ঢাকা, সোমবার 9 October 2017, ২৪ আশ্বিন ১৪২8, ১৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজশাহীতে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই বাড়ছে ॥ জনমনে আতঙ্ক

রাজশাহী অফিস : পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিচয়ে দিয়ে ছিনতাই বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম উৎকণ্ঠায় পড়েছেন রাজশাহীর মানুষ। দিনদুপুরে তল্লাশির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিচ্ছে এসব ভুয়া ডিবি সদস্য। নগরীতে একের পর এক এমন ঘটনা ঘটলেও এসব ভুয়া পুলিশের নাগাল পাচ্ছে না আসল পুলিশ। এতে নগরবাসীর উৎকণ্ঠা আরো বাড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর ছিঁচকে ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি সম্ভ্রান্ত পরিবারের কিছু সন্তানও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এদের বাবাদের মধ্যে কেউ শিক্ষক, কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কেউ বড় ব্যবসায়ী অথবা কেউ সরকারি চাকরিজীবী। এসব ছিনতাইকারীরা নিজেরাও শিক্ষিত। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা। মূলত তারাই ডিবি পুলিশের পরিচয়ে ছিনতাই করছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের আটক করতে না পারায় থামছে না ছিনতাইয়ের ঘটনা। ফলে প্রায় প্রতিদিনই নগরীতে ছোট-বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আবার ভুক্তভোগিরা অভিযোগ করছেন, ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে থানায় গেলেও তারা খুব একটা সুফল পাচ্ছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সপ্তাহে রাজশাহীতে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্য পরিচয়ে তিনদিনের ব্যবধানে একটি মোটরসাইকেলসহ ২২ লাখ ১০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। পর পর একই কায়দায় তিনটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে ডিবি পুলিশ আতঙ্ক। তাছাড়া পাড়া-মহল্লার ছিচকে ছিনতাইকারীদের আতঙ্ক তো রয়েছেই। জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর মতিহার থানার বাইপাস সড়কে মাহেন্দ্রা এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ডিবি পুলিশের পোশাক পরে এবং আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে তল্লাশির নামে গাড়ি থামিয়ে একটি মিলের সাড়ে ১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় গত শুক্রবার থানায় মামলা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার দুপুরে একই কায়দায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তল্লাশির নামে নগরীর রানীবাজার এলাকায় এক নারীর ভ্যানেটি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় দুই ছিনতাইকারী। ওই ব্যাগে ছিল ফেরদৌসি বেগম নামে ওই নারীর ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। টাকা নিয়ে পায়ে হেঁটেই ব্যাংকে যাচ্ছিলেন ওই নারী। স্থানীয় একটি দোকানের বাইরে লাগানো সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এক ছিনতাইকারীকে ফেরদৌসি বেগমের টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত তাকে ধরতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনার দু’দিন আগে গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে জেলার পবা উপজেলার কসবা এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে শরিফুল ইসলাম রাজিব নামে এক ব্যবসায়ীর মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এদের হাতেও ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। ছিনতাইকারীরা মোটর সাইকেলের গতিরোধ করে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে রাজিবের কাছে কাগজপত্র দেখতে চায়। এছাড়া শরীর তল্লাশি করবে বলে ওই ব্যবসায়ীকে মোটরসাইকেল থেকে নামতে বলে। তিনি নামলেই অস্ত্র দেখিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এদিকে গত বুধবার রাতে নগরীর ভেড়িপাড়া মোড়ে সাদ ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল সেট ছিনতাই করা হয়। এ ঘটনায় সাদ ইসলাম রাজপাড়া থানায় মামলা করতে গেলেও তা নেয়া হয়নি। সাদ জানান, পুলিশ মামলা না নিয়ে শুধু একটি জিডি করেছে। এর আগে নগরীর সিপাইপাড়া এলাকায় এক নারীর পথরোধ করে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল। রত্না দে ভট্টাচার্য নামের ওই নারীর কাছ থেকে ছিনতাইকারীরা ১০ হাজার টাকাসহ স্বর্ণের গহনা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। রত্মা সিপাইপাড়া এলাকায় অবস্থিত মাদার বখস কেজি স্কুলের শিক্ষিকা। এ ঘটনায় রত্মা দে থানায় মামলা করলেও তার টাকা ও গহনা উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এছাড়া গত জুলাইয়ে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে নগরীর ডাবতলা এলাকায় রুহুল আমিন নয়ন নামে গোদাগাড়ীর এক গরু ব্যবসায়ীর মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেয়া হয় ২০ লাখ টাকা। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে একই কায়দায় নগরীর দুই সতীনের মোড় এলাকায় আবদুল হালিম নামে এক মোটরসাইকেল চালকের মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করা হয়। এসব টাকা ও মোবাইলও উদ্ধার হয়নি।
অস্ত্র হাতে অভিনব কৌশলে এসব ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন রাজশাহীর মানুষ। উদ্বিগ্ন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও। তারা বলছেন, এসব ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্তে নেমে প্রায় ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়েও ছিনতাই করে থাকে। এদের কয়েকজন কারাগারে আছে। বাকিরা বাইরে। তাদের নজরদারি করা হচ্ছে। অভিনব পন্থায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় নগরীতে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলেও বাহিনীটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো এখন মহানগর পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। ছিনতাইকারীদের দাপট রুখতে নগরীতে স্থায়ী চেকপোস্টের পাশাপাশি আরো অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এছাড়া নগরীর সব থানা পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ