ঢাকা,বৃহস্পতিবার 19 October 2017, ৪ কার্তিক ১৪২8, ২৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জাতীয় ঐক্য না থাকায় কূটনৈতিকভাবে চরম ব্যর্থ সরকার

স্টাফ রিপোর্টার: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য জাতীয় ঐক্য না থাকায় কূটনৈতিকভাবে চরম ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না শেষ পর্যন্ত কত রোহিঙ্গা এদেশে আসবে। রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় জীবনে এক বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। ক’টনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা না গেলে এটি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সুজন আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সমস্যা: প্রেক্ষিত, বর্তমান পরিস্থিতি আর সম্ভাব্য করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সুজন সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্ঠা এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে এসময় বক্তব্য রাখেন, সুজন নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ, এম আনোয়ারুল হক, ড. সি আর আবরার, এ এস এম আকরাম, রেহেনা সিদ্দীকী এবং সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রমুখ। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সুজন নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজুমদার।

লিখিত বক্তব্যে আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন নেত্রী অং সান সুচি বলেছিলেন, তার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে। কেন তারা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে তাও খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু তার এ ভাষণের পরও এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে। পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বেশ আগে। বক্তব্যের সারবত্তা থাকলে অন্তত তিনি দেশত্যাগ দ্রত বন্ধ করে একটি আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হতেন।

তিনি বলেন, আমরা আশা করব, বিভিন্ন দেশের যত স্বার্থই মিয়ানমারের থাকুক তারা হতভাগ্য রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ ও তাদের দ্রত ফিরিয়ে নেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে কার্যকরী প্রভাব রাখতে পারে। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত যখন কক্সবাজার থেকে অন্য কূটনীতিকদের সাথে সফর করে এসে বলেন এদেশে আসা রোহিঙ্গাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাবু ও কম্বল, তখন আমরা সত্যিই ব্যথিত হই। প্রকৃতপক্ষে তাদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন মিয়ানমারের নাগরিত্বের স্বীকৃতি ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের নিরাপদ ও সম্মানজনক ব্যবস্থা।

প্রবন্ধকার বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, এ সমস্যার আশু সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের বিভিন্ন ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে যেতে পারে।

এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট জাতীয় জীবনে এক বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। ১৯৭৮ সালে থেকে এ সমস্যার শুরু। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশের সরকার এর ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। কিন্তু এই দেশটির সাথে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আজও তৈরি হলো না কেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। তিনি আরো বলেন, আমরা এ সমস্যার সমাধান চাই। শরণার্থীদের তারা তাদের দেশে ফেরত নিয়ে যাক। 

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সরকারের উপর আরও চাপ সৃষ্ট করতে হবে। তা না হলে এই সমস্যা সমাধানে সরকার সক্রিয় হবে না। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আমরা বেশীদূর আগাতে পারিনি। এই সমস্যা সমাধানে আমরা কেন? চীন, রাশিয়া যাচ্ছি না। চীন আর রাশিয়া ছাড়া কোন দিনই এ সমস্যার সমাধান হবে না। এ জন্য আমাদের আরও কুটনৈতিক লবিং চালাতে হবে। তা না হলে এ সমস্যার আরও প্রকট হতে পারে। যা আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যেতে পারে।

 ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় দশ লক্ষ শরণার্থীর চাপ সহ্য করা দুরূহ হবে। এছাড়াও রোহিঙ্গা ইস্যু ভয়াবহ নিরাপত্তাজনিত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এ বিরাট উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আবদ্ধ করে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ফলে তারা জীবন-জীবিকা নির্বাহের প্রচেষ্টায় স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, এমনকি দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। উপরন্তু বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ নানা অপরাধ কর্মকান্ডে যুক্ত হতে পারে। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো যে, চরমভাবে নিগৃহীত ও ক্ষুব্ধ এ জনগোষ্ঠীকে স্বার্থান্বেষী মহল উগ্রবাদের পথে প্ররোচিত করতে পারে, যা শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো রিজিয়নকেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় জোনোসাইডের সব শর্ত পূরণ হচ্ছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জেনোসাইডের ১০টি শর্ত রয়েছে। রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় যার প্রতিটি পূরণ হচ্ছে। এটা বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে চলমান হত্যাযজ্ঞ।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন যাবৎ বঞ্চিত, নিগৃহীত। এ সংকটের আশু সমাধান প্রয়োজন। ৭১ এর পরে এ ধরনের জাতীয় দুর্যোগ আর আসেনি। এ সংকটের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়েছে ।

তিনি বলেন,এ সমস্যার সমাধান করতে দরকার জাতীয় ঐক্যের। আর জাতীয় ঐক্য না থাকার কারনেই বাংলাদেশ ক’টনৈতিকভাবে ব্যর্থ হতে চলছে। জাতীয় ঔক্য গড়ে তুলো ক’টনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। ভারত চীন এবং রাশিয়াকে নিয়ে এ সঙকটের মোকাবেলা করতে হবে। তা না হলে এ সংকট আরও প্রকট হবে।

ড. হামিদা হোসেন বলেন, আমাদের উচিৎ কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনটি নিয়ে কাজ শুরু করা। তিনি বলেন, সরকারকে বেসরকারি সংগঠন, সাধারণ জনগণ সকলকে নিয়ে এ সংকট সমাধানে কাজ করতে হবে। আর তা না হলে এ সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে।

মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, এ সংকটের ২টি দিক রয়েছে, একটি দিক হলো এতো লোক আশ্রয়হীন হয়ে আমাদের দেশে এসে পড়েছে, তাদের দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। অপরদিকটি হলো এসকল মানুষকে তাদের দেশে ফেরৎ পাঠাতে হবে।

তিনি বলেন, একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হয়েছে, যা অকল্পনীয় ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এ ব্যর্থতা শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের। এর দায় সারা বিশ^ বাসিকে নিতে হবে। এ জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ড. সি আর আবরার বলেন, কীভাবে যে তারা দিনাতিপাত করছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শিশুগুলো এতিমের মতো ঘুরে বেরাচ্ছে। গর্ভবতী নারীদের অবস্থাও শোচনীয়। ৭১ সালেও আমাদের এমন অবস্থার তৈরি হয়নি। কিন্তু আজ কেন আমরা এ প্রকট সংটকে। তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। ক’টনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আমাদের এ সংকট মোকাবেলা করতে হবে।

ভাসানচর ও বালুরচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের প্রস্তাবকে আত্মঘাতী মনে করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, যত দ্র্রুত বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়া যায় এবং এদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়া যায় তত ভালো। তাদের জন্য ভাসানচরে আলাদা করে ব্যবস্থা করার যে পরিকল্পনার এখনই কোনও প্রয়োজনে আছে বলে আমি মনে করি না। 

তিনি বলেন, আমার মনে হয় রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভাজন করার দরকার নেই, তারা সকলেই শরণার্থী। শুধুমাত্র যারা শেষে এসেছে তাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি প্রদান জরুরি। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে অবশ্যই ফেরত পাঠাতে হবে এবং এ জন্য আমাদের চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।

আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের সেনাবহিনী কর্তৃক রাখাইনে যে সহিংসতা ও সন্ত্রাস চালানো হয়েছে তা ভিন্ন মাত্রার। গণমাধ্যমের কারণে আজ এ ঘটনা সকলেই অবগত। এ ঘটনা হিচলারের নাৎসী বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। মিয়ানমার পূর্বপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিন চিন্তা করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, সুপরিকল্পিত ভাবে নির্যাতন দ্বারা রোহিঙ্গাদের ৭৮ সাল থেকেই মিয়ানমার থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, যে নেত্রীকে নিয়ে সারা বিশ্বে আলেচনা হয়েছিল। আজ তিনি ধ্বংসস্তুপের মধ্যে হারিয়ে গেছে।   

 এস এম আকরাম বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা কূটনৈতিকভাবে চরম ব্যর্থ হয়েছি। আমরা যাদের বন্ধু বলে মনে করি, বন্ধু বলে প্রচার করি, এ রকম পরিস্থিতিতে তারাই পাশে দাঁড়ায়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ