ঢাকা, শনিবার 14 October 2017, ২৯ আশ্বিন ১৪২8, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মুহাম্মদ মাহদী আকিফ চেতনার শোনিত ধারা!

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : মানব জীবনে মৃত্যু অবধারিত। পৃথিবীর সব কিছু থেকে পলায়ন করা সম্ভব হলেও মৃত্যু থেকে পলায়ন করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এ কথা বিশ্বের সব দেশের সব ভাষার এবং সব শ্রেণীর মানুষ বিশ্বাস করে। কারণ অদ্যাবধি পর্যন্ত যতো মানুষ দুনিয়াতে এসেছে কেউ চিরস্থায়ী হিসেবে থাকতে পারেনি আর যারা ভবিষ্যতে আসবে তারাও চিরস্থায়ী হবে না। তারপরও মানুষ মানুষকে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে বিনা কারণে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধীতার কারণে নিরঅপরাধ মানুষকে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠীরা আল্লাহ্র আলোকে নিভিয়ে দিতে চেয়েছে।  ফেরাউন, নমরুদ আবুজেহেল তারাও চেয়েছিল আল্লাহর আলোকে নিভিয়ে দিতে কিন্ত পারেনি। এ যুগেও আমরা লক্ষ্য করেছি যারাই এক আল্লাহর দাওয়াত মানুষের কাছে পেশ করার চেষ্টা করেছে তাদের উপর স্বৈরশাসকেরা নির্মম নির্যাতন প্রয়োগ করেছে। আকিফ এমনকি মিথ্যা অপবাধ দিয়ে অনেককে দুনিয়া থেকে বিতাড়িত করেছে। কিন্তু ইতিহাস স্বাক্ষী কোন স্বৈরশাসকই সফল হয়নি। কারণ মিথ্যার জয় জোয়ার ভাটার মতো। আর সত্যের জয় পূর্ব আকাশের সূর্যের মতো। গত ২২ সেপ্টেম্বর মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সাবেক চেয়ারম্যান বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন ও মুসলিম উম্মার অনুপ্রেরণার এক হীরক খন্ড মুহসিন বান্দা মুহাম্মদ মাহদী আকিফ মিসরের স্বৈরাচার সরকারের জেলখানায় ৮৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। এই পরিস্থিতিতে তার চলে যাওয়া মানে ইতিহাসের খসে পড়া তারার পতন। তার কন্যা আলিয়া মাহদী আকিফ মিডিয়াকে জানানা,তার বাবার শারীরিক অবস্থা খবুই খারাপ। তারপরও তাকে জেলখানার অন্ধকারে থাকতে বাধ্য করা হয়। কন্যা আলিয়া মাহদী আকিফ তার ফেসবুকের মাধ্যমে বাবার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করার পর মন্তব্য লেখেন,‘আমার বাবা এখন আল্লাহর কাছে। মেহদি আকিফকে ঠান্ডামাথায় ফৌজদারি মামলায় ফাসানো হয়। তার অপরাধ আরব বসন্তকে তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে সামনে কাতারের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। সমাপ্ত হয় তার সুদীর্ঘ  বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের উপ্যাখান। তাঁর মৃত্যুতে শুধু মিসর নয় বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। শুধুমাত্র মিসরে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র কায়েমের জন্য সংগ্রাম করেছেন তা কিন্তু নয়! বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলনের অগ্রজ হিসেবে তিনি ১৯৮১ সালে বাংলাদেশেও সফর করেছেন।
কালেমার দাওয়াত দেয়ার অপরাধে স্বৈরশাসক সরকার বয়োবৃদ্ধ ইসলামের এই দায়ীকে কারাগারের অন্ধকারে আটক রেখে আবারও প্রমাণ করেছে নাসের উত্তরসূরী হিসেবে সিসি শতভাগ সফল। মাহদী আকাফের দাওয়াতী মিশন শুধু মিসর নয়,দুনিয়ার সকল ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে চিরকাল। প্রতিটি মানুষের মৃত্যুকেই মানুষ আজীবন মনে রাখে না। তবে কিছু মানুষের মৃত্যু অমরত্ব ও অবিস্মরণীয় হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত হাজারো মানুষকে প্রেরণা জোগায়। মহান এই নেতা সিসির কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহ্তালার সান্নিধ্যে, যেখানে স্বৈরশাসক ও জালিমের প্রবেশাধিকার করার অনুমতি নেই। তবে আজীবন তিনি বেঁচে থাকবেন মুসলিম মিল্লাতের হৃদয়ের মণিকোঠায়। এই বীর মুজাহীদের মৃত্যর সংবাদ শুধু মিশরে নয়, সারা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের কাঁদিয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের এই প্রাণপুরুষ সর্ম্পকে দুটো কথা লেখার নূন্যতম যোগ্যতা আমার নেই। তারপরেও ইতিহাসের পাঠ থেকে এই মজলুম নন্দিত জ্ঞানী মানুষের জীবনকথা নির্যাতিত ইসলামী আন্দোলনের ভাইবোনদের খেদমতে পেশ করছি।
জন্ম ও শিক্ষা জীবন : নীল নদের দেশ মিসর, ফেরাউনের দেশ মিসর, পিরামিডের দেশ মিসর, জামাল নাসেরের দেশ মিসর, হাসানুল বান্না ও সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের দেশ মিসর। এই মিসরে বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের বীর মুজাহিদ মাহদী আকিফ ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে মিশরের জন্ম গ্রহণ করেন। ইখওয়ানুল মুসলিম সংগঠনটি তাঁর জন্মের বছরেই প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা জীবন শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক সার্টিফিকেট অর্জন করার পর ১৯৫০ সালের মে মাসে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজেকে শিক্ষাগত পেশায় আত্মনিয়োগ করেন।
রাজনৈতিকী জীবন ও কারাবরণ : বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মাহাদী আকিফ ছিলেন একাধারে মিসরের ইসলামী রাজনৈতিক রূপকার ও আধ্যাত্মিক নেতা। মিসরের আধুনিক রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন মাহাদী আকিফ। তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বিভিন্ন সময় কারাবরণ করতে হয়েছে। দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে জীবনে বহুবার জেল,জুলুম,অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছেন। ১৯৪০ ইখওয়ানে যোগদান করেন। ১৯৫৪ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসেরের ব্যর্থ হত্যাকা-ের প্রচেষ্টা ইখওয়ানের ওপর চরম নির্যাতনের ষ্টিম রোলার প্রয়োগ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বিনা অপরাধে মাহদী আকিফকে ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মাহদী আকিফ ছিলেন। পঞ্চাশ দশকের দিকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অপরাধে মিসরের তৎকালিন সরকার প্রধান ফারুক প্রথমবার তাকে গ্রেফতার করে দেশ থেকে বিতাড়িত করে।
সারাটা জীবন ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ হিসেবে আল্লাহর রাহে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে জীবনের সিংহভাগ জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। উল্লেখ্য তিনি ২০০৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি মিসরের গণতান্ত্রিক নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে অপসারণ করে ক্ষমতার দাপটে গণহারে মুসলিম ব্রাদারহুডের হাজারো নেতা কর্মীকে গ্রেফতার করে। মুরসি সরকারের পতনের পর মাহদী আকিফকেও গ্রেফতার করা হয়। মৃত্যুর প্রায় ১০ মাস আগে অসুস্থতার কারণে কারাগার থেকে তাকে কায়রো হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে জেনারেল সিসি সেনা অভ্যুত্থানের পর সামরিক আদালত তাকে ২৫ বছর জেল দেয়। ২০১৬ সালে মিসরের আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ২০০৪ সালে তার নেতৃত্বে  সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে মুসলিম ব্রাদারহুড অগ্রসর হয়। ২০১১ সালের নীরব ভোট বিপ্লবের পূর্বে সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয় ব্রাদারহুড। ২০০৯ সালে জর্দানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইসলামিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এক জরিপে মাহদী আকিফ বিশ্বের প্রভাবশালী মুসলিম নেতাদের মধ্যে ১২তম স্থান লাভ করেন । বিশ্বব্যাপী ইসলামি নেতাদের কাছে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ছিল। ২০১০ সালে স্বেচ্ছায় তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
মৃত্যুতেও স্বৈরসরকারের ভয় : মানুষ মরে গেলে তাঁর সাথে শত্রুতা থাকলেও তা বিবেকের তাড়নায় ভুলে যায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন স্বৈরাচাররা তা ভুলে না। যেমনটি ভুলেনি মিসরের স্বৈরশাসক জেনারেল সিসি। মোহাম্মদ মাহদী আকিফের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকার তার দাফন সম্পন্ন করতে বাধ্য করেছে তার পরিবারকে। একান্ত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সদস্য ব্যতিত আর কাউকে জানাযায় উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়নি দেশটির সরকার। জীবিত অবস্থায় ইসলামের এই দায়ী সামরিক শাসকদের যতটা তটস্থ রেখেছিলেন,মৃত্যুর পর যেন সেটি আরো বেড়ে যায়। জীবিত আকিফের মতোই যেন তার লাশকেও ভয় করতে থাকে জান্তা সরকার। ইতিহাস স্বাক্ষী অতীতেও মিসরের স্বৈরশাসক সরকার সাইয়েদ কতুব শহীদের জানাযায় সাধারণ মানুষদের অংশগ্রহণ করার অনুমতি দেয়নি। মিসরের কথা না হয় বাদই দিলাম। পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও আজ ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের জীবনকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বশবর্তী হয়ে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসক ওইসব আল্লাহর দায়ীদেরকে দুনিয়া থেকে বিতাড়িত করে ইসলামের আলোকে চিরতরে নিভিয়ে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তারা সফল হয়নি। কারণ মানবের মৃত্যু যে কোন ভাবেই নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু একটি আর্দশবাদী আন্দোলনের মৃত্যু ঘটানো যায় না। এটা স্বৈরশাসকদের মনে রাখা প্রয়োজন। লিবিয়ার ঔপনিবেশিকতা বিরোধী নেতা ওমর আল মুখতারের সাথে একই ধরনের আচরণ করেছিল দখলদার ইতালির বাহিনী। ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আল মুখতারের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করছিল ঔপনিবেশিক শাসকেরা। ৭৩ বয়সী আল মুখতারকে আটকের পর গোপনে বিচারকার্য করে ইতালি।
এমনকি তার জানাজা ও দাফন হয়েছে অত্যন্ত গোপনে ও সেনা পাহারায়। এই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত ইতালির শাসনের কবর রচনা করেছিল আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশটিতে। মাহদী আকিফের রক্ত জুলুমবাজদের পতন ত্বরান্বিত করে ইউসুফ আলাইহিস সালামের দেশ মিসরে আবারো কালেমার পতাকাকে উড্ডীন করবে ইনশাল্লাহ। জীবিত ও মৃত আকিফের সাথে স্বৈরাচার সরকার যে আচরণ করেছে তার বিচার আল্লাহতায়ালা নিশ্চয় করবেন। সিসির সামরিক সরকার মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর নিপীড়ন জুলম নির্যাতনের ষ্টিম রোলার প্রয়োগ করলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ছিল পুরোপুরি নীরব। কিন্তু কেন? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দুনিয়ার সকল ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের প্রধান দায়িত্ব। মুহাম্মদ মাহদী আকিফের বহুবিদ প্রতিভা বিশ্ববাসীকে কেবল অবাক করেই দেয় না, আত্মবিশ্বাসী মানুষকে সামনে চলার পথ ও বাতলে দেয়। মহান আরশের মালিকের কাছে মিনতি করছি, তিনি যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করে নেন। আমিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ