টাকা হাজিরা পান। তাহলে তাদের অভাব থাকার কথা না।
কথা হয় সাদিকুল ইসলাম নামের একজন পাথর উত্তোলনকারীর সঙ্গে। তিনি জানালেন পঞ্চগড়ের মানুষ কেউ যদি বলে যে তার পকেটে টাকা নাই তাহলে আমি বলবো সে বিশ্ব অলস। তাকে বিশ্ব অলস প্রতিযোগিতায় নিয়ে যেতে হবে। কারণ এখানে হাত বাড়ালেই টাকা। হাত নাড়ালেই টাকা। তার কথা হলো- বাজারে গিয়ে দেখেন সব চেয়ে দামি জিনিসটা এখানকার শ্রমিকরা খেতে পারে। কারণ তাদের প্রতিদিনই উপার্জন আছে এবং ভাল পরিমাণ টাকা পকেটে আসে। আজ  বৃষ্টির মধ্যে মাত্র আড়াই ঘন্টা পাথর তুললাম পকেটে  সাড়ে ১২ শ’ টাকা আসলো।
আবুল হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, এলাকার প্রতিটি পরিবারেরই পাথর ভাঙ্গার মেশিন রয়েছে। একেকটি মেশিনের দাম আড়াই লাখ টাকা। এই মেশিন ভাড়া দিয়েই প্রতিদিন উপার্জন হয় এক হাজার টাকা। আর কিছু না থাকলেও একটা মেশিনে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা উপার্জন হয়।
বৃষ্টিতে ভিজেই মেশিনে পাথর জোগান দিচ্ছিলেন রিতা নামের এক নারী। তিনি জানালেন, ৪ ঘন্টা পাথর জোগান দিয়েই তিনি ৩০০ টাকা পাবেন। তবে পুরুষের তুলনায় তাদের টাকা কম দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। আর নারীদের দিয়ে কম টাকায় কাজ করানো যায় বলেই মেশিনে নারীদের দিয়ে কাজ করানো হয় বলেও জানালেন এলাকার লোকজন। এলাকার লোকজন বলছেন, তেতুলিয়া এলাকার প্রতিটি পরিবারের পুরুষরা নদী থেকে পাথর উত্তোলন করে টাকা রোজগার করেন। আর নারীরা মেশিনের কাজ করে টাকা উপার্জন করেন।
পরিসংখ্যান বলছে, তেঁতুলিয়ায় উপজেলার জনসংখ্যা এক লাখ ত্রিশ হাজারের কিছু বেশি। ২৪৮টি গ্রামে বসবাসকারী প্রায় সব পরিবারের নারী পুরুষ বৃদ্ধ শিশু সবাই পাথরের মাধ্যমে জোরগারের সঙ্গে জড়িত। এর পাশাপশি প্রতিদিন আরও ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ পঞ্চগড় জেলা এবং পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে তেঁতুলিয়াতে আসেন কর্ম কিংবা ব্যবসায়িক কাজে।
পাথরে দেড় লাখ পরিবারের কর্মসংস্থান হয়। মূলত তিন ভাবে কর্মসংস্থান হয়। প্রথমত কিছু মানুষ নদী থেকে পাথর উত্তোলন করে। এরপর ব্যবসায়ীরা রাস্তার পাশে নিয়ে এসে মেশিনের মাধ্যমে ব্যবহারের উপযোগী করে  তোলে। এরপর তারা বড় বড় কোম্পানি কিংবা পার্টির কাছে বিক্রি করে দেয়। এর মাঝখানে নারীরা পাথর ভাঙ্গানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে। এতে কর্মসংস্থান হচ্ছে হাজার হাজার নারীর। স্থানীয়রা যেমন কাজ করছে তাদেও পাশাপাশি এই জেলার বাইরে থেকে এসেও কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। লাগে লোডার আন লোডার। এই পাথরের ব্যবসা করে পঞ্চগড়ের খেতে না পাওয়া মানুষ এখন এক্স-করল্লা গাড়ি হাকাচ্ছে।
 তেঁতুলিয়া উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, পাথর উত্তোলনের প্রধান উৎস হচ্ছে মহানন্দা নদী। এই নদী ভারত থেকে এসে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আবার ভারতে চলে গেছে। এই নদী দিয়েই মূলত পাথর বাংলাদেশে আসে। এই পাথর থেকেই সিংহভাগ আয় হচ্ছে এখানকার মানুষের। এই পাথর উত্তোলন না করলে ভারতে চলে যাবে। সুতরাং পাথর উত্তোলন থেকে আয় পুরোটাই মূলত বোনাস আয়ের মতো।
এছাড়া ভৌগলিকভাবেই হিমালয় কন্যা পঞ্চগড়ের মাটির নিচে পাথর রয়েছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রাতের আধারে ড্রেজার দিয়ে মাটি খুঁড়ে পাথর উত্তোলন করে থাকেন। এতে এখানকার ভূমির ক্ষতি সাধন হয়। অবশ্য কেউ কেউ এই খনন করা ভূমিতে মাছ চাষ করে থাকে। খনন করা জমি ভরাট করে  কেউ কেউ চায়ের বাগান করে ফেলেন। কিন্তু এই মাটির ওপর অত্যাচারের কারণে অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। ভূমিকম্প হলে এই মাটি দেবে যাবে। ফলে এই মাটিতে আর কোন ফসল ফলানো সম্ভব হবে না। প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রতি বছর ২ শ’ হেক্টর জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ড্রেজার ব্যবহারের কারণে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ