ঢাকা, শনিবার 14 October 2017, ২৯ আশ্বিন ১৪২8, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রশিক্ষণই হোক শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা

গত ৫ অক্টোবর ২০১৭ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ দিবসে গোটা বিশ্বের শিক্ষক সমাজকে অভিনন্দনসহ শুভেচ্ছা জানাই। জাতি গঠন এবং জাতির উন্নয়নের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা বান্ধব পরিবেশ। এক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকাই প্রধান। কারণ শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষা ব্যবস্থার চালিকা শক্তি। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষার মেরুণ্ড শিক্ষক। শিক্ষকদের জন্য বছরে একটি দিন বাছাই করার মধ্য দিয়ে মর্যাদার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রকাশ পায়।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তি ঘটে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সনদের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার পর বিশ্বব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তরাষ্ট্রীয় সরকার সম্মেলনে অর্জিত হয়েছিল শিক্ষকদের অধিকার, কর্তব্য ও মর্যাদা বিষয়ক ইউনেস্কো আইএলও সনদ ১৯৬৬। ১৩ অধ্যায়ে বিন্যস্ত এবং ১৪৬ ধারা উপধারায় বিভক্ত সনদে শিক্ষাকে দেশ, জাতি ও সমাজ গঠনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নত করে শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পেশাগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার, কর্তব্য, মর্যাদা এবং দায়দায়িত্বের বিষয় সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে শিক্ষাসেবায় নিয়োজিত সমযোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তিদের সমবেতন-ভাতা প্রদান ও প্রাপ্তির ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করে শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রাক প্রাথমিক, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রণীত ইউনেস্কো, আইএলও, সুপারিশের শিক্ষাদন ও গ্রহণকে কার্যকর ও অর্থবহ করার যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে শিক্ষকদের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠন সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক World Confederation of Organizations of the Teaching Profession- WCOTP, নেদারল্যান্ড ভিত্তিক International Federation of Free Teachers Union- IFFTU এবং চেকোশ্লোভাকিয়া ভিত্তিক World Federation of Teachers Union-FISE- এর উদ্ভব ঘটে। কালক্রমে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা সর্ম্পকিত অর্জিত সাফল্যকে অধিকতর সুসংহত করার তাগিদে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা এ সকল শিক্ষক সংগঠনের মধ্যে আরো নৈকট্য সৃষ্টি এবং যুগপৎভাবে কাজ করার প্রবণতা শক্তিশালী করার জন্য ১৯৯৩ সালে উদ্ভব ঘটে বেলজিয়াম ভিত্তিক Education International –EI. এটি বিশ্বব্যাপী ১৬৭ টি রাষ্ট্রের প্রায় ৩ কোটি শিক্ষকের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন।
১৯৯৪ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনোস্কোর ২৬তম অধিবেশনে উক্ত সংস্থার তৎকালীন মহাপরিচালক Dr. Frederic M. Mayor শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক ইউনেস্কো আইএলও দলিল ঘোষণার ঐতিহাসিক দিন ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক হিসেবে উদযাপনের যুগান্তকারী ঘোষণা দান করেন। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপিত হয়।
বাংলাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন, বিশ্ববিদ্যালয় মিলে সর্বমোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯১ হাজার ৭১৯ টি। এতে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৫ লক্ষ ৫২ হাজার ৯৭৭ জন। তার মধ্যে চার ভাগের তিনভাগ, অর্থাৎ ৮২ হাজার ৮৬৪ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ কোটি ৫২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৪ জন ছাত্র-ছাত্রীর বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লক্ষ ৮২ হাজার ৮১৭ জন। প্রতি বছর পৌনে ৪ লাখ প্রাথমিক শিক্ষকের বেতন, বোনাস, পেনশন দিতে সরকারের কোষাগার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়।
শিক্ষা জীবনের প্রথম ধাপ প্রাথমিক শিক্ষা। অধিকাংশ শিশু প্রথমে ঘরে বর্ণমালা শিখে তারপর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। শিক্ষা জীবন শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই একটি করে অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা সকল দেশের সকল শিশুর মৌলিক অধিকার। শিক্ষাহীন মানুষের জীবন অভিশপ্ত। তাদের জীবনে একদিকে যেমন থাকে আদর্শ ও সৎ ধারণার অভাব, অন্যদিকে বাস্তব জীবনেও থাকে অজ্ঞানতার অন্ধকার। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা চালিয়ে নেওয়ার অগ্রপথিক যাঁরা ছিলেন, আছে এবং ভবিষ্যতেও এর হাল ধরবেন, তাঁদের জন্যেই শিক্ষক দিবস পালনের সূত্রপাত। যে সমাজ শিক্ষকদের সম্মান করে না, মর্যাদা দেয় না; সে সমাজ ক্ষয়িষ্ণু। সে সমাজের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
সবাই একবাক্যে স্বীকার করি শিক্ষকরা সমাজের ব্যতি শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন না হলে একটি সমাজ পিছিয়ে পড়ে সবার আগে। গ্লোবাল অ্যাডুকেশন এবং বৈশ্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারাটা পেশাগত উন্নতির প্রাথমিক পর্যায় মাত্র। এর পরে নিজের সঙ্গে নিজেকে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে তৈরি করতে হবে পেশাগত সাফল্যের অনিবার্য ধাপসমূহ।
পৃথিবীর সবদেশেই প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের প্রাথমিক শর্ত ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন ডিগ্রিধারী আদর্শবান শিক্ষক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুপাতে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স (IPT) প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। দীর্ঘ ৪ বছরে আইপিটি প্রশিক্ষণের সময় তার দেশের ঐতিহ্য-মানস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করাতে হয়। তাদের মধ্যে মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি সঞ্চারিত হওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়।
পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারা পৃথিবীতে এখন অনলাইন লাইফস্কিলস ইনস্ট্রাক্টারগণ তাদের গবেষণা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলাফল প্রকাশ করার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। নবাগত শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে পরিচিত করে তোলা, অন্যের অভিজ্ঞতা জেনে নেয়া, নিজের জানা-ভাবনা জগৎ প্রভৃতি অপরের সঙ্গে শেয়ার করা। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষকরা আধুনিক চিন্তার প্রচারক ও প্রসারক। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের কোয়ালিটি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা সম্ভব। প্রথাগত ও প্রচলিত পাঠদান পদ্ধতির স্থানে বর্তমানে প্রয়োজন হিসেবে প্রবেশ করেছে আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা। আর মানব-উন্নয়নের জন্য নিজেকে প্রকাশ করাটা এখন জরুরি ব্যাপার। হাতে কলমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন যোগ্য শিক্ষকই এই দায়িত্ব পালন করতে পারে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রদানে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৫৬-১৯৭০=১৪ বছরে ৫২টি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) প্রতিষ্ঠা করে। স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৭১ থেকে ২০১৭= ৪৭ বছরে মাত্র ৪টি পিটিআই প্রতিষ্ঠা পায়।  মোট ৫৬টি পিটিআই জাতীয় আশা আকাক্সক্ষা পূরণ করতে চরম ব্যর্থ হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে নানা সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বেশির ভাগই হতাশাজনক। বাংলাদেশে সরকারিভাবে পরিচালিত প্রাথমিক শিক্ষার চালচিত্রটা অনেকটা এরকম-প্রায় বিদ্যালয়েই শিক্ষক স্বল্পতাজনিত সংকট, অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ সংকট, কর্মস্থলে শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, অনগ্রসর এলাকায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের বদলে বর্গা শিক্ষকদের দিয়ে কাজ চালানোসহ আরো কত রকমের সমস্যার মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা হাবুডুবু খাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। শিক্ষকদের বেতনভাতা, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা দেশের শিক্ষার মান সম্পর্কে এক ধরনের ধারণা তৈরি করে শিক্ষক নিয়োগ যোগ্যতাতেও ন্যূনতম প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। শিক্ষকদের দুর্বল বিষয়দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের অভাব মানসম্মত শিক্ষার পথে অন্যতম অন্তরায়। বাংলাদেশে ৭৩ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এবং ৭০ শতাংশ রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল এবং এর শিক্ষাক্রম বহুলাংশে  তাত্ত্বিক। দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মনোন্নয়ের লক্ষ্যে ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ নিন্মোক্ত সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে-
১. সরকারি, আধা-সরকারি, পুলিশ, সামরিকবাহিনী, আধা-সামরিকবাহিনী পরিচালিত প্রাইমারি স্কুল, রেজিষ্টার্ড, নন রেজিস্ট্রি কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসায় ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগনীতি প্রণয়ন ও নিদের্শনা প্রদান করা।
২. প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রাইমারি স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণবিহীন কর্মরত সকল শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
৩. প্রাইমারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) এর নাম পরিবর্তন করে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স করতে হবে।
৪. ১৮ মাস মেয়াদি অবৈতনিক কোর্স বন্ধ করে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন কোর্স চালু করা।
৫. সরকারি, সিটি কর্পোরেশন, বেসরকারি উদ্যোগে জেলা-উপজেলা, ইউনিয়নে একাধিক ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স (IPT) ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা প্রদান করা।
৬. তৃণমূলে ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার নীতি সহজ ও সরলীকরণের লক্ষ্যে ব্রিটিশ পাকিস্তানীদের বিচ্ছন্ন মতাদর্শের ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী ৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম পৃথক করে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীন প্রশাসনিক বিভাগে স্বাধীন স্বতন্ত্র ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা প্রদান করা।
৭. উন্নত বিশ্বের মতো বিভাগীয় ‘ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ প্রদত্ত ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন ডিগ্রিপ্রাপ্তদের নিয়োগ এবং উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা নির্দেশনা প্রদান করা।
৮. উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় শহরে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স প্রতিষ্ঠার জন্য ডিপ্লোমাধারীদের সহজ শর্তে প্লট বরাদ্দ ও ব্যাংক ঋণ প্রদানের নির্দেশনা।
উপরোক্ত দফাসমূহ বাস্তবায়ন করতে পারলে শিক্ষা ও শিক্ষকদের জীবন মানের উন্নতি ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটবে। জাতির ভবিষ্যৎকে শিক্ষক তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে প্রত্যক্ষ করবেন। ভবিষ্যতের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার্থী শিক্ষক সকলের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন।
# খন রঞ্জন রায়

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ