ঢাকা, শনিবার 14 October 2017, ২৯ আশ্বিন ১৪২8, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উপমহাদেশের প্রথম ইউরোপ ভ্রমণকারী ব্যক্তি

মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ইতিসামুদ্দিন বাংলা ১১৭০ সনের ১৩ মাঘ তারিখে কলকাতার হিজলি ঘাটে মাঁসিয়ে সোরভিলের জাহাজে চড়ে যাত্রা করেন। কাজি আলিমূল্লাহ তাঁকে বিদায় দিতে আসেন। মোহাম্মদ মুকিমকে পরিচারক হিসেবে সাথে নেন। পালের জাহাজে ছয় মাস চলার পর তিনি ইংল্যান্ডে পৌঁছে যান। পথে মরিশাস, উত্তমাশার সেন্ট লুইস, কলোন ইত্যাদি বন্দর পরিদর্শন করেন। ইতিসামুদ্দিন যে উদ্দেশ্য নিয়ে লন্ডনে যান, তা সফল হয়নি। ক্লাইভ ষড়যন্ত্র করে বাদশাহর পত্র ও উপঢৌকন কলকাতায় রেখে দেন, পরের বছর তিনি নিজেই সে সব লন্ডনে নিয়ে যান। ইতিসামুদ্দিন জাহাজে ক্যাপ্টেন সুইন্টের মুখে এই ষড়যন্ত্র ও বঞ্চনার কথা শোনেন।  কিন্তু তখন তাঁর কিছুই করণীয় ছিল না। দেশে প্রত্যাবর্তন করেও তিনি কিছু করতে পারেননি এবং করার মত কোন ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। ইতিসামুদ্দিনের এই দুর্বলতা ছিল সমস্ত জাতিরই দুর্বলতা।
ইতিসামুদ্দিন এক বছর ইংল্যান্ডে অবস্থান গ্রহণ করেন। এই এক বছর তিনি ল-ন ও এডিনবরা শহরে থেকে বিচিত্র মানুষ, মানুষের জীবনযাত্রা, যানবাহন, ঘরবাড়ি, রাজপ্রাসাদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঐতিহাসিক স্থান ইত্যাদি দেখে সময় অতিবাহিত করেন। এডিনবরায় ক্যাপ্টেন সুইন্টের বাস্তভিটা ছিল, তিনি তাঁর সাথে সেখানে যান। তিনি ল-নের যাদুঘর, মানমন্দির, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি পরিদর্শন করেন এবং ইংরেজদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি দেখে বিস্মিত হন। ভারতীয়দের তুলনায় ইংরেজগণ যে উন্নত ও সভ্য জাতি, তা তিনি প্রায় প্রতিটি ব্যাপারে অনুভব করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে তিনি ইউলিয়াম জোনস ও ড. হান্টের সাথে পরিচিত হন।  ইউলিয়াম জোনস পরে কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের জজ হন।  তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা (১৭৮৪)। সুইন্টন, ড. জুলিয়ান প্রমুখ ব্যক্তি তাঁকে ল-নে থেকে ফারসি শেখাবার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি স্বজন ও স্বদেশের কথা ভেবে সম্মত হননি। মাতৃভূমির হাতছানি তিনি বারবার অনুভব করেছেন। ‘সোলেমানেসর সিংহাসন থেকে মাতৃভূমির মমতা বেশি, জন্মভূমির কাঁটাও পরদেশের ফুলের চেয়ে উত্তম। ইউসুফের কাছে মিশরে রাজত্ব করার চেয়ে কাননদেশে ভিখারি হওয়া অধিক প্রিয় মনে হত।’’
এরূপ ফারসি বয়াতের কথা স্মরণ করে তিনি অভুভূত হতেন। অবশেষে ইতিসামুদ্দিন কাউন্সিল সদস্য মিঃ মিজে-ের সাথে জাহাজে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ১১৭৩ সালের কার্তিক মাসে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি এ সব তথ্য স্বরচিত ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘শিগুর্ফনামা-এ-বেলায়েত’ (১৭৮৪) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। এই গ্রন্থ রচনার প্রেরণা ও প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য-‘১১৯৯ হিজরিতে (১৭৮৪ খ্রি.) যখন এই দীন লেখক অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন, চারদিকের বিশৃংখলায় যখন সে দুর্দশা গ্রস্থ এবং তাঁর মন অশান্ত ও তাঁর চিন্তা শক্তি লুপ্তপ্রায় হয়ে গিয়েছিল তখন বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে এই বৃত্তান্ত লিখতে বাধ্য হয়। তাঁর উদ্দেশ্য- পাঠকের উপকারের জন্য তার বিদেশ যাত্রার সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করা। সে অত্যন্ত সংযত ভাষা ব্যবহার করছে কারণ ভাষা নিয়ে চতুরতা  বা ভেল্কিবাজীর ভাষা  ও চিন্তাশক্তির বিলাসিতা ও অপব্যয় মাত্র। কয়েকটি অদ্ভুত ঘটনার এই বিবৃতির সে নামকরণ করছে ‘শিগুর্ফনামা-এ-বেলায়েত’ এবং কালের পাতায় তার স্মৃতি চিহ্ন রূপে এই পুস্তকটিকে রেখে যাচ্ছে।
শিগুর্ফনামা ইতিসামুদ্দিনের প্রথম এবং প্রধান গ্রন্থ। তাঁর পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে দ্বিতীয় গ্রন্থের নাম হল ‘নসবনামা’। ‘শিগুর্ফনামা’ গ্রন্থটি মুদ্রিত আকারে কখনও প্রকাশিত হয়নি। ১৮২৭ সালে ক্যাপ্টেন জে. ই. আলেকজা-ার এর সংক্ষিপ্ত ইংরেজি অনুবাদ করে ল-ন থেকে প্রকাশ করেন। উনিশ শতকে তার আর কোন আলোচনা হয়নি। বিশ শতকের দুই দশকে ‘ঢাকা রিভিউ’ পত্রিকায় ‘বেলায়েতনামা’ শিরোনামে উক্ত গ্রন্থের প্রথম তিন অধ্যায়ের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অনুবাদ করেন আবদুল আজিজ তালুকদার, মুখবন্ধটি লেখেন সৈয়দ আওলাদ হোসেন।  অতঃপর এ. এস. এ, তৈফুর রহমান ‘বেঙ্গল পাস্ট এ- প্রেজেন্ট’ পত্রিকায় (জুলাই ১৯৩৬) ইংরেজিতে এবং এ. বি. এম. হাবিবুল্লাহ ‘মোয়াজ্জিন’ পত্রিকায় (কার্তিক ১৩৪৩) বাংলায় প্রবন্ধ লেখেন। ‘ইউরোপে প্রথম ভারতীয়’ শিরোনামে ড. হাবিবুল্লাহর প্রবন্ধটি প্রথম বাংলায় লিখিত হয়। তিনি গ্রন্থের বিষয় ও গ্রন্থকারের মনোভাব সম্পর্কে এক স্থানে লিখেছেন-ভারতের বাহিরে যাহা কিছু উল্লেখযোগ্য বস্তু তাঁহার চোখে পড়িয়াছে তাহারই তিনি সবিস্তারে বর্ণনা করিয়াছেন। ব্রিটিশের স্বজাতি প্রীতি, স্বীয় স্বাধীনতা, তীক্ষè ব্যবসায়বুদ্ধি, তাহাদের এন্টাইপ্রাইজিং মন ইত্যাদি সমস্তই তিনি লক্ষ্য করিয়াছেন। বাংলার পরাধীনতা ও মোগল সাম্রাজ্যের পতন, ইংরেজদের সমগ্র ভারতে রাজ্য স্থাপন অদূর ভবিষ্যতে যে অবশ্যম্ভাবী তাহাও বুঝিয়াছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি তাঁর ছিল না। লুপ্তপ্রায় স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের কোন আলোচনাই তাঁর গ্রন্থে পাওয়া যায় না। জাতির অধঃপতনের তখন সবেমাত্র প্রারম্ভ। তার কারণ সমূহের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের সময় তখনও আসেনি। ইতিসামুদ্দিনের মন সেকালের টিপিকাল গৃহবাসী নিরীহ ফ্যাটালিস্ট বাঙালি ইন্টেলেকচুয়ালের মন, যাহাদের চক্ষে মোগল সামাজ্যের পতনোন্মুখ শক্তি ও ঐশ্বর্যের মোহ তখনও ঘুচিয়া যায় নাই। তবু মাঝে মাঝে ভারতের রাজনীতির আলোচনায়ও তিনি করিয়াছেন।  ব্রিটিশ জাতির ইতিহাস আলোচনা প্রসঙ্গে  তাহাদের একতায় মুগ্ধ হইয়া তিনি ভারতের গৃহবিবাদে আক্ষেপ করিয়াছেন। কিন্তু তাঁর দুঃখ ভারতের জন্য নহে-মোগল সাম্রাজ্যের জন্য। অথচ ভারতের বিশেষত বাঙালি মুসলমানের সামাজিক দোষ তাঁহার চোখে অত্যন্ত পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে এবং তাহার উন্নতিকল্পে আলোচনাও করিয়াছেন অত্যন্ত তীব্রভাবে।
ইংরেজ ও বাঙালির জাতিচরিত্র ও সমাজনীতির তুলনামূলক আলোচনায় তাঁর সূক্ষè নিরীক্ষণ শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। উভয় জাতির বিবাহ ও সংসার ধর্ম পালন সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য-‘বিলাতে লোক ৪০ বৎসর বয়স পর্যন্ত বিবাহ না করিয়া দেশ পর্যটন, বিদ্যাশিক্ষা ও অর্থোন্নতির চেষ্টা করে, কিন্তু আমার দেশে বাল্যকালেই সকল পিতামাতা ছেলে বিবাহ দেওয়া ফরজ মনে করেন এই ভয়ে যে ভবিষ্যতে তাঁহাদের আর্থিক সচ্ছলতা নাও থাকতে পারে।  যাহার পিতামাতার সামর্থ্য নাই, সে যেন তেন প্রকারে এমন কি ঋণ করিয়া, ভিক্ষা করিয়াও স্ত্রী ঘরে আনা জীবনের সর্বপ্রধান কর্তব্য মনে করে। পরে সন্তান লালন-পালনের সামর্থ্য থাকে না-অভাবে অনাহারে নিজে ত মরেই, তাহার নির্দোষ বংশধরগুলিকেও জীবন্মৃত করিয়া রাখে।’
ইতিসামুদ্দিন তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘শিগুর্ফনামা-এ-বেলায়েতে’ উল্লেখ করেন-‘সাম্প্রতিক কালের বাদশাহদের, বিশেষ করে মোহাম্মদ শাহের আমলে, যিনি আনন্দ উৎসবে সর্বদাই মেতে থাকতেন আর রাজ শাসনের কোন চিন্তাই করতেন না, ভোগবিলাসে সময় কাটানই রাজপুরুষদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়াল। রণদামামার স্থলে খঞ্জনি ও তানপুরার আওয়াজে দেশ ভরে উঠল, নাচওয়ালিদের কারবার বেড়ে গিয়ে রোজাদার মুসল্লীদের দিনদারিতে বাধা হয়ে দাঁড়াল। নিঃস্বরা আমীর হল আর আমীরেরা আয়েশের কোলে আত্মগোপন করল। ফলে প্রত্যেক সুবায় নাজিম আর্থিক ও প্রশাসনিক কাজ নিজ ইচ্ছামত চালাতে লাগল এবং সৈন্যসংগ্রহ বা সৈন্যচালনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ল, যার ফলে দেশে বিদ্রোহী দুর্বৃত্তদের হাঙ্গামা ও অরাজকতা সৃষ্টি করার সাহস বেড়ে গেল। এই অবস্থায় পর্তুগীজ ও অন্যান্য ফিরিঙ্গীরা প্রত্যেক সুবাহ শহর ও জেলায়  নাজিম ও ফৌজদারদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে লিপ্ত হয়।’
ইতিসামুদ্দিনের রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ছিল না সত্য, কিন্তু একজন ঐতিহাসিকের অন্তদৃষ্টি ছিল। তাঁর ভাষার স্পষ্টতা, চিত্রধর্মিতা ও সংবাদবাহিতা থেকে মনে হয়, একজন ঐতিহাসিকের মনের সাথে একজন শিল্পীর  মনের মিশ্রণ ঘটেছিল। তাঁর গ্রন্থ একাধারে আত্মচরিত, অন্যধারে ভ্রমণবৃত্তান্ত। আত্মচরিত ও ভ্রমনবৃত্তান্তের প্রত্যক্ষতা, কৌতুহল ও সরসতা তাঁর রচনার বিদ্যমান।
আঠার শতকে ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম এবং ইংরেজদের সাথে এদেশের মানুষের সংযোগ স্থাপিত হলেও উনিশ শতকের পূর্বে পাশ্চাত্য ভাবধারার কোনো প্রভাব এখানে লক্ষ্য করা যায় না। যে ভাষা শিক্ষা ও বিদ্যা অর্জনের ফলে এদেশের মানুষের মন ও মননে রূপান্তর ঘটে  ও নবচিন্তার উদয় হয়, আঠার শতকে তার লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। ১৭৬৫ সালে ইতিসামুদ্দিন ইংরেজি ভাষা শেখেননি। এ জন্য শেষ জীবনে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। শেখ ইতিসামুদ্দিন, মির্জা আবু তালিব, গোলাম হোসেন তাবাতাই, গোলাম হোসেন সলিম-এঁরা সকলেই কোম্পানির সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। কোম্পানির অধীনে চাকুর বা ব্যবসা করে অর্থোপার্জন ও ধনী হওয়ার চেষ্টা করেছেন সবাই, সমাজউন্নতির  কথা ভাবেননি কেউ। শেখ ইতিসামুদ্দিন বলেন-আমি যৌবনে ইংরেজদের অধীনে চাকুরি করে বড় সুখে ছিলাম, কিন্তু এখন শেষকালে  নানা রকম কষ্টই পাচ্ছি, এটা আমার অদৃষ্টের ফল।
রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) ইউরোপে যাওয়ার আগে স্বীয় সমাজ উন্নয়নের জন্য যা করেছিলেন, ইতিসামুদ্দিন আবু তালিব ইউরোপ ভ্রমণ করে এসেও তা করতে পারেননি। অথচ দু’জনই পাশ্চাত্য ভাবধারা যে আয়ত্ব করতে পারেননি তা বলা যায় না। কারণ রামমোহনের মত তারাও ইংরেজের সার্বক্ষণিক সাহচর্য লাভ করেছিলেন। কিন্তু নতুন যুগের পূর্বাভাস আঁচ করতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিলেন। বংশ গৌরব, সামাজিক মর্যাদা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে তাঁরা কোন অংশে ন্যূনতম ছিলেন না, তাঁদের কূল-মর্যাদা রামমোহনের চেয়ে উচ্চ ছিল। রামমোহন যখন পাটনায় ছিলেন, তখন একদিন এক ইংরেজ অফিসার ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার সময় অভিবাদন না করার জন্য রামমোহনকে প্রহার করেছিলেন। কোনো সাধারণ নেটিভ অভিবাদন না করে সাহেবদের পাশ দিয়ে যেতে পারত না।
কুরআন এবং হাদীসে দেশ ভ্রমণের গুরুত্ব একটি স্বীকৃত বিষয় এবং তা আধ্যাত্মিক সফরের সাথে সম্পৃক্ত। আমোদ-প্রমোদ বা ফুর্তি লাভের জন্য দেশ ভ্রমণ ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে বৈষয়িক উন্নতি লাভের জন্য উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ তথা প্রযুক্তি বিদ্যা অর্জন ইসলামে কখনোই অস্বীকার করা হয় না বরং অফুরন্ত  উৎসাহ রয়েছে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান-ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কুরআনে বহু ইঙ্গিত বিদ্যমান। যে দেশেই তা উন্নতি লাভ করুক না কেন সেই দেশ ভ্রমণ করে তা অর্জনের জন্য হাদীসেও রয়েছে উৎসাহ বাণী। কুরআনে ভ্রমণ কর অর্থে সিরু (স-সিন) শব্দটি ২৭ বার ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ‘ভ্রমণ অর্থ প্রকাশ পায় ২০ বার। (১২:১০৯, ২২:৪৬, ৩৫:৪৪,  ৪০:৮২, ৪৭:১০, ৩:১৩৭, ৬:১১, ১৬:৩৬, ২৭:৬৯, ২৯:২০, ৩০:৯, ২৮:২৯, ৩০:৪২, ৩৪:১৮, ৩৪:১৮, ৮১:৩, ৩২:২৬, ৭৮:২০, ১০:২২, ১৮:৪৭ =২০ বার,  ৭ টি স্থানে ভ্রমণ অর্থ প্রকাশ পায় না। (৫২:১০, ৫২:১০, ১৮:৪৭, ১৩:৩১, ৮১:৩, ৭৮:২০, ২০:২১, মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম, আল-কুরআন:শব্দ সংখ্যা ও তার শিক্ষা (অভিধানভিত্তিক), ঢাকা:শিরীন পাবলিকেশন্স, ২০১৭, পৃ-১২১২)। বলা হয়েছে- ‘এরা  কি পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করেনি?’ প্রশ্নবোধক শুধু এ তথ্যটি রয়েছে ৭টি স্থানে। (১২:১০৯, ২২:৪৬, ৩০:৯, ৩৫:৪৪, ৪০:২১, ৪০:৮২, ৪৭:১০)। বলা হয়েছে-তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি এবং দেখেনি-তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিল? আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করেছেন (দাম্মারাল্লাহু) এবং কাফেরদের জন্য রয়েছে অনুরূপ পরিণাম। (৪৭:১০)।
এরা উন্নত স্থাপত্যকলায় (আর্কিটেকচার) পারদর্শী ছিল এবং এ ধরনের জ্ঞান চর্চা অবৈধ নয় যদি এখানে তাকওয়ার ছাপ থাকে। কিন্তু এখানে যাদের কথা বর্ণিত হয়েছে তার সাথে আখেরাতে বিশ্বাস জড়িত ছিল না। অর্থাৎ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলদেরকে অস্বীকার এবং ঔদ্বত্য প্রকাশ করার কারণে তাদেরকে পৃথিবীতে সমূলে ধবংস করে দিয়ে জাতির শিক্ষার জন্য একটি নিদর্শন হিসেবে তা রেখে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং দেশ ভ্রমণের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে তা কখনো অস্বীকার করা যায় না। ভিন্ন শিক্ষা, সংস্কৃতি-সভ্যতার পরিচয় উপলব্ধি এবং উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত দেশ ভ্রমণের প্রয়োজন রয়েছে। নদী-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অপর দেশ ভ্রমণ কোন কোন ধর্মে এক সময় নিষিদ্ধ হলেও, বর্তমান তা আর অনুসৃত হয় না। কিন্তু ইসলাম ধর্মে দেশ ভ্রমণের জন্য অসংখ্য অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করা হয়েছে।
প্রায় সাতশত বছর এ উপমহাদেশ মুসলমানদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। সেই হিসেবে এখানে যে ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ গড়ে ওঠার কথা ছিল তা কখনই গড়ে ওঠেনি। অষ্টম শতকে বাগদাদে, স্পেনে-কর্ডোভায় এবং আফ্রিকায় মুসলিম বিজ্ঞানীদের দ্বারা যে ধরনের বিজ্ঞান চর্চার পরিবেশ গড়ে ওঠেছিল-এ উপমহাদেশে তার আগমন না ঘটার কোন কারণ আজ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করা হয়নি। এই দীর্ঘ নির্লিপ্ততার কারণ উদ্ঘাটন এবং উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ সৃষ্টি না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
ফলে ১৭৬৫ সালে ইতিসামুদ্দিনের চিন্তার ভিতর স্ব-জাতির উন্নতি এবং মুক্তির বিষয় নিয়ে কোন ভাবান্তর গড়ে ওঠেনি। উনবিংশ শতকে ইউরোপ ভ্রমণ থেকে এসেই স্বজাতির মুক্তির চিন্তায় সৈয়দ আহমদ উত্তর ভারতে অক্সফোর্ড-ক্যাম্ব্রিজের আদলে ‘আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন করেছিলেন। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর রবীন্দ্রনাথঠাকুর ইউরোপ ভ্রমণ থেকে এসেই  স্বজাতির চিন্তায় ভারতে প্রথমে ‘ব্রাহ্মণ বিশ্ববিদ্যালয়’ পরে নাম পাল্টে ‘শান্তি নিকেতন’ (আরবিতে দারুস-সালাম বলা হয়) নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ইতিসামুদ্দিনের চিন্তায় এ ধরনের কোন শিক্ষা বিপ্লব  লক্ষ্য না করার কারণ অনুধাবন করা বেশ কঠিন। তাঁর পূর্ব পুরুষ ইরান (যা এক সময় প্রাচীন পারস্য সভ্যতা নামে বিখ্যাত ছিল) থেকে আগত এবং তিনি ইতিহাস সচেতন লোক ছিলেন। তাঁর পিতামহ শিহাবুদ্দিন আহমদ তালিশ ‘তারিখে আসাম’ নামে গ্রন্থ লিখে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাই একটি ইতিহাস  সচেতন পরিবারে জন্মলাভ করার পরও তার মধ্যে মুসলিম জাগরণের কোন চিন্তাই পরিস্ফুটিত হয়নি-এটা দুভার্গ্যজনক। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ