ঢাকা, মঙ্গলবার 10 October 2017, ২৫ আশ্বিন ১৪২8, ১৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রচলিত শিক্ষার ত্রুটি, কুফল ও প্রভাব এবং ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্যতা

রোকসানা আক্তার মোহনা : জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্যে ক্রমবর্ধমার ও অগ্রসরমান পৃথিবীর অন্য পৃষ্ঠে তাককালে দেখা যায় রিক্তহস্ত এক পৃথিবীকে এ রিক্ততা মানবতা-মনুষ্যতে¦র, সততা- সহনুভূতির, কোমলতা আর উদারতার। আরো ভালো বলতে গেলে জ্যোতির্ময় এক আলোর। যে আলোয় একদিন আলোকিত হয়েছিল প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য। আজ সে আলোকেই স্তিমিত করার চেষ্টা পৃথিবীর তাবৎ শক্তিধারীর। একটি জাতির বিকাশ ও টিকে থাকা নির্ভর করে তাদের জ্ঞানগত উৎকর্ষতার উপরে। আর একটি সুন্দর ও সঠিক আর্দশ শিক্ষা ব্যবস্থাই তার মাধ্যম। শিক্ষা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে। মূলত শিক্ষার মাধ্যমেই সমাজ তার সমগ্র উন্নতি এবং প্রবৃদ্ধি সাধন করতে পারে। বলা হয় পৃথিবীতে যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। কোন জাতিই শিক্ষা ছাড়া তাদের ভাগ্যেন্নয়ন  করতে পারে না।
প্রবাদে আছে : “তুমি যদি স্বল্পতম সময়ে ফল পেতে চাও তাহলে মৌসুমী ফসলের চাষ কর, তবে ফসল পাব একবার আর যদি ১০ বছর ধরে ফল লাভ করতে চাও তাহলে চাষ কর ফলদার বৃক্ষের। আর তুমি যদি শতাব্দীকাল ধরে ফল পেতে চাও, তাহলে মানুষ চাষ করা।”
আর উক্ত প্রবাদে বাক্যের আলোকে মানুষের চাষ মানে হল প্রকৃত শিক্ষার ব্যবস্থার প্রবর্তন। কারণ শিক্ষার হলো একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। যার উদ্দেশ্য এমন সব মানুষ তৈরি করা যারা ডিনজ আকিদা ধ্যান- ধারনা ও আদর্শের আলোকে একটি সক্রিয় সংস্কৃতি তৈরী করবে। আর সে সংস্কৃতির আলোকে একটি আদর্শ জাতি তৈরীতে সক্ষম হবে।
জ্ঞানীরা যথার্থই বলেছেন, “যদি কোন জাতির ধ্বংস করতে চাও তাহলে সে জাতির গ্রন্থাগার গুলোকে ধ্বংস করো। ফলে সে জাতির শিক্ষা লাভ হতে বঞ্চিত হবে এবং মেরুদন্ডহীন মানুষের মত শিক্ষার অভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।”
আর আল্লামা ইকবালের ভাষায়, “জ্ঞান বলতে আমি ইন্দ্রিয়ানুভূতি ভিত্তিক জ্ঞানকে বুঝি। জ্ঞান প্রদান করে শক্তি আর এ শক্তি দ্বীনের অধিন হওয়া উচিত। কারণ তা যদি দ্বীনের অধিন না হয় তবে তা হবে নির্ভেজাল পৈশাতিক। এর বিপরীত হল্ইে অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ হলেই তার সুন্দর প্রয়াসী প্রভাব পড়তে বাধ্য গোটা জাতির মন-মানসিকতার আচার -আচরণের এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতি।
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা : পৃথিবীর আকাশ থেকে ইসলাম নামক সৌভাগ্য সূর্য্য যখন অস্তমিত হলো তখন এমন একটি শাসকগোষ্ঠি বিজয়ী শক্তির আসনে অধিষ্ঠিত হলো দুনিয়ার জীবনই যাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ভোগ- বিলাসিতাই যাদের উন্নতির মূলকথা। ইতিহাস থেকে প্রমাণিত বিজয়ী শক্তির আদর্শ, ভাব, ভাষা, কৃষ্টি, সভ্যতা ও ঐতিহ্য পরাজিত শক্তির উপর যুগে যুগে দেয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতার পলাশী ট্রাজেডির মাধ্যমে মুসলিম শাসনের শোচনীয় পরাজয় হয়। ক্ষমতায় আসে ব্রিটিশরা। এর সাথেই সেদিন এ উপমহাদেশের সভ্যতা, ভাষা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার ভাগ্য নির্ধারন হয়ে যায়। উর্দু ও ফরাসী ভাষার পরিবর্তে ইংরেজীকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় পরিণত করা হয়। শিক্ষার বিষয় বস্তুকেও ইংরেজরা তাদের সভ্যতা ও আদর্শের ছাঁচে ঢালাই করে নেয়।
এর প্রবর্তক লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে এ শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ মালার ভূমিকায় বলেন, “আমরা অবশ্যই এমন একটি জাতি গঠন করব যারা রক্ত ও বর্ণে হবে ভারতীয় কিন্তু চিন্তা, নীতি ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ”
এই মূলনীতির আলোকে রচিত শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই ছিল রাজ্য শাসন বিস্তার ও নিজেদের চিন্তা -চেতনার উপযোগী লোক তৈরী। ফলে আমাদের দেশ থেকেই তৈরি হচ্ছিল ব্রিটিশ শাসন, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি অনুগত মানুষ। সেদিন বাংলাদেশ ছিল উপমহাদেশের ক্ষুদ্র দেশ। অথচ আমরা সেই বিদেশী শক্তির দাসত্বের মন-মানসিকতার ও গোলামী চেতনা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি আজও।
আমাদের দেশে মূলত দু‘ধরনের শিক্ষার ব্যবস্থা চালু ছিল এবং বর্তমানে আরো দু‘ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। যথা :
(র) সাধারণ শিক্ষা।
(রর) মাদ্রাসা শিক্ষা।
(ররর) ইংলিশ মিডিয়াম।
(রা) কারিগরি শিক্ষা।
প্রচলিত শিক্ষার ব্যবস্থার ত্রুটি সমূহ : প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই শিক্ষিত হয়ে অনেক মেধাবীরা দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে সত্য কিন্তু বেশ কিছু ত্রুটির কারণে জাতির সামগ্রিকভাবে শিক্ষার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ত্রুটি গুলোই আমাদের মেধাকে সঠিক ভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ দিচ্ছে না। যার কারণে আমাদের শিক্ষা দীক্ষার জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার গতি এখনো খুবই ধীর। এ শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক ত্রুটিগুলো পরিলক্ষিত হয়।
আল্লাহ বিমুখ শিক্ষা ব্যবস্থা
- মেরুদন্ডহীন, অসৎ শিক্ষার ব্যবস্থা।
- নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে ব্যর্থতা।
- প্রকৃত মেধার অবমূল্যায়ন।
- কোরআন-হাদিস বিমুখ শিক্ষা ব্যবস্থা।
- প্রশ্ন ফাঁস ও অসদুপায় অবলম্বনে পূর্ণ স্বাধীনতা।
- মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বৈষম্য।
- নৈতিকতা বিধ্বংসী শিক্ষা ব্যবস্থা।
- পর্দাহীন শিক্ষা ব্যবস্থা।
- জীবন-পদ্ধতি সম্পকে নির্দেশনা বর্জিত শিক্ষা।
- নেতৃত্ব ও দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে ব্যর্থতা।
- অপরাধনীতির লেজুর বিশিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থা।
- ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা।
- ভর্তি বাণিজ্য।
- জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টিতে ব্যর্থতা।
- দুর্নীতির প্রসার।
- কর্মহীন শিক্ষা ব্যবস্থা।
বর্তমানে প্রচলিত বস্তুবাদী শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত আমাদেরকে নৈতিকতাহীন করে ধর্মনিরপেক্ষতার দিকেই ধাবিত করছে।
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কুফল ও প্রভাব : মানুষের জ্ঞানগত পরিধি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সমস্যা ততই জটিল হতে জটিলতার হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বস্তুগত অগ্রগতি যত বেশি লাভ করছে, নিজ নতুন, কামনা-বাসনা নতুন নতুন সমস্যা ও জটিলতা এবং নানারূপ নৈরাশ্য ও বঞ্চনার হাহাকার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অপ্রিয় হলেও বাস্তব যে বর্তমানে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সভ্য সমাজেই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অপরাধের হার বেড়েই চলেছে। কেন না উন্নতির সোপান হিসেবে বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবার ব্যবস্থা নেই।
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কুফল ও তার প্রভাব আলোচিত হলো :
মনুষ্যত্বের বিনাশ : প্রচালিত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মানব সত্ত্বার চরম উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। এই কাজ করার ব্যপারে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা আজ ব্যর্থ। অস্থিরতার এই ক্লান্তি লগ্নে যখন আমরা চারদিকে পৃষ্টি দেই, তখন দেখি যেন অন্ধকারের এক অর্থে সমুদ্র সর্বদিক থেকে আমাদের ঘিরে রেখেছে।
যুব সমাজ ধ্বংস হচ্ছে : প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে যুব সমাজ ধ্বংস হচ্ছে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করার পরও অত্যন্ত সাধারণ অনেক বিষয়ে কোন রকম জ্ঞান অর্জন করা আমাদের হয় না। সর্ব পর্যায়ে মুখস্ত বিদ্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু টেকনিক্যাল ও লজিক্যাল বিদ্যা গুরুত্ব পাচ্ছে না কারণ পাঠ্য সুচীকে এমন ভাবে গঠন করা হয়েছে গৎবাঁধা মুখস্ত না করলে কোন ভাবেই ভাল ফলাফল করা সম্ভব না।
আবার গত কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি এক প্রকার open secret-এ রূপ নিয়েছে।
বিষয়টিও ভয়াবহ এক সংস্কৃতি যুক্ত হয়েছে। পরীক্ষার সময় টার্গেট নির্ধারণ করে দেয়া হয়, যাতে কেউ  পরীক্ষায় ফেল না করে। আর সমাপনী পরীক্ষায় নাকি এমনও নির্দেশ দেওয়া থাকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারুক বা না পারুক বা সেভাবেই হোক লিখিয়ে শতভাগ পাস নিশ্চিত করতে হবে। এমন অবস্থা সে পরীক্ষার  খাতায় পাস মার্ক না ওঠলে সেখানে খাতা মূল্যায়ন কারীরাই লিখে পাস মার্ক দিতে হবে। এবিষয়টি P.S.C,J.S.C, S.S.C ও  H.S.C পরীক্ষায় পাসের হার বাড়িয়ে দিলেও প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মান বেড়েছে এ কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। কেননা, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায় “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অংশ গ্রহণকারী GPA-5 প্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ৮০% ছাত্র-ছাত্রীই ন্যূনতম পাস মার্ক পায়নি এ চিত্র কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রেই নয় মেডিক্যাল, বুয়েট থেকে শুরু করে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই অতিরঞ্জিত গ্রেড নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়া দূরে থাকুক পাস পর্যন্ত করতে পারে না তখন তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। শুধু শিক্ষার হার বাড়লেও কমছে শিক্ষার মান।
মূল্যবোধের অবক্ষয় : প্রচলিত শিক্ষার অর্জন করে এমন আয় কেউ মূল্যবোধ অর্জন করতে পারছে না যদিও শিক্ষায় মূল উদ্দেশ্য মূল্যবোধ সৃষ্টি করা। পৃথিবীর অগ্রযাত্রার সাথে সাথে মানুষের প্রতি মানুষের মূল্যবোধ কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের মায়া মমতা, মহব্বত ইত্যাদি। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে ক্রমশই বাড়ছে সমাজ মূল্যবোধ অবক্ষয়।
নৈতিকতার অধঃপতন : বর্তমান পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতার বদলে অনৈতিক শিক্ষা দেয়া, ইতিহাসকে বার বার বদলে দেয়া, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ বিনষ্ট করার মাধ্যমে এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভুল পথেই বেশি নেয়া হচ্ছে যার ভয়াবহ চিত্র আজ সমাজে আমরা দেখতে পাচ্ছি। শুধু নৈতিক অধঃপতন-ই নয় শিক্ষার মানও কমে যাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ফলে আকাশ সংস্কৃতিতে ছেঁয়ে গেছে গোটা বিশ্ব প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে না পারায় মানুষ তাদের নিজস্ব আচার আচরণ রীতি-নীতি ভুলে পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে প্রবেশ করছে।সুশিক্ষার অভাবে মানুষ শিক্ষা অর্জন করে কিছু শিখতে পারছে না। যা দেখছে সেটাই গ্রহণ করছে। ভাল মন্দের পার্থক্য তাদের বিচার-বিবেচনার বাইরে।
প্রকৃত মেধার অবমূল্যায়ন : প্রকৃত শিক্ষা অর্জন না করায়, অর্থাৎ বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে পাস করা হচ্ছে। যেমন নকল করে, পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন ফাঁস, রাজনৈতিক ক্ষমতা, শিক্ষকদের দুর্বলতা, প্রশাসনিক দুর্নীতির ইত্যাদির কারণে আজ প্রকৃত মেধাবী মুখ বাছাই করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে এবং আসলে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন করা হচ্ছে না যার ফলে দেশ ও জাতির উন্নতির পথে চরম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ইসলামী জ্ঞানের ক্রমশ হ্রাস : বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় নীতি-নৈতিকতা ঈমান আকীদা আমল ইত্যাদি বিবর্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা। যদিও ধর্ম শিক্ষা নামে মাত্র দেয়া হয় তাও সঠিক নয় ভ্রান্ত দিনে দিনে ইসলামী শিক্ষার ক্রমশ হ্রাসই হচ্ছে। যার ফলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি হচ্ছে। মনুষ্যত্ববোধ কমে যাচ্ছে। নীতি নৈতিকতা বলতে সমাজে কিছু থাকছে না।
এছাড়াও প্রচলিত শিক্ষার ফলে প্রযুক্তি অপব্যবহার বাড়ছে, প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয় হচ্ছে, সামাজিক অসচেতনতা, অনৈতিক ভাবে ধনবান, যুব সমাজের অবক্ষয় ইত্যাদি প্রভাব বিস্তার লাভ করছে।
মনুষত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষ নামের প্রকৃত স্বার্থকতা আয় মনুষত্বের বিকল্প সাধনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হচ্ছে শিক্ষা। তাই একটি জাতির উথান- পতনের অনেকটাই নির্ভর করে সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থার উপর। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি পূর্ণভাবে জাতির মধ্যে মানবতার উৎকর্ষ সাধন করতে পারে তাবেই সম্ভব একটি আদর্শ জাতি তথা আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করা কিন্তু আজ অন্যায় অনাচার, অনৈতিকতার সয়লাবে ভেসে যাওয়া এই সমাজের চিত্র এ কথা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রচালিত বস্তুগত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মানব সত্ত্বার দুটি দিকের একটি অর্থাৎ জৈবিক সত্ত্বাকে উন্নত করতে পারলেও মানব সত্ত্বার মূল যে নৈতিক সত্ত্বার চরম উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের উন্নয়ন, এই কাজটি করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।”
ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্যতা : “Islam is complete code of life” অর্থাৎ ইসলাম হল পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম। ইসলাম মানুষকে সত্যের সন্ধান দেয়, মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা আলোকে চিনতে সাহায্য করে। সঠিক ও সাফল্যের পথে চলতে সহায়তা করে।
আল্লাহর প্রিয় বান্দা, সমাজের বাঞ্ছিত ও দক্ষ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য যা যা দরকার তার সব কিছুর ব্যবস্থাই ইসলামে বিদ্যমান। মোট কথ মানব জীবনের ও মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন সুবিধার ও ন্যায় নীতি ভিত্তিক শান্তি শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রগতিশীল সমাজ গঠিন ও সংরক্ষণে ইসলামের বিকল্প নেই।
মহান আল্লাহর ঘোষণা “হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় করার মত ভয় কর এবং পুরোপুরি মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (আল- ইমরান : ১০২)
একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে জীবনযাপন করতে হলে,ইসলামের শিক্ষা অনুসরন করে বিশ্বভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সাম্য, উদার মানবতাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে চলতে হয়। ইসলামের শিক্ষানুযায়ী চলতে হলে ইসলাম বিষয়ক জ্ঞানার্জন এবং ইসলাম শিক্ষা বিষয়ক অধ্যয়ন করা প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত আবশ্যক। সর্বপ্রথম নবী হয়রত আদম (আ:) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স:) পর্যন্ত মানুষের হিদায়াতের জন্য যত নবী রাসুল এসেছেন, তারা সবাই ইসলামের সুন্দর ও শাশ্বত শিক্ষা প্রচার করেছেন। ইসলামের মৌলিক ও প্রাথমিক বিষয়গুলি জানা এবং সে অনুযায়ী চলা ফেরা আইন।বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা ফরযে কিফায়া।
ইসলাম শিক্ষার গুরত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিম্নে বিশ্লেষণ করা হলো : ইসলামী শিক্ষা অর্জন করা ফরযে আইন : ইসলামের আকিদা বিশ্বাস এবং ইবাদত করতে ন্যূনতম যতটুকু প্রয়োজন
ততটুকু ইসলাম শিক্ষা অর্জন করা ফরযে আইন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমাদের সমাজ থেকে এক একটি দল কেন বেরিয়ে আসেনা, এ উদ্দেশ্যে যে, তারা দীন
সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে এবং প্রত্যাবর্তন করে নিজেদের লোকদের সেই জ্ঞান সতর্ক দ্বারা করে তুলবে।” (তোওবা : ১২২)
রাসুল (সা:) বলেন, “প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরয” - (ইবনে মাজা)
আল্লাহু পরিচিতি ও আল্লাহু ভীতির জন্য অপরিহার্য : ইসলাম শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস বা আল্লাহ তা’আলাকে চেনা। আল্লাহকে চিনতে হলে
এবং সঠিকভাবে তার প্রতি বিশ্বাস করতে আল্লাহ পাক ও সিফাত, অর্থাৎ আল্লাহর সত্ত্বা ও গুণাবলি সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করা একান্ত আবশ্যক। আত্মপরিচয় এবং সৃষ্টি জগতকে পর্যালোচনার মাধ্যমে আল্লাহকে জানা যায়, আর এ জানার মাধ্যমেই প্রত্যয় জন্মে।
“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাকে ভয় করে” (ফাতির-২৮)
আল্লাহ পাকের প্রথম বাণীতে জ্ঞানার্জনের নির্দেশ : আল্লাহ তা’আলা মহানবী  (সা:) এর প্রতি প্রথম ওহিতেই জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকে আমরা জ্ঞান অর্জন তথা ইসলাম শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি।
দ্বীন ইসলামকে সমুন্নত রাখা : দ্বীনের প্রচার, প্রতিষ্ঠা সমুন্নত ও অক্ষুন্ন রাখার জন্য ইসলাম শিক্ষা অপরিহার্য। ইসলাম শিক্ষা ছাড়া দ্বীনের প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও উজ্জীবন সম্ভব নয়। পূর্বে নবীর পরে অন্য নবী আসতেন।
সুতরাং দ্বীন প্রচারে উম্মতের তেমন দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা:) সর্বশেষ নবী। তার পরে কোন নবী আসবেন না। সুতরাং দ্বীন প্রচার প্রতিষ্ঠা ও উজ্জীবনের দায়িত্ব তার উম্মতের। আর এ দায়িত্ব পালন করার জন্য ইসলাম শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। “জ্ঞানীরাই হচ্ছেন নবীগণের উত্তরাধিকারী। তবে নবীগণ তো ধন- দৌলতের কোন উত্তরাধিকারী রেখে যাননি বরং উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন ইলম বা ইসলাম শিক্ষা, যে ব্যক্তিই তা গ্রহণ করল, সেই একটি পূর্ণাঙ্গ সম্পদ প্রাপ্ত হলো।  - (তিরমিযী)
ভালো মন্দের পার্থক্য : সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য ইসলামি জ্ঞানের একান্ত আবশ্যক।জ্ঞান ছাড়া এ পার্থক্য করা অসম্ভব।
সারারাত নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম : ইসলামে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব এত বেশি যে, রাসুল (সা:) বলেছেন, “রাতে এক ঘন্টা জ্ঞানচর্চা করা সারারাতের ইবাদতের চেয়েও উত্তম”- (মিশকাত শরীফ)
চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন ও মানবতার বিকাশ : মানুষের মেধা, মননশীলতা  শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত হয়। এর মাধমে আত্মার উন্নতি হয়। মানুষের মধ্যে দয়া-মায়া, স্নেহ- মমতা ইত্যাদি মানবীয় গুনাবলি উৎকর্ষিত ও বিকশিত হয়। আচার-আচরণ পরিশীলিত ও পরিমার্জিত হয়। এতে চারিত্রিক উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়, মানবিক গুনাবলির বিকাশ ঘটে। মানবতা সমুন্নত হয়।
মর্যাদার মাপকাঠি- শিক্ষাই সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি, আল্লাহ তা’আলা আদম (আ:) কে ফেরেস্তাদের ওপরেও মর্যাদা দিয়েছিলেন এবং তার মানদ›ড ছিলো শিক্ষা। ফেরেস্তারা আদম(আ:) এর জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব দেখে, ত্র প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়েছিল। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “জ্ঞানীরা আর মুর্খরা কি সমান হতে পারে।”
মহানবী (সা:) এর নির্দেশ : রাসুল (সা:) বলেছেন “ফরয কর্তব্যগুলো পালন কর এবং কুরআন শিক্ষা কর এবং লোকদেরও শিক্ষা দাও, কেননা আমি মৃত্যুর অধীন।”  - (তিরমিযী)
রাসুল (সা:) বলেছেন, “প্রয়োজন হলে চীন দেশে গিয়েও বিদ্যা শিক্ষা কর, বিদ্যা অন্বেষণ করা প্রত্যেক নর-নারীর জন্যে ফরজ”। - (ইবনে মাজাহ)
হালাল উপার্জন : হালাল উপার্জনে সহায়তা এবং আত্মকর্মসংস্থানে সক্ষম করে তোলার উদ্দেশ্যে ইসলাম শিক্ষা প্রয়োজন।
জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা : মহানবী (সা:) বরেছেন,“যে ব্যক্তি ইসলামকে উজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জন করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, নবীগণ ও তার মধ্যে মাত্র একটি স্তরের ব্যবধান থাকবে।”- (দারেমী )
পাপ মোচন : জ্ঞানান্বেষণকারীর প্রতি খুশি হয়ে আল্লাহ তা’আলা তার পুর্বের পাপ মোচন করে দেন।
রাসুল (সা:) বলেন, “যে ব্যক্তি জ্ঞানান্বেষণ করে তার অতিতের পাপ মোচন হয়ে যায়”  - (তিরমিযী)
রাসুল (সা:) বলেন, “যে ব্যক্তি জ্ঞানান্বেষণে বের হয় সে না ফেরা পর্যন্ত আল্লাহর পথে থাকো”- (তিরমিযী)
দুআ লাভ : মানুষ যে উত্তম শেখায় তার জন্যে আল্লাহ তা’আলা, তার ফেরেস্তারা , আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসিরা এমনকি গর্তের পিঁপড়া আর সাগরের মাছও দুআ করে” -(সুনালে তিরমিযী)
আমরা জ্ঞানান্বেষণে ব্রতী হব এবং জ্ঞান চর্চায় সাধ্যমত অবদান রাখব। আমরা স্বপ্ন দেখি, আমাদের এই দেশ হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি, সমৃদ্ধ, মানব সম্পদে পরিপূর্ণ এক দেশ। যে দেশ থেকে এমন মানুষ বেরিয়ে আসবে, যারা শুধু জ্ঞান গরিমায় শ্রেষ্ঠ হবে না বরং উন্নত চরিত্রের, সর্বোত্তম নৈতিকতার প্রকাশ থাকবে তাদের মাঝে। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণের জন্য, সেই কাঙ্খিত মানের মানুষ গড়তে একটি যথার্থ, আদর্শ মানের শিক্ষাব্যবস্থা প্রনয়ণ প্রথম ও প্রধান শর্ত। ইতিহাসের দৃষ্টান্তগুলো আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়, ইসলামি শিক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশের সেই দাবি সর্বোত্তমভাবে পূরণ হওয়া সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ