ঢাকা, শনিবার 14 October 2017, ২৯ আশ্বিন ১৪২8, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় সোনালী ব্যাংকের চার শাখায় খেলাপী ঋণ ১২শ’ কোটি টাকা

খুলনা অফিস : রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক লিমিটেডে খেলাপী ঋণের কারণে নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়েছে। খুলনায় ব্যাংকের চারটি শাখা লোকসানী ও ঋণ খেলাপী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শাখাগুলোতে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ১২শ’ ৫৬ কোটি টাকা। খেলাপী ঋণ আদায়ে উল্লেখ্যযোগ্য কোন অগ্রগতি নেই। আইনের নানা ফাঁক-ফোঁকড়ে ঋণ খেলাপী পাট রফতানিকারকরা শুধুমাত্র কালক্ষেপন করছেন। শাখাগুলো হচ্ছে খুলনা করপোরেট শাখা, দৌলতপুর করপোরেট শাখা, দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা ও খালিশপুর শাখা। খেলাপী তালিকার উল্লেখ্যযোগ্য প্রতিষ্ঠান খুলনা নিউজ প্রিন্ট মিলস্। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন ও সোনালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। মোট ঋণের ৮৪ শতাংশ খেলাপী। গুরুত্ব ও অনিয়ম, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারাও অর্থ আত্মসাত করেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ লুটের সাথে সোনালী ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহযোগিতার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা হয়েছে, খেলাপী ঋণের মধ্যে খুলনা করপোরেট শাখায় ৩৭০ কোটি টাকা, দৌলতপুর করপোরেট শাখায় ৪৭১ কোটি টাকা, দৌলতপুর কলেজ রোড শাখায় ৩৪৩ কোটি টাকা ও খালিশপুর শাখায় ৭২ কোটি টাকা।

সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম শাহজাহান আলী শেখ জানান, খেলাপী ঋণ গ্রহিতাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত নীতিমালার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। যারা এ আওতায় আসবে না তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ঋণ খেলাপী ইস্টার্ন ট্রেডিং নামক প্রতিষ্ঠান।

খালিশপুর শাখার ম্যানেজার মফিজুল ইসলাম জানান, ১৪টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭২ কোটি টাকা দীর্ঘদিন বকেয়া হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য খেলাপী বাবুল জুট ট্রেডিং, পাপেন জুট ট্রেডিং ইত্যাদি। এদের বিরুদ্ধে এখনো মামলা দায়ের করা হয়নি। নীতিমালার আলোকেই মামলা দায়ের করা হবে।

দৌলতপুর কলেজ রোড শাখার ম্যানেজার জানান, ১৯জন ঋণ খেলাপীকে লিগ্যাল নোটিশ দেয়া হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে নীতিমালার আওতায় না আসলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। জুলাই থেকে পাট মওসুম শুরু হলেও এখনো ঋণদান প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।

সোনালী ব্যাংক খুলনার জিএম মো. মোশাররফ হোসেন জানান, ঋণ অনিয়মের অভিযোগে দুদক অনেক ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। ঋণ অনিয়মের কারণে ব্যাংকের এক সময়কার জিএম নেপাল সাহার বিরুদ্ধে মামলা ও তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি এখন ব্যাংকের কোন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত নেই। কোনরকম যাচাই-বাছাই না করে অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করা হয়েছে।

এদিকে মিরেরডাঙ্গাস্থ সোনালী জুটমিলের  মালিক এস এম এমদাদুল হোসেন বুলবুল ৮৫ কোটি ৮০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা সোনালী ব্যাংকের করপোরেট শাখা থেকে ঋণ নেয়। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে কাঁচা পাট ক্রয় না করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজসে ওই পরিমাণ টাকা আত্মসাত করে। যা সুদাসলে এখন দাঁড়িয়ে ১২৬ কোটি ৮২ লাখ টাকায়। এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন বাদি হয়ে খানজাহান আলী থানায় পাঁচ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন। এ মামলার আসামীরা হল জুটমিলের মালিক এসএম এমদাদুল হোসেন বুলবুল, সোনালী ব্যাংক খুলনা করপোরেট শাখার ডিজিএম (বরখাস্ত) নেপাল চন্দ্র সাহা, এ্যাসেস্ট্যান্ট অফিসার কাজী হাবিবুর রহমান, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার শেখ তৈয়েবুর রহমান ও সাবেক ডিজিএম সমীর কুমার দেবনাথ।

মিরেরডাঙ্গা এলাকায় ১৯৬৮ সালে স্থাপিত এই মিলটি ৭২ সালের জাতীয়করণ করা হয়। লাভজনক না হওয়া ১৯৮৩ সালে বিরাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে ইসলাম গ্রুপ অপ ইন্ডাস্ট্রিজের নিকট হস্তান্তর করা হয়। ১৯৯৮ সালে আবার মালিকানা পরিবর্তন হয়। চেয়ারম্যান এস এম এমদাদুল ইসলাম বুলবুল এবং ম্যানেজিং ডাইরেক্টর লিয়াকত হোসেন মিল পরিচালনা দায়িত্ব পালন করছেন। এ আত্মসাত মামলা স্থানীয় সিএমএম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আদালত মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

অপরদিকে, ৮২ কোটি টাকা পাওনা আদায়ের জন্য উত্তরা ব্যাংক স্যার ইকবাল রোড শাখা সোনালী জুট মিলের পাঁচ জনের বিরুদ্ধে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়ের করেছে।

অপরদিকে নগরীর বিকে রায় রোডস্থ মৃত সোহরাব আলীর ছেলে মেমার্স ভিভা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক এস এম মনিরুল ইসলাম ও জনতা ব্যাংক খুলনা করপোরেট শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার (অব.) এমএ বারীর বিরুদ্ধে ব্যাংকের এজিএম মিসেস মনোয়ারা খাতুন বাদি হয়ে খুলনা থানায় মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় উল্লেখিত দু’জনের বিরুদ্ধে ব্যাংকের নয় কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট দুদকের সহকারী পরিচালক এস এম শামীম ইকবাল চার্জশিটে উল্লেখ্য করেন আমদানিকারক মনিরুল ইসলাম ১৯৯৯ সালের ২৮ জুন জনতা ব্যাংক করপোরেট শাখার মাধ্যমে ইউনাইটেড আরব আমিরাত থেকে জিটিএসপি সার আমদানির জন্য এলসি খোলেন। এলসির বিপরীতে মেমার্স নেগালফ ইন্টারন্যাশনাল দুবাই-এর অনুকূলে জনতা ব্যাংক খুলনা করপোরেট শাখা দুবাইয়ের স্ট্যান্ডার চ্যার্টার ব্যাংকে উল্লেখিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে। আমদানিকারক মনিরুল ইসলাম অবৈধ যোগসাজসে ব্যাংক কর্মকর্তা এমএ বারীকে সুবিধা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে মাল খালাস করে সমূদয় টাকা আত্মসাত করেন।

চার্জশিটে উল্লেখ্য করা হয়েছে, আমদানিকারক ব্যাংকের পাওনা টাকা পরিশোধ করেননি। মামলাটি মহানগর দায়রা জজ চার্জশিট গ্রহণ করে বিভাগীয় বিশেষ ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করেছে। আসামীরা জামিনের পর বেশকিছু দিন পলাতক থাকায় আদালত তাদের হাজির হবার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সরকার পক্ষের আইনজীবী খন্দকার মুজিবর রহমান জানান, আমদানিকারক মনিরুল ইসলাম গত ২ অক্টোবর আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর হয়। গত মঙ্গলবার আবারও আবেদন করলে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ