ঢাকা, মঙ্গলবার 10 October 2017, ২৫ আশ্বিন ১৪২8, ১৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চালের দাম কি আগের অবস্থায় ফিরবে?

এইচ এম আকতার : নামমাত্র দাম কমলেও চালের বাজারে এখনও স্বস্তি নেই। লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়লেও কমছে কচ্ছপ গতিতে। তবে অতীত ইতিহাস টেনে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে যে পর্যায়ে গেছে, আগামী বৈশাখ মৌসুমের আগে তা আগের অবস্থায় ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। বরং এভাবে চলতে চলতে তখনও বর্তমান দামই বহাল থেকে যাবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এক মাসে চালের দাম কমেছে মাত্র কেজিতে ২/৩ টাকা।

জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে বাজারে চালের ঘাটতি দেখা যায়। তখন থেকেই ব্যবসায়ীরা চাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি। এর পর দেখা দেয় হাওরাঞ্চলে অকাল বণ্যা। এই বন্যার কারণে প্রায় ২০ লাখ টন ধান উৎপাদন কম হয়। এতে করে সংকট আরও বাড়ে। শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি আরও জোরালো হলো ১৮ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এতেও তেমন ফল হয়নি। জুন মাস থেকে প্রতি সপ্তাহে চালের দাম বাড়তে থাকে।

সরকার সারা দেশে ১০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রি শুরু করলে সংকট দেখা দেয় সরকারি মজুদ ব্যবস্থায়। সরকার চাল আমদানি ঘোষণা দিলেও পর্যাপ্ত চাল না পাওয়ায় সংকট আরও ঘনিভূত হয়। এতে করে সরকার আমদানি শুল্ক আরও ৮ শতাংশ কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে চালের বাজার আকাশ ছুই ছুই অবস্থা।

অবস্থা এমন দাঁড়ায় প্রতি দিনই চালের দাম বাড়তে থাকে। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণের নাম নানা উদ্যোগ নিলেও ফল হয় উল্টো। বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে সারা দেশের মিল মালিকদের গুদামে অভিযান চালায়। হিতে বিপরিত হওয়াতে অভিযান বন্ধ করে সরকার। 

সরকারের উদ্যোগে চালের দাম অনেকটা কমতে পারে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম। এ বিষয়ে তিনি বলেন: বন্যার পাশাপাশি রোহিঙ্গার কিছুটা প্রভাব পড়েছে চালের উপর। এছাড়া গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের জুনে সরকারি চালের মজুদ প্রায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। চালের মিলাররা এই খবর জানতে পেরেছে। এ কারণে তারা দাম বাড়িয়েছে।

তবে এখন আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে। এই আমদানির চাল দ্রুত বন্দর থেকে খালাস করে বাজারে সরবরাহ করলে দাম স্বাভাবিক হতে পারে।

এখন বাজারে মিনিকেট চাল মানভেদে বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৬২ থেকে ৬৬ টাকায়, নাজিরশাইল ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়, স্বর্না (মোটা চাল) ৪৮ থেকে ৫০ টাকায়, বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬০ টাকায়। শুক্রবারে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও কাঁঠালবাগান বাজার ঘুরে চালের দামের এই চিত্র পাওয়া গেছে।

বেড়ে যাওয়া চালের দাম কবে কমতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে চালের আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাওর এলাকায় বন্যার পর দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যায়ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে আগামী অগ্রহায়ণে যে ধান উঠার কথা তা প্রত্যাশানুযায়ী হবে না। কারণ বন্যার কারণে কৃষকরা ভাদ্র-আশ্বিনে ধান রোপন করতে পারেনি।তারা বলেন, চালের মিলে সরকারের অভিযানের পর দাম যেটুকু কমেছিল এখনও সেখানেই স্থির রয়েছে। এ কারণে চালের দাম ৫ ভাগ বেড়ে, কমেছে মাত্র এক ভাগ। এছাড়া দিন দিন ধান উৎপাদনের জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় আমদানির উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আর কিছু চাল আমদানি করা হলেও তা আতপ চাল বলে মানুষ কিনছে না। তাই বাধ্য হয়ে দাম বেশি হলেও সবাই ছুটছে সিদ্ধ চালের পেছনে।

তাদের অভিমত, বন্যা দেখা দেয়ার পর চাল মওসুমের সময় সরকার মিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত চাল কিনতে পারেনি। তখন তারা কৌশলে মজুদ রেখেছে। মিলাররা এখন বলছে, কৃষকের কাছে ধান নাই। তাই চালের সংকট। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় উৎপাদিত ধান গেল কই? মিলাররা মৌসুমের সময় কৃষকের কাছ থেকে সব ধান কিনে মজুদ করে রাখে। এখন তো কৃষকের কাছে ধান থাকবে না- এটাই স্বাভাবিক। তাই আগামী বৈশাখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে সেই পর্যন্ত চালের দাম কিছুটা উঠানামা করে স্থির হয়ে যাবে। অর্থাৎ যা বেড়েছে তার সামান্য কমে আসবে। তবে আগের দামে ফিরবে না।

কাওরান বাজার চালের আড়তদার মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হান্নান বলেন, মৌসুমের সময় যদি মিলারদের চাপ দিয়ে সরকার চাল কিনে মজুদ রাখতো তাহলে আজ সংকট দেখা দিত না। তাই এখন আগামী মওসুম পর্যন্ত চালের দাম কমার জন্য অপক্ষো করতে হবে। তবে তাতে খুব বেশি দাম কমবে বলে মনে হয় না।

সিটি জেনারেল এন্টার প্রাইজের বিক্রয়কর্মী জোবায়ের জানান, দাম যেটা বেড়েছে তা আগের অবস্থায় আর ফিরবে বলে মনে হয় না। সরকার চাপ প্রয়োগ করলে ঘুরেফিরে হয়তো দুই-এক টাকা কমতে পারে। কয়দিন পর নতুন আরেকটা সমস্যা দেখিয়ে কমানো ওই দুই-এক টাকা আবার বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ চাল আমদানির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে মন্তব্য করে হাজী ইসমাইল এন্ড সন্সের কর্ণধার জসিম উদ্দিন বলেন, দিন দিন কৃষকের জমির পরিমাণ কমছে, কৃষকের সংখ্যা কমছে। ফলে কমছে উৎপাদনের পরিমাণ। কিন্তু মিলারের সংখ্যা বাড়ছে। জনসংখ্যাও বাড়ছে। তাই স্বল্প উৎপাদিত ধান কে কত পরিমাণ মজুদ করবে তা নিয়ে মিলারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে যায়। ফলে দামও বেড়ে যায়। কিন্তু এর সুফল পায় না প্রান্তিক কৃষক। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় চাল না আসলে বাংলাদেশে মোটা চালের কেজিও ৬০-৭০ টাকায় উঠে যাবে।

সরকার দাম বৃদ্ধির জন্য সিন্ডিকেটকে দায়ী করলেও মজুদের কোন প্রমান পায়নি। আর এ কারণে সরকার কাগজি ব্যবস্থা নিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এতে করে বাজার আরও বেড়েছে। ১৬ হাজার মিল মালিককে কালো তালিকাভুক্ত করলেও এ শাস্তি কার্যকর হয়নি। কারণ এ ঘটনার জন্য দায়ী মাত্র ৮/১০ মিলার দায়ী। সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে সাহস পায়নি। ফলে বাজার বেড়েছে পাগলা ঘোড়ার মতো। ব্যবসায়ীরা বরাবরই এ ঘটনার জন্য খাদ্যমন্ত্রণালয়কে দায়ী করে আসছে। 

তাদের অভিযোগ সরকার জানেনা দেশে কত খাদ্য ঘাটতি রয়েছে। কি পরিমাণ মোটা চাল আর কি পরিমাণ চিকন চাল দরকার। সরকার অনেক দেরিতে চাল আমদানি করেছে। তাও আবার আমদানি করেছে আতপ চাল। মূলত সরকারই বাজারকে উস্কে দিয়েছে। আর দায়ী করছে চাল ব্যবসায়ীদের। 

ব্যবসায়ীদের এসব যুক্তি আর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্য মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংগ্রহ ও সরবরাহ) মো. আতাউর রহমানের এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। যুগ্ম-সচিব (সংগ্রহ) মো. শফিউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কবে নাগাদ দাম আগের অবস্থায় ফিরতে পারে নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। খাদ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে ভাল বলতে পারবে।

তবে বৃহস্পতিবার ভারতের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর আরও একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক হবে। এছাড়া এবছর ১৫ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই অনেক চাল সংগ্রহ করা হবে। 

জানা গেছে, সরকার বেশি দামে হলেও ভারত থেকেই চাল আমদানি করবে। কারণ ভারতেই সহজে সিদ্ধ চাল পাওয়া যায়। ভিয়েতনাম কিংবা মিয়ানমারে সিদ্ধ চাল কম পাওয়া যায়। আর বাংলাদেশের মানুষ আতপ চালের ভাত খেতে পারে না। তাই আতপ চাল আমদানি করে কোনোভাবেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

আর এ কারণেই সরকার আপাতত আতপ চাল আমদানি করছে না। আর দু মাস পরেই আমন ধান কৃষকের ঘরে উঠবে। তখন হয়নি এমনিতেই বাজার কিছুটা কমবে। আর এ সুযোগে সরকার চালের মজুদ বাড়াবে। আর মজুদ বাড়াতে পারলেই বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।

তবে মিল মালিকরা আশ^াস দিয়েছেন তারা চালের দাম আর বাড়াবে না। সরকারও তাদের আর হয়রানি করবে না। বাজার নিয়ন্ত্রণে এটিই সরকারের ভরসা। বাড়তি চালের বাজার স্থিতি থাকলেও আগেও দামে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। ততে এই বাড়তি দামে কত দিন চাল ক্রয় করতে হবে তা কেউ বলতে পারছে না। ক্রেতারা বলছেন, এই বাড়তি দামই স্বাভাবিক দাম হিসেবে থেকে যাবে। সাধারন ক্রেতার পকেট কাটা নিয়ে আর কারো মাথা ব্যাথ্যা হয়তো থাকবে না।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২ সেপ্টেম্বরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী চালের মোট মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন। যা গত বছরের অর্ধেকেরও কম। ওই সময় মজুদ ছিল ৭ লাখ ২৯ হাজার টন চাল। এ মজুদ বাড়াতে সরকার উঠে পরে লেগেছে। তবে উচ্চমূল্যে চাল আমদানি করে সরকার কতটুকু মজুদ বাড়াতে পারবো তা বলা যাচ্ছে না। মজুদ যাই থাক না কেন নিয়ন্ত্রিত মূল্যে ভাত খেতে চায় সাধারণ মানুষ। কম দামে চাল খাওয়ানো আশ^াস দিলেও তা রক্ষা করতে পারেনি সরকার।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন সরকার যদি মার্চে বিশ^ বাজার থেকে চাল আমদানি করতে পারতো তাহলে বাজার কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাহিরে যেতো না। চালের দাম হয়তো কেজিতে ২/৪ টাকা বাড়তো। এতে বাজারে তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়তো না। কিন্তু সময় মতো আমদানি না করার কারণেই লাফিয়ে লাফিয়ে চালের বাজার বেড়েছে। ৩২ টাকার মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৫২ টাকায়। কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা পর্যন্ত। এতে করে একটি চিহ্নিত সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে হাজার কোটি টাকা।

সরকার এবং ক্রেতা সাধারণ দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে হাক ডাক দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো দাম বেড়েছে কারন ছাড়াই। চাপ প্রয়োগ করে বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল বাজারকে আরও উচকে দিয়েছে। আগের দাম চাল খেতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে ক্রেতাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ