ঢাকা, বুধবার 11 October 2017, ২৬ আশ্বিন ১৪২8, ২০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোববার রাতে-

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : গত রোববার রাতে টিভির এক টক-শোতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন ৭১ টিভির বার্তা সম্পাদক ইশতিয়াক রেজা। বিরতির সময় তার টিভি’র খবর দেখে তিনি আমাকে জানালেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা রাত সাড়ে এগারোটার ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছেন। জানতে চাইলাম, তিনি নিশ্চিত কিনা। জানালেন, নিশ্চিত। আমার তো তখন আমাদের সংবাদপত্রের প্রধান সংবাদ (লিড) পরিবর্তন করতে হয়। তিনি বললেন, অন্য কোনো সূত্র না পেলে আমাদের টিভিকে কোট করেই সংবাদটা ছাপতে পারেন। আইডিয়াটা মন্দ না। আমি সেখানে বসেই আমাদের বার্তা সম্পাদককে ফোন দিলাম। বললাম, কোথায়ও না পেলে ৭১ টিভিকে কোট করেই লিড নিউজটা পরিবর্তন করে দিন। অনুষ্ঠান শেষ করে আমি অফিসে এসে বাকি সিদ্ধান্ত নেব।
কিন্তু মনটা খুঁত খুঁত করছিল। এই ধারায় প্রচার প্রোপাগান্ডা চলছিল আরও কয়েক দিন ধরে। সিনহা অস্ট্রেলীয় হাই কমিশনে গেছেন। সেখানে গিয়ে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ভিসার আবেদন করেছেন। ভিসা হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী তার মেয়ে সূচনা সিনহার বাসায় গিয়ে সস্ত্রীক উঠবেন। সব ঠিকঠাক। রোববার দিনভর খবর/গুজব ছিল যে, তিনি আইসিডিডিআরবিতে গিয়ে তার রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন। এর মধ্যে তার সঙ্গে দেখা করেছেন সরকার নির্ধারিত ব্যক্তিরা। এটর্নি জেনারেল। আইনমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী। রেজিস্ট্রার জেনারেল, দু’জন ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেনারেল, সিনহার চিকিৎসক প্রমুখ। এরা সকলেই সরকার নির্ধারিত লোক। আবার বাইরে এসে তারা কেউ মুখ খোলেননি। দীর্ঘ সময়ব্যাপী কী কথা হলো প্রধান বিচারপতির সঙ্গেÑ তার ঘুনাক্ষরও কেউ জানতে পারেনি। জানতে পারছে না।
কিন্তু গোল বাঁধলো অন্যত্র। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির একটি প্রতিনিধিদল প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। তারা কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু মৎস্য ভবনের পাশেই পুলিশ তাদের বাধা দেয়। তারা যেতে পারবেন না প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে। কেন যেতে পারবেন না, তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি কোনো তরফ থেকে। আইনজীবী সমিতি ও উদ্বিগ্ন। সুশীল সমাজ ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করে আসছিল যে, প্রধান বিচারপতিকে সরকার জোর করে অসুস্থ বানিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। আইনজীবী সমিতিকে দেখা করতে না দেয়ায় সে কথাই পোক্তভাবে প্রমাণিত হলো। সরকারের সম্ভবত আশঙ্কা ছিল যে, প্রধান বিচারপতি যদি আসল ঘটনা তাদের সামনে প্রকাশ করে দেন! আর তারা ফিরে এসে মিডিয়ায় বললে সেটা সরকারের জন্য সুখকর হবে না। আর সে কারণেই এ বাধা।
দেশে বিদেশে কেউ বিশ্বাস করেননি যে, প্রধান বিচারপতি আসলেই কাজ চালানোর মতো সুস্থ নন। কারণ যেদিন তার নামে প্রেসিডেন্টের কাছে তথাকথিত ছুটির দরখাস্ত দেয়া হয়, সেদিনও বেলা দুইটা পর্যন্ত বিচারপতি সিনহা অফিস করেছেন। তিনি কারও কাছে অসুস্থতার কথা বলেনওনি, কেউ তাকে অসুস্থ দেখেনওনি। এর কয়েক দিন আগে তিনি সুস্থ শরীরে কানাডা ও জাপান ঘুরে এসেছেন। এছাড়া প্রধান বিচারপতির ছুটির দরখাস্তে পাঁচটি বানান ভুল। আর তিনি সাধারণত যে স্বাক্ষর দিয়ে থাকেন, সে স্বাক্ষরের সঙ্গে তার ছুটির দরখাস্তের স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই। ফলে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, ঐ দরখাস্ত কি অন্য কেউ লিখে বিচারপতির স্বাক্ষর নকল করে প্রেসিডেন্টের কাছে দাখিল করেছে? বিচারপতি সিনহা আদৌ কোনো ছুটির দরখাস্তই করেননি। সত্য যখন গোপন করা হয়, তখন এসব গুজব ডালপালা বিস্তার করে পল্লবিত হতে থাকে। তবে কি সরকার সত্য গোপন করছে? সে কথা আবার বিশ্বাস হয় এই কারণে যে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যখন প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের চিঠিটি সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে ধরে দেখাচ্ছিলেন, মুখে বলছিলেন যে, প্রধান বিচারপতির ক্যান্সার হয়েছে। দেশের প্রধান বিচারপতির যদি ক্যান্সার হয়ে থাকে, তাহলে আইনমন্ত্রীর হাসার কী আছে! একে মনুষ্যত্ব বলা যায় না।
৭১ টিভিকে অনুসরণ করে আরও কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রধান বিচারপতির অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ার খবর প্রচার করে। তাদের কেউ কেউ আবার তার সফরসূচির খবরও দিতে থাকে। আমি অফিসে ফিরে দেখলাম, সাংবাদিক কর্মচারীদের মধ্যে তুমুল আলোচনা। কেউ কেউ বিশ্বাসই করছিলেন না যে, বিচারপতি সিনহাকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। তারা বলছিলেন, এগুলো প্রচারণা। ছড়িয়ে দিয়ে দেখতে চাইছে কী রিঅ্যাকশন হয়। কেউ কেউ বলছিলেন যে, ও, ৭১? ওদের যেমনি নাচায়, তেমনি নাচে। তখনও ৭১ টিভি ও কোনো কোনো অনলাইনে প্রধান বিচারপতির বিদেশে যাওয়ার খবর প্রচারিত হচ্ছিল। তাতে বলা হয়, তিনি বাসা থেকে বের হবেন রাত সাড়ে নয়টায়। যাবেন এমিরাটসের ফ্লাইটে। সে ফ্লাইট রাত সাড়ে ১১টায়। রাত ৯টা ২০ মিনিট নাগাদ আমি তার বাসার সামনের বিপরীত দিকের রাস্তা দিয়ে চলে গেলাম। কিছুই চোখে পড়লো না। ভাবলাম, হয়তো অত্যন্ত সঙ্গোপনে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে এয়ারপোর্টের দিকে। রাত সাড়ে নয়টার দিকে এ খবরে ভাটা পড়তে থাকলো। ব্রেকিং নিউজ থেকে সরে গেল বিচারপতি সিনহার বিদেশে যাওয়ার খবর। তারপর ৭১ টিভি ও অন্যান্য নিউজ পোর্টালও সে খবর তুলে নিল। আমিও আমার লিড নিউজ পরিবর্তন করে ফেললাম।
তবে ডালে যে কিছু কালা আছে, তা বোঝা গেলো সুপ্রীম কোর্ট বার কাউন্সিলের আওয়ামীপন্থী কয়েকজন আইনজীবীর স্বতন্ত্র বক্তব্য থেকে। বার কাউন্সিল প্রধান বিচারপতিকে আদালতে ফেরত পাবার জন্য এখন দেশব্যাপী পাঁচ দিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। তারা আরও দাবি করেছেন, প্রধান বিচারপতি নিজে তার স্বাস্থ্য ও ছুটি সম্পর্কে একটি বিবৃতি দেন। কিন্তু তাদের সে বিক্ষোভে নানা স্থানে পুলিশ বাধা দিচ্ছে। আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা এর সমালোচনা করে বলেছেন, বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দেয়া বক্তব্য ভিত্তিহীন। প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে কোনোরূপ বিবৃতি ও বক্তব্য কাম্য নয়। কেন কাম্য নয়, তারা এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তা থেকেও স্পষ্টতই প্রমাণ হয় যে, সে রকম ব্যাখ্যা এলে থলের বিড়াল বের হয়ে যাবে। আসলে প্রধান বিচারপতির ছুটি যে একটা গভীর ষড়যন্ত্র সে কথাও প্রমাণিত হয়ে যাবে। অতএব তা আওয়ামী পন্থীদের কাছে কাম্য হয় কীভাবে!
এদিকে আইনজীবীদের মানববন্ধন কর্মসূচিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, আজকে দেশের সঙ্কট হলো, সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকবে কি থাকবে না। একটি রায়কে কেন্দ্র করে এই শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই রায় সরকারের পছন্দ হয়নি। প্রতিক্রিয়া হিসেবে সরকার ও সরকারদলীয় নেতারা যে আচরণ করছেন তা নজিরবিহীন। তিনি বলেন, কোনো সভ্য দেশে, কোনো গণতান্ত্রিক দেশে কোনো দিন শুনিনি, প্রধান বিচারপতিকে গৃহবন্দী করা হয়। এখনও তিনি সম্পূর্ণরূপে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছেন। সরকারের অনুমোদন ছাড়া কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে পারে না। তিনি তাদের অধীনে সরকারের হেফাজতে আছেন। আইনজীবী নেতারা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। দেশের সাংবাদিকরা দেখা করতে পারেন না। তার আত্মীয়-স্বজনরাও এখনও তার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। এর আগে তিনি জানান, প্রধান বিচারপতির বাসার টিঅ্যান্ডটি লাইন সরকার কেটে দিয়েছে।
মানববন্ধনে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, প্রধান বিচারপতিকে চাপ দিয়ে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এটা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ওপর হামলা। এটা নগ্ন আওয়ামী হামলা। তিনি বলেন, ছুটির আগে আওয়ামী আইনজীবীরা সরকারের তরফ থেকে বলেছিলেন, প্রধান বিচারপতি, আপনি যদি রায় বাতিল না করেন, তা হলে বন্ধের পর আপনাকে আর বসতে দেয়া হবে না। এরই প্রতিফলন হিসেবে আজকে জোর করে প্রধান বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এখন শুনছি, তাকে জোর করে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।
বিষয়টি সত্যি সত্যি অকল্পনীয় ছিল। প্রধান বিচারপতি একজন ব্যক্তিই শুধু নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান এবং বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন। তার নেতৃত্বাধীন দেশের শীর্ষ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছেন। সে রায়ের সঙ্গে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণও যুক্ত ছিল। এটা রায়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগ সরকার ষোড়শ সংশোধনী যেমন পছন্দ করেনি তেমনি পছন্দ করেনি এর পর্যবেক্ষণগুলোও। সে ক্ষেত্রে সহজ পথ তাদের জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়নি। সরকার আপিল বিভাগেই রিভিউ আবেদন করতে পারতো। কিন্তু তা না করে প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী নেতারা প্রধান বিচারপতির উপর একেবারে হামলে পড়লেন। সংসদে এমন কোনো ভাষা নেই, যে ভাষায় তাকে গালমন্দ করা হয়নি। তারপর দুদকে তার বিরুদ্ধে শতাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তার মধ্যে দুর্নীতি স্বজনপ্রীতিও রয়েছে। জানুয়ারির শেষে প্রধান বিচারপতির অবসরে যাওয়ার কথা। ধারণা করা যায়, অবসরের পর সরকার তার বিরুদ্ধে সব মামলা দায়ের করে তাকে নানাভাবে হয়রানি করবে।
বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের এই অবস্থান নতুন নয়। এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় আদালতকে প্রভাবিত করার জন্য শাহবাগে এক বেলাল্লাপনার গণজাগরণ মঞ্চ স্থাপন করেছিল। দিনরাত সেখানে নানান হৈ-হল্লা চলে। মেয়েরা লাঠি খেলে, রাত গভীর হলে তরুণ-তরুণীরা নানা আড়াল খুঁজে নেয়, সেভাবেই গণজাগরণ মঞ্চকে চাঙ্গা রাখা হয়। তখন বলা হয়েছিল, শুধু আইন-কানুনের ভিত্তিতেই নয়, জনগণ কি চায় তার ভিত্তিতেই বিচারকদের রায় দিতে হবে। কি ভয়ঙ্কর কথা। অর্থাৎ অপরাধ যাই হোক, রায় চাই আওয়ামী লীগের অনুকূলে। এরও আগে ২০০০ সালে এই আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরাই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল করেছিলেন। তারা আদালত প্রাঙ্গণে বস্তি বসিয়েছিলেন। ড. কামাল হোসেনের বাসভবনের সামনে গলিজ স্তূপীকৃত করেছিল।  এবার তারা সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গণে বস্তি বসাননি ঠিকই কিন্তু প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, অবকাশের পর তাকে আর আদালতে বসতে দেয়া হবে না। তিনি আধা বেলা বসতে পেরেছিলেন। তারপর তাকে কার্যত অন্তরীণ করা হয়েছে।
এটা নিশ্চিত, বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে দেশ অরাজকতায় ডুবে যেতে বাধ্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ