ঢাকা, শুক্রবার 20 October 2017, ৫ কার্তিক ১৪২8, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা গল্প

আশরাফ পিন্টু

অবাক খবর

খবরটি শুনে সবাই তাজ্জব বনে যায়। ভিনদেশের কোনো এক মুক্ত পায়রা নাকি সম্প্রতি দানাদার খাবার ছেড়ে দিয়েছে। চাল, গম, সরিষা- এসব দানাদার খাদ্যতে নাকি তার অরুচি ধরেছে। তাকে উৎকৃষ্ট মানের দানাদার খাবার দেবার পরও সে মুখে রোচছে না। অথচ এই পায়রা যখন বন্দি ছিল তখন অনেক অখাদ্য- কুখাদ্যও খেয়েছে। তার নাকি খাদ্যাভ্যাসে অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটেছে। এখন নাকি মানুষের রক্ত- মাংস তার বেশি পছন্দ। আরো অবাক ব্যাপার হলো- সব মানুষের রক্ত মাংস সে খায় না। বিশেষ এক গোত্রের রক্ত মাংস তার বেশি পছন্দনীয়। ওই গোত্রের মাংস নাকি খেতে খুব সুস্বাদু। সর্বশেষ খবর হলো -সে নাকি পায়রা থেকে শকুনে রূপান্তরিত হয়েছে ।

শান্তির প্রতীক পায়রার এ কেমন রূপান্তর!

 

বুকে বুলেটের দাগ 

ছেলের বুকের বাম দিকে ও পেটের নিচে গর্তের মতো দু’টি দাগ দেখে চমকে ওঠে আমেনা বেগম। দাগ দু’টো বন্দুকের গুলির দাগের মতো মনে হচ্ছে। দাগগুলো কোত্থেকে এলো? এতদিন তো নজরে আসেনি?

রহম ঘুমিয়ে ছিল। মায়ের কোমল হাতের স্পর্শ পেয়ে জেগে ওঠে। অবাক চোখে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে মা?

মা তাড়াতাড়ি ওর গা থেকে হাত সরিয়ে নেয়। বলে, না, এমনি।

-না মা, কিছু একটা হয়েছে? রহমের গলা দিয়ে উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ে।

মা কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ওর বুকের পাশে হাত রেখে বলে, তোর এ দাগগুলো কোত্থেকে এলো?

মায়ের কথায় রহম নিজের বুকের দিকে তাকায়। দাগ দুটো দেখে ও নিজেও অবাক হয়, সত্যি তো! কীভাবে এলো?

আমেনা বেগম ভাবতে থাকে।

কত বছর পূর্বে এ দেশে এসেছিল সে? ২৫ কি ২৬ বছর। ঠিক হিসেব করতে পারে না। তবে মনে পড়ে এ দেশে আসার ৫/৬ মাস পড়েই রহম জন্ম গ্রহণ করে। তখন এ দেশে জনগণ এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে এ দেশে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করে। সে হিসেবে রহমের বয়স সামনের মার্চে ২৬ বছর হবে।

তাহলে সে জন্মভূমি রাখাইন ছেড়ে এসেছে ২৬ বছর? দেখতে দেখতে ২৬ বছর কেটে গেল! রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা আবার আসতে শুরু করেছে এ দেশে। এভাবে কি তারা আসতেই থাকবে? আমেনা বেগম যখন এ দেশে এসেছিল তখন এখানে রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল আড়াই লাখের মতো। এখন তা দ্বিগুণেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। আস্তে আস্তে হয়ত আরো আসবে। এক সময় হয়ত রাখাইন মুসলিম শূন্য হয়ে পড়বে। আর আমরা কি পরগাছার মতো এ দেশের বোঝা হয়ে থাকব? এর কি কোনো প্রতিকার নেই?

প্রমাণহীন এক অজুহাত দেখিয়ে রাখাইনের মুসলিম প্রধান গ্রামগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয় মায়ানমারের বর্বর সেনারা। ওর স্বামী নাকি স্বাধীনতাকামীদের সাথে যোগ দিয়েছে। জঙ্গী-সন্ত্রাসী ওর স্বামী। এ কথা সত্য কি মিথ্যে তা আমেনা জানে না। জানার কথাও নাা। মাত্র কয়েক মাস আগে বিয়ে হয়েছে ওর।

 সেদিন স্বামীর বুকে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে ছিল আমেনা। হঠাৎ প্রচ- গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ওদের। রহমত দরজা খুলতেই দেখে ৪/৫ জন মিলিটারি। কিছু বোঝার আগেই রহমতের মাথা ও বুক বরাবর গুলি করে ওরা। কয়েকটি বুলেট বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এসে লাগে রহমতের মাথায় ও বুকে। রহমত লুটিয়ে পড়ে।

এরপর ওরা ভিতরে ঢুকে দেখে আমেনা ভয়ে স্তব্ধ হয়ে বিছানার কিনারে জড়োসড়ো বসে আছে। ওরা ওর দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে আগাতে থাকে। আমেনা ভয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠে, না!! 

কিন্তু আমেনা করুণ আর্তনাদ ওদের কানে যায় না। পড়ে  চিৎকার থামিয়ে অনুনয়-বিনয় করে বলে, সাব, আমি গর্ভবতী।...

কিন্তু ওর কথার কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে একে একে সবাই ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাজ শেষে যাবার সময় পিছন ফিরে একজন গুলি করে আমেনাকে। গুলিটি আমেনার তলপেট ঘেঁসে বেরিয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে ও বেঁচে যায়। জান বাঁচাতে ওভাবেই ও পাড়ি জমায় প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে। এখানে আসার পর এ দেশের মেডিকেল টিম সেবা-চিকিৎসা দিয়ে ওকে সারিয়ে তোলে।

আজ দীর্ঘ দিন পরে ছেলের গায়ে হাত দিয়ে মনে পড়ে যায় অতীতের দুঃসহ স্মৃতি। সদ্য আগত নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের করুণ দৃশ্য দেখে অতীত আরো সজিব হয়ে ওঠে। ছেলে এখন বড় হয়েছে। সব বুঝতে শিখেছে। মাঝে মাঝে দেশে ফিরে যাবার কথাও বলে ও। কেন ওরা এদেশে পরগাছার মতো থাকবে? এদেশও তো একদিন পরাধীন ছিল; কিন্তু অকুতোভয় বাঙালিরা জীবন দিয়ে এদেশ স্বাধীন করেছিল। এদেশের বাঙালিরা নিজ দেশকে স্বাধীন করতে পারলে তারা কেন পারবে না? 

রহম মাঝে মাঝে বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠানে যায়। তবে কি ও কোনো স্বাধীনতাকামী কিংবা সন্ত্রাস কোনো গোষ্ঠীর সাথে মিশছে? তাদের হাতে গুলি খেয়ে...। কিন্তু দাগ দুটো তো অনেক পুরনো। ছোটবেলায় তো ও এ আশ্রয় শিবিরের বাইরেই যায়নি? তাহলে দাগ দুটো এলো কোত্থেকে? 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ