ঢাকা, বুধবার 11 October 2017, ২৬ আশ্বিন ১৪২8, ২০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

১৯৯২ সালের চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব মিয়ানমারের ‘কৌশল’!

স্টাফ রিপোর্টার : মিয়ানমার সরকারের ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাবকে ‘আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার কৌশল’ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, দেশটির সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত না থাকলে মিয়ানমার মূল সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী নাও হতে পারে। এমনকি মিয়ানমারের উদাসীনতায় হতাশা ব্যক্ত করলেন তিনি। 

গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর পুরনো এলিফ্যান্ট রোডে নিজস্ব মিলনায়তনে পররাষ্ট্র বিষয়ক সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিজ) আয়োজিত এক গোলটেবিল অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপরোক্ত মন্তব্যের সাথে সাথে হতাশার কথা বলেন। ‘রোহিঙ্গা সংকট, বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক, বিজ’র চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ এবং মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম আবদুর রহমান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার নিজেরা যাচাই–বাছাই করে প্রত্যাবাসনের কথা বলছে। এবং এ ক্ষেত্রে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসনের যে নীতি নেয়া হয়েছিল, সেটাকে অনুসরণ করতে চাইছে। বাংলাদেশ সরকার এবারের পরিস্থিতির মাত্রা ও ভিন্নতার বিষয়ে মিয়ানমারকে জানিয়েছে এবং প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে একটা খসড়া প্রস্তাব হস্তান্তর করেছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের আংশিক ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার কৌশল হতে পারে। মিয়ানমার নিজস্ব যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য প্রত্যাবাসন প্রত্যাশীদের সংখ্যা সীমিত করার এবং নানা অজুহাতে কফি আনান কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে বিলম্বিত করতে পারে।

বাংলাদেশ চায়, এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) যুক্ত থাকুক-এমনটা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায়, আন্তর্জাতিক চাপটা অব্যাহত থাকুক। ২০১২ সালের পর থেকে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের নিস্পৃহ মনে হয়েছে। তারা বাংলাদেশ সফর করেছে তবে কখনোই আলোচনা এগোয়নি। এমনকি আজকেও (গতকাল) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে, সেখানকার গণমাধ্যমে এখনো রোহিঙ্গাদের ‘ বেঙ্গল টেররিস্ট’ বলা হচ্ছে। 

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিসংখ্যান দিয়ে বলেন, মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনের ১৭ লাখের মত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নয় লাখই এখন বাংলাদেশে। ইতিহাসে এই প্রথম বারের মত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মূল অংশ বাংলাদেশে চলে এসেছে। বাংলাদেশের বাইরে আরো কিছু দেশে চার লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ফলে, তার মতে, বড় জোর চার থেকে পাঁচ লাখ লোক রোহিঙ্গা এখন মিয়ানমারের উত্তর রাইনে অবশিষ্ট রয়ে গেছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারে সরকারের “জাতিগত ভারসাম্য আনার পরিকল্পনার” অংশ হিসেবে বুথিডং এবং মঙডুকে রোহিঙ্গা শূন্য করে ফেলার চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, গত ২৫শে অগাস্ট থেকে তিন হাজারের মত রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে জাতীয় প্রচার মাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা লক্ষণীয়। রাখাইনে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ এবং বাঙালি সন্ত্রাসবাদ চলছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। প্রতিবেশী কয়েকটি রাষ্ট্রকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আগামী ১৬ অক্টোবর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক আছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে- এমনটা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে মিয়ানমার কী করছে, সেটা দেখেই বোঝা যাবে মিয়ানমার সত্যিই প্রত্যাবাসনে আগ্রহী কি না। বাংলাদেশ কী করেনি? বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও করেছে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছে। এর আগে একবারই জাতিসংঘের মহাসচিব লেবাননের সমস্যা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদকে চিঠি দিয়েছিল। আর এবার রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে চিঠি দিল। এই নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে মোট চারটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হলো।

আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যে সমস্যা, সেই সমস্যার দু’টি দিক। একটি হলো তাদের জাতীয়তা, আরেকটি হলো প্রত্যাবাসন। দু’টি সমস্যার সমাধানই মিয়ানমারের হাতে। সঙ্কটের দ্বিতীয় অংশে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াকে ‘জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী’ হিসেবে বর্ণনা করে মাহমুদ আলী বলেন, এ ব্যাপারেও মিয়ানমারকে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। সেখানে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরবিশে সৃষ্টি করতে হবে। নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তা না পেলে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যূত রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে আগ্রহী হবে না। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা এখন কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নেই। এটি এখন আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ পেয়েছে। তাছাড়া এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়। এ সমস্যার পেছনে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। সমস্যার সৃষ্টি ও কেন্দ্রবিন্দু মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে নিহিত। আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারি ও সহযোগিতা ছাড়া মিয়ানমারকে দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আগ্রহী রাখা ‘কঠিন হবে’ মন্তব্য করে পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে, বহুপক্ষীয়, আঞ্চলিক, দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

তবে কূটনৈতিক তৎপরতায় অগ্রগতির কোনো আশাবাদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর কণ্ঠে শোনা যায়নি। তিনি বরঞ্চ বিভিন্ন পর্যায়ে মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে, মন্ত্রী খোলাখুলি হতাশা প্রকাশ করেন-“কোনো কিছুই তো অগ্রসর হয়না...।” মিয়ানমারের ‘উদাসীনতা’ স্বত্বেও মন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী দেশের সাথে যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবসন নিশ্চিত না করে তাদের জোর করে মিয়ানমার পাঠানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ এবং ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেয়া হবে। মিয়ানমার চায় আমরা রোহিঙ্গাদের ‘উদ্বাস্তু’ ঘোষণা করি। এটা করলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার পাঠানো কঠিন হবে।

পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, রোহিঙ্গাদের অন্যদেশে পাঠানো সম্ভব নয়। তাদের নিজ দেশেই ফেরত পাঠাতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ