ঢাকা, শনিবার 14 October 2017, ২৯ আশ্বিন ১৪২8, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অবশেষে যান চলাচলের অপেক্ষায় মগবাজার- মৌচাক উড়াল সড়ক

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নির্মাণ ব্যয় দু‘শ ৫৫ শতাংশ বাড়িয়ে নজির স্থাপনকারী প্রকল্পের খাতায় নাম লিখিয়েছে “মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক ” প্রকল্পটি । স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) নেয়া এই প্রকল্পটির নির্মাণকাল দফায় দফায় বাড়িয়ে চার বছরে নিয়ে ঠেকানো হয়েছে । যদিও এই প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় শুরুতে ছিল ৩‘শ ৪৩ কোটি টাকা ও সময় ছিল দু‘বছর । কিন্তু তার কোনটাই নির্ধারিত না থেকে অনির্ধারিত একটি প্রকল্পে রুপ নেয় । যার কারণে এই প্রকল্পটি একদিকে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয় , অপরদিকে জনদুর্ভোগের মাত্রা বাড়ায় । শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পটির শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার পর এখন উদ্বোধনের অপেক্ষা । সেটাও দফায় দফায় পরিবর্তনের পর এবার প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতার জন্য অপেক্ষা । চলতি মাসের ১৫ তারিখে এটির উদ্বোধনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করে রাখা হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসুস্থতার জন্য ওই তারিখ পেছানো হয়েছে । তাঁর সুস্থতার উপর নির্ভর করছে উদ্বোধনের দিনক্ষণ । উদ্বোধনের পরই যান চলাচলের জন্য উড়াল সড়কটি খুলে দেয়া হলে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গতা পাবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা ।

জনদুর্ভোগের জন্য বহু আলোচিত-সমালোচিত মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কের এ পর্যন্ত ৩ ধাপে প্রকল্পের ৩ অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু একমাত্র হলিফ্যামিলি থেকে সাত রাস্তা পর্যন্ত অংশ ছাড়া অন্য দুটি অংশে যান চলাচল কম। এ জন্য দায়ী করা হচ্ছে ডিজাইনের ত্রুটিকে। এ মাসের ১৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধন করার কথা ছিল সর্বশেষ রাজারবাগ, শান্তিনগর এবং মালিবাগ অংশের । এর আগে সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর ফ্লাইওভারের এ অংশ চালুর সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু সে সময় প্রধানমন্ত্রীর সিডিউল পাওয়া না যাওয়ার কারনে উদ্বোধন পিছিয়ে যায় ।যদিও সে সময়ে প্রকল্পটির শেষ মুহুর্তের ছোটখাটো কাজগুলো চলছিল । এরপর তড়িঘড়ি করে বাকী কাজগুলো শেষের জন্য দিনরাত কাজ চলে । একপর্যায়ে সকল কাজ শেষ করে এনে উদ্বোধনের সম্ভাব্য তারিখটি চলতি মাসের ১৫ নির্ধারন করা হয় । এখন আশংকা করা হচ্ছে , এ উড়াল সড়কটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বাংলামোটর, সোনারগাঁও হোটেল এবং শান্তিনগরে বড় ধরনের যানজটের সৃষ্টি হবে।

জানা যায়, যানজট নিরসন করে ঢাকাবাসীর নির্বিঘœ চলাচল নিশ্চিত করতে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক প্রকল্প গ্রহণ করা হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে। আর প্রকল্পটি একনেক অনুমোদন করে ২০১১ সালের ৮ মার্চ। ৮ দশমিক ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট এ উড়াল সড়কের প্রথম নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৩৪৩ কোটি টাকা। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে নির্মাণ ব্যয় দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষ ব্যয় বৃদ্ধি করায় আকার দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৯ কোটি টাকায়। যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২৫৫ শতাংশ বেশি। কাজ শুরু করার পর কয়েকবার সংশোধন করা হয়েছে নকশাও। এ ছাড়া একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে কয়েক ধাপে বাস্তবায়নে উড়াল সড়কটির প্রকৃত সুফল থেকে নগরবাসী বঞ্চিত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। যদিও প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। এ প্রকল্পের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সময় ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়। এরপর প্রথম দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করতে না পারায় আবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়াল সড়কটির অবশিষ্টাংশ চালুরও ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কাজ শেষ না হওয়ায় সর্বশেষ তিন মাস সময় বাড়ানো হয়। প্রকল্প চলাকালীন সব মিলিয়ে সময় বেড়েছে প্রায় চার বছর।

সরকারের এই মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকার এবং সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসডিএফ) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি)। কিন্তু শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট ঠিকাদার আর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে বিভিন্ন ক্রটি সংশোধনের নামে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতি শুরু হয়। ফলে প্রকল্প এলাকায় দেখা দেয় ভয়াবহ জনদুর্ভোগ। এভাবে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক প্রকল্পে চার বছর সময় ও ২৫৫ শতাংশ ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। যা দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল উড়াল সড়ক বলে সমালোচিত হচ্ছে। বিপুল অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি ধীরগতির কাজের কারণে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হয়েছেন নগরবাসী। অসতর্ক উন্নয়ন কাজের কারণে কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণে মানুষ মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক প্রকল্পকে মানুষখেকো ফাঁদ হিসেবে অবহিত করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার এসব কান্ড সরকারকে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি করে। অবশেষে ব্যর্থতা, গ্লানির পাঠ চুকিয়ে এখন পরিপূর্ণরূপে দৃশ্যমান হয়েছে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক। গত কয়েকদিন ধরে উড়াল সড়কটির সর্বশেষ অংশে রাতের বেলায় আলো জ্বলতে দেখা গেছে । এতে করে নাগরিকমন ভোগান্তি আর দুর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার যে অপেক্ষা ছিল , তার সমাপ্তির স্বপ্ন দেখছেন । 

উড়াল সড়কের এ অংশ চালু হলে সাতরাস্তা, এফডিসি, মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর, মালিবাগ ও মগবাজার রেলক্রসিং এলাকায় নির্বিঘেœ যানবাহন চলাচল করতে পারবে। এর আগে সাতরাস্তা-মগবাজার হলিফ্যামিলি হাসপাতালের সামনের অংশ চালু করা হয় গত বছরের ৩০ মার্চ। এরপর ইস্কাটন-মগবাজার ওয়্যারলেস পর্যন্ত অংশ চালু হয় ১৫ সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের শুরুতে হোটেল সোনারগাঁও থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত অংশ চালু করা হয়। সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অবকাঠামোর নির্মাণ কাজ শেষ। রাস্তায় শেষ পর্যায়ের কার্পেটিং ও ঢালাইয়ের কাজও শেষ। মৌচাক থেকে মালিবাগ অংশে বিম সমন্বয় এবং ঝালাইয়ের কাজ চলছে। উদ্বোধনের আগে নিচের সড়ক এবং আশপাশের এলাকা ঝকঝকে, তকতকে করা হচ্ছে ।

মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এলজিইডির তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুশান্ত কুমার পাল গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদককে বলেন, উড়াল সড়কের সর্বশেষ কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য প্রকল্প এলাকা বিশেষভাবে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে রংও করা হচ্ছে। তিনি জানান , প্রধানমন্ত্রী এখন অসুস্থ । তাই ১৫ অক্টোবর এটির উদ্বোধন হচ্ছে না । তিনি সুস্থ হওয়ার পরই নতুন করে দিনক্ষন ঠিক করে প্রকল্পটির বাকী অংশের উদ্বোধন করা হবে । তারপর যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে । এর মাধ্যমেই পুরো উড়াল সড়কটির যাত্রা শুরু হবে ।

জানতে চাইলে সুশান্ত বলেন , উদ্বোধনের আগে কাজ শেষের মাধ্যমে প্রকল্পটির বাকী অংশ যানবাহন চলাচলের উপযোগী হলেও তা খুলে দেয়া হচ্ছে না । কারন প্রধানমন্ত্রী এটির উদ্বোধন করবেন । এখন প্রধানমন্ত্রী যদি বলেন , যানবাহন চলাচলের জন্য উড়াল সড়কটি খুলে দেয়ার জন্য তাহলেই সেটি সম্ভব ।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক বলেন, যানবাহন চলাচল অব্যাহত রেখেই মগবাজার-মৌচাক প্রকল্পের কাজ করতে হয়েছে। যেখানে মানুষ দাঁড়াতেই পারে না। সেখানে এত বড় একটা প্রকল্প‘র কাজ করাটা কতটা কঠিন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা মাত্র ৭ ঘণ্টা এর নির্মান কাজের সময় পেয়েছি। তা ছাড়া ইউটিলিটি লাইন ঠিক রেখে কাজ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিইডি) মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের ব্যাখ্যা হচ্ছে, প্রকল্প এলাকায় ইউটিলিটি লাইন থাকায় কাজ চলমান অবস্থায় স্থানভিত্তিক প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি পাইল ও ফাউন্ডেশনের ডিজাইন পৃথকভাবে করতে হয়। ফলে সার্বিকভাবে পাইল সংখ্যা ১৯৬টি, পাইলের দৈর্ঘ্য ১৭ হাজার ৯১৫ মিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। পাইলের ক্যাপ ও আকার বেড়ে যায়। তা ছাড়া ইউটিলিটি পরিসেবা অক্ষুণ্ণ রেখে ফাউন্ডেশনের ডিজাইন করায় কাজের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ভূমিকম্প সহনীয় করতে পট বেয়ারিং ও সক ট্রান্সমিশন ইউনিট সংযোজন, ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য এফডিসি গেট থেকে সেনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত ৪৫০ মিটার বৃদ্ধি করা, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশ মতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) তুলনায় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অতিরিক্ত ৭৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষর, পরামর্শক সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের প্রকল্প সহায়তা বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে।

প্রকল্পটির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ( এমডি ) নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান ভ’ইয়া মানিক গতকাল সকালে জানান , সহসাই উদ্বোধন হচ্ছে না । প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতার ওপর সব নির্ভর করছে । তাঁর সময় পেলেই উদ্বোধনের দিনক্ষন পুন: নির্ধারণ করা হবে ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ