ঢাকা, বুধবার 11 October 2017, ২৬ আশ্বিন ১৪২8, ২০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জাতীয় নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী চায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দল

 

 

মিয়া হোসেন : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। আর সেভাবেই নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে তারা। সবচেয়ে ঝুকিঁপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। আর জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা বাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে মনে করছে দলগুলো। 

গত ২৪ আগস্ট থেকে নির্বাচন কমিশনের সাথে নির্বাচনী আইন সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২৬টি রাজনৈতিক দল সংলাপে অংশ নিয়ে তাদের মতামত জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে। এসব দলের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ দলও রয়েছে। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর এসব মতামতের সারসংক্ষেপ তৈরী করে বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাবকারী দলগুলো হলো, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি- জাগপা, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), প্রগতিশীল গণতান্ত্রীক দল (পিডিপি), গণফ্রন্ট, গণফোরাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), সংসদের বিরোধী দল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) আ স ম আবদুর রব বলেন, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো দেশেই সম্ভব হয় না। সে কারণে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সিইসিকে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছি। সেই সঙ্গে সন্ত্রাস, মাস্তানি, কালো টাকার ব্যবহার, সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন তথাকথিত পুলিশ দিয়ে রোধ করা সম্ভব হবে না। সেই কারণে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছি।

তিনি বলেন, শুধু রাস্তাঘাটে ঘোরাঘুরি ও টহল দেয়ার জন্য সেনাবাহিনী নয়, নির্বাচনী যে কোনো অনিয়ম প্রতিরোধে সেনাবাহিনীকে তাৎক্ষণিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামাতে হবে।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনী যদি জাতীয় যে কোনো দুযোর্গ যেমন বন্যা, ত্রাণ, রাস্তা নির্মাণ ও রোহিঙ্গাদের জন্য মাঠে নামতে পারে তাহলে কেন নির্বাচনে তাদেরকে নামানো হবে না। সবগুলো দল নির্বাচনে সেনাবাহিনী চাচ্ছে অথচ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কেন সেনা নামাতে চায় না, এর কারণ কী তা সহজেই অনুমেয়।

বিশেষজ্ঞগণ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা ও সেতু তৈরি বা মেরামতের দায়িত্ব পড়ে সেনাবাহিনীর উপর। দেশের বড় কোন সংকটের সমাধানে নিয়ে আসা হয় সেনাবাহিনীকে। দেশের সবচেয়ে বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজ যেগুলো সিভিল প্রশাসন দিয়ে সুষ্ঠুভাবে সম্ভব নয়, তার দায়িত্ব দেয়া হয় সেনাবাহিনীকে। ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজ সুষ্ঠুভাবে করে যাচ্ছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দেশের অন্যতম স্থান হাতিরঝিলের কাজ করেছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এমন কী সর্বশেষ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণসহ সার্বিক কাজে হ-য-ব-র-ল দেখা দিলে সেখানে তদারকির দায়িত্ব পড়ে সেনাবাহিনীর উপর। দেশের এমন কাজগুলোতে যদি সেনা মোতায়েন করে সুফল পাওয়া যায় তাহলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ন্যায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সেনা মোতায়েন করা জরুরী। 

তারা বলছেন, দেশের বর্তমান সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা। যা নিয়ে শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও আলোচনা হচ্ছে। সবাই চাচ্ছে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন। যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশ নেবে এবং ভোটাররা নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সরকার বা নির্বাচন কমিশন যদি আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন না করে তাহলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ন্যায় দেশে সহিংসতার মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এমনকি নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাবারও আশংকা থেকে যাবে।

সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ বলেন, ওনারা (নির্বাচন কমিশনার) দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যাতে নির্বাচনটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, আমি উনাদের কথা বিশ্বাস করি। মনে প্রাণে আল্লাহর কাছে দোয়া চাই, তাদের আশ্বাস যেন আল্লাহ পূরণ করেন। আর পাবলিক পারসেফশন হলো, সেনাবাহিনী যদি মোতায়েন করা হয়, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। আমরা তাই বলেছি, যেহেতু জনগণ চাচ্ছে তাই সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হোক।

কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে ৮টি সুপারিশ করা হয়েছে। ৪টি বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেকোনো কারণেই হোক পলিটিসাইজড হয়ে গেছে। তাই তাদের ওপর জনগণ আস্থা রাখতে পারছে না যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে জনগণ বিশ্বাস করে। নির্বাচনের ৮-১৫ দিন আগে সেনা মোতায়েনের জন্য কমিশনের কাছে দাবি জানান তিনি। 

সরকারের তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে বলেন, আমরা আইন সংশোধনের জন্য ১২ টি প্রস্তাব দিয়েছি। আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন চাই। তবে স্ট্রাইকিং র্ফোস হিসাবে নিয়োগ দিতে হবে। বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করে মাঠে নামানোর পরামর্শ দিয়েছে তার দল।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, সংলাপের কমন প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। সংলাপে অনেক প্রস্তাব আনা হচ্ছে। এর মধ্যে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন, পেশীশক্তি ও কালোটাকা বন্ধসহ কিছু কিছু কমন প্রস্তাব আসছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে যেগুলো খুব বেশি কমন থাকবে, সেগুলো ইসি বিবেচনা করতে পারে বলে জানান।

নির্বাচনী আইন সংস্কার সর্ম্পকে আইনি সংস্কার-সংক্রান্ত কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, সংলাপের পর আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতেই কমিশন খসড়া অনুমোদন করবে। 

নির্বাচনে সেনামোতায়েন প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বক্তব্য হলো, পরিস্থিতি বিবেচনায় সেনা মোতায়েনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দরকার না হলে সেনাবাহিনী আসবে না। কোনো দল বা কারো চাওয়া না চাওয়ায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন হবে না। পরিস্থিতি বিবেচনা করেই কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। পরিবেশ পরিস্থিতি সে রকম মনে হলে আসবে, দরকার না হলে সেনাবাহিনী আসবে না। আর রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের সারসংক্ষেপ তৈরী করে ইসির সভায় আলোচনার মাধ্যমে আইন সংস্কারের খসড়া তৈরী করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ