ঢাকা, শনিবার 14 October 2017, ২৯ আশ্বিন ১৪২8, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

একাদশ সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে ‘সামগ্রিক প্রস্তাবনা’ দেবে বিএনপি

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য অসুস্থ তরিকুল ইসলামের বাসায় তার সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে মিডিয়ায় ব্রিফ করছেন -সংগ্রাম

 

# আমাদের প্রস্তাবনা একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে -মির্জা ফখরুল

# সংলাপ চলাকালে বিরোধী নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার অস্থিরতা বাড়াবে -তরিকুল

স্টাফ রিপোর্টার: একাদশ সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে সহায়ক সরকারের ধারণাসহ নির্বাচন কমিশনকে ‘সামগ্রিক প্রস্তাবনা’ দেবে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার সকালে শান্তিনগরে ‘ইস্টার্ন পয়েন্ট’ অ্যাপার্টমেন্ট- এ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য অসুস্থ তরিকুল ইসলামের বাসায় তাকে দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। মির্জা ফখরুল অসুস্থ নেতার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেন। এ সময়ে তরিকুল ইসলামের স্ত্রী অধ্যাপিকা নার্গিস বেগম, ছেলে অনিন্দ্র ইসলাম অমিত উপস্থিত ছিলেন। তরিকুল ইসলামের সাথে রোববার নির্বাচন কমিশনের সাথে অনুষ্ঠিতব্য সংলাপের বিষয়বস্তু নিয়েও কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব। 

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা বড় টিম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সংলাপে যাবো এবং সেখানে গিয়ে আমরা লিখিতভাবে আমাদের সমস্ত প্রস্তাব তাদের সামনে তুলবো। ইট উইল বি এ ভেরি কমপ্রিহেনসিভ। আমি মনে করি যে, এটা (প্রস্তাবনা) একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে। মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা সংসদ বিলুপ্তির কথা সুস্পষ্টভাবে বলব, সেনাবাহিনী নিয়োগের কথা আমরা সুস্পষ্টভাবে বলব, নির্বাচনকালীন সময়ে যখন তফসিল ঘোষণা হবে তখন প্রশাসনকে যে ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে সে বিষয়েও বলব। আরপিও‘র কোথায় সমস্যা আছে সেটা বলব এবং ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে কী কী নিয়ম চালু করা উচিত, অবজারভারদের (পর্যবেক্ষক) ক্ষেত্রে কী কী নিয়ম থাকা উচিত- ডিটেলস আমাদের প্রস্তাবনায় থাকবে। 

তরিকুল ইসলামের সাথে বৈঠকের আগে নির্বাচন কমিশনের সংলাপ নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, আমরা এখনো বিশ্বাস করি যে, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব পালন করে তাহলে কিছুটা হলেও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব। আমাদের যে পারসেপশনটা তৈরি হয়েছে এই যে নির্বাচন কমিশনারের কথায় বা এর গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে, এই কমিশন কতটুকু সেটা পারবে বা তাদের যোগ্যতা আছে সে ব্যাপারে আমাদের প্রশ্ন আছে, আমরা সেই প্রশ্ন রেখেছি।

 আমরা বলেছি যে, এই সরকার যদি ক্ষমতায় থাকে, তাহলে এই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে সরকার প্রধানের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের কথা বলেছি যে, ক্ষমতার পাশাপাশি একটি দলের প্রধান হয়ে কখনো নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না। আমরা সেটি বলেছি। তারা যে সংবিধানের সংশোধনগুলো করেছে কতটুকু সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 

সরকার যদি ক্ষমতাসীন দলই থাকে তাহলে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে কিনা প্রশ্ন করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা বরাবরই বলেছি যে, এই সরকার যদি ক্ষমতায় থাকে তাদের অধীনে যদি নির্বাচন হয়, তাহলে সেই নির্বাচন কখনই সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে সরকার প্রধানের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের কথা বলেছি যে, এটা এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে যে, এখানে একটা পরিবর্তন আসা দরকার। তারা (ক্ষমতাসীন দল) সংবিধানে যেসব সংশোধনী করেছে, সেই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে সেটাও কিন্তু প্রশ্ন থেকেছে সংশোধনীর মধ্যেই। যেমন, পার্লামেন্ট ডিজোলবড(বিলুপ্ত) হবে না। পার্লামেন্ট ডিজোলবড না করলে কিভাবে নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে? আমাদের এখানে একটা ট্র্যাডিশন হয়ে আসছে, মানুষের মধ্যে একটা সাইকি তৈরি হয়েছে যে, সেনাবাহিনী নিয়োগ না করলে নির্বাচনে সুষ্ঠু অবস্থা আশা করা যায় না। এই বিষয়গুলো আমরা বলেই আসছি, সংলাপেও বলব।

সংলাপের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা আগে থেকে নেতিবাচক কথা বলতে চাই না। কিন্তু পুরো রাজনৈতিক যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, সরকার যে ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করছে, সরকার যে নির্বতনমূলক আইনগুলো করছে, সরকার যে প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এমন কি শেষ আশা-ভরসার স্থল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তারা সম্পূর্ণ হরণ করেছে। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমি স্পেকুলেট করতে পারি কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। আমাকে তো আশাবাদী হতে হবে, আমাকে তো পথ বের করতে হবে। পথ বের করার জন্যে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাবো। যেন আমরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারি, যেন সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন হয়।

 সহায়ক সরকারের রূপরেখার প্রস্তাবনা কী নির্বাচন কমিশনে দেবেন কিনা জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেবো না। আমরা তাদেরকে ধারণাটা দেবো। দি পারসেপশন উইল বি গিবেন এবং আমরা এটা বলব যে, এটা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। রূপরেখাটা আমরা পরে দেবো। 

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা থেকে সরকারের যে অপ-উদ্দেশ্য, তাদের যে হীন-উদ্দেশ্য তা একেবারে প্রকাশ্য। তারা (সরকার) বিরোধী দলকে নির্বাচনে আসতে দিতে চায় না। এটাকে টিকে রাখার চেষ্টা করে, এটা তারা করছে। জনগণের কাছে এটা পরিষ্কার। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময়ে দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ও চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে সরকার জোর করে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা গোটা জাতির কাছে পরিষ্কার যে প্রধান বিচারপতিকে তারা জোর করেই আজকে তাকে বিদেশে পাঠানোর সমস্ত ব্যবস্থা করছে। সকলের কাছে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট সরকার চেষ্টা করছে পুরোপুরিভাবে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ নেয়া, নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। যেহেতু তিনি (প্রধান বিচারপতি) ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের একটা রায় দিয়েছেন। যে রায়টা দেশের সত্য ঘটনাকে উৎঘাটন করেছেন, দেশের বর্তমান অবস্থাকে উৎঘাটন করেছে। এটা সরকারি দল সহ্য করতে পারছেন না। তারা মনে করছে এটা তাদের জন্য সমস্যা হবে। 

প্রশ্ন রেখে ফখরুল বলেন, আমার তো মনে হয় যে, সরকারের উচিত চিফ জাস্টিসকে কথা বলতে দেয়া। তারা দিচ্ছেন না কেনো? বিএনপি মহাসচিব বলেন, তারা (সরকার) নিজেরা বলছেন যে এটা হচ্ছে, এই হচ্ছে - ওই হচ্ছে। আমরা যে সমস্ত খবর পাচ্ছি, পত্রিকায় যেটা হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়াতে যেটা আসছে তাকে (প্রধান বিচারপতি) সম্পূর্ণ জোর করে....। শুধু আমাদের নয়, ইন্ডিয়ান মিডিয়াতেও এসে গেছে, দুই-তিনটা চ্যানেলে নিউজ আসছে। 

অসুস্থ তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, দেশের মানুষ একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। এখন আমরাসহ সমস্ত রাজনৈতিক দলই এটা দেখতে চাই। এমনকি গতকাল (বৃহস্পতিবার) সিপিবি বলেছে, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে, একই কথা অন্যান্য দলও বলছে। এখন বিষয়টা নির্ভর করছে সরকার এটা কিভাবে নেবে তার ওপর। আমরা চাই দেশের একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচন কমিশনের সংলাপ চলাকোলে বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারেরও সমালোচনা করেন তিনি। তরিকুল বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন একদিকে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছে। অন্যদিকে বিরোধী নেতাকর্মীদের মিথ্য্ ামামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমনকি বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার জারি করা হচ্ছে। এগুলো কি সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষণ? 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে পরামর্শ পেতে গত ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসার মধ্য দিয়ে সংলাপ শুরু করে নির্বাচন কমিশন। এরপর ১৬ ও ১৭ অগাস্ট গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর ২৪ অগাস্ট থেকে শুরু হয় নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ। এবার দলগুলোকে নিবন্ধনক্রমের নিচ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সে হিসাবে বিএনপির জন্য ১২ অক্টোবর ও আওয়ামী লীগের জন্য ১৫ অক্টোবর সংলাপের তারিখ প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বিএনপি দলীয় কর্মসূচির কথা বলে ১৫ অক্টোবর বসতে চাইলে তাদের জন্য সেই দিনই ঠিক হয়। আর আওয়ামী লীগের অনুরোধে তাদের সংলাপের জন্য ১৮ অক্টোবর তারিখ রাখা হয়। এ কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে আসা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ এই সংলাপকে বলেছিলেন ‘আইওয়াশ’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ