ঢাকা, শনিবার 14 October 2017, ২৯ আশ্বিন ১৪২8, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ইফার মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম

মাহমুদ শরীফ : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্প এবং মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম নামে দুইটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পটি হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাষ্টের মাধ্যমে এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম ইসলামীক ফাউন্ডেশন-এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে মসজিদভিত্তিক কার্যক্রমটি ইতিমধ্যে সফল প্রকল্প হিসাবে সুনাম কুড়িয়েছে। ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য শিক্ষা সরকারের এই শ্লোগান বাস্তবায়নের নিমিত্তে বর্তমানে দেশে সে পরিমান প্রাথমিক স্কুল নেই। এখনও দেশের অনেক গ্রাম রয়েছে যেখানে স্কুল নেই। তবে প্রত্যেক গ্রামেই মসজিদ রয়েছে। মসজিদের অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে সরকার সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার নিমিত্বে এই প্রকল্প চালু করেছেন। নিঃসন্দেহে প্রকল্পটি সরকারের শুভ বুদ্ধির পরিচায়ক। এতে প্রাথমিক শিক্ষার ভর্তির হার বৃদ্ধি পায় এবং ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীরাও এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
ইফার প্রকল্প সমূহের মধ্যে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম একটি বৃহৎ প্রকল্প। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় ১৯৯৩ সালের জানুয়ারী থেকে এই প্রকল্পের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৩টি পর্যায় বাস্তবায়িত হয়েছে। এ তিন পর্যায়ে মোট ২৪ লাখ ২১ হাজার ১ শত ৫০জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। ২০০৬-২০০৮ মেয়াদে এ প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ের কাজ শুরু হয়। দেশের সকল উপজেলায় প্রকল্প মেয়াদে ১৮ হাজার প্রাক প্রাথমিক, ৭শত ৬৮টি বয়স্ক এবং ১২ হাজার কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে ২৯ লাখ ৩৭ হাজার ৬ শত জন শিশু ও বয়স্ক শিক্ষার্থীকে পবিত্র কোরআনসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করা হয়। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞানকে অব্যাহত রাখার সুবিধার্থে সাড়া দেশে ৪শত ৭৯ টি মডেল রিসোর্স সেন্টার ও ৯ শত ৯৫টি সাধারণ রিসোর্স  সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় এসব কেন্দ্রে নির্ধারিত ২টি স্তরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদান করা হয়। স্তর গুলো হল ১) প্রাক-প্রাথমিক, ২) বয়স্ক। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদান করার লক্ষ্যে ৬টি বই পাঠসূচী ভুক্ত করা হয়েছে। বইগুলো হল- ১ আমার প্রথম পড়া, ২) কায়দা ও দ্বিনী শিক্ষা, ৩) পড়া শিখি- ১ম ও ২য় খ-, ৪) আমরা শিখি গণিত, ৫) কায়দা ও আমপাড়া এবং ৬) আমরা পড়ি আমরা শিখি। আরবী ইংরেজি বাংলা বর্ণমালা ইসলামী চেতনার সাথে অতিসহজে যাতে শিক্ষার্থীরা পরিচিত হতে পারে সে দিকে লক্ষ্য রেখেই শিক্ষার্থীদের জন্য বইগুলো এনসিটিবি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাসমূহের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ও সার্বিক নির্দেশনায় জাতীয় শিক্ষানীতির সাথে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। এই বই থেকে শিক্ষার্থীরা নিরক্ষরতার অভিশাপমুক্ত হওয়ার সাথে সাথে আর্থ-সামাজিক ও স্বাস্থ্য সচেতনতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা অর্জনে সক্ষম হচ্ছেন। এটাই হয়তো একটি ইসলামী বিদ্বেষী মহলের দুঃখের কারণ। বর্তমানে প্রকল্পটি ৪র্থ পর্যায়ে চলছে, যা আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০০৮-এ সমাপ্ত হবে। শুরু হওয়ার পর থেকে এ প্রকল্প কখনো বন্ধ হয়নি বরং এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৯৬ পরবর্তী সরকার এ প্রকল্পের কার্যক্রম তিনগুণ বৃদ্ধি করেছেন। তারপর থেকে অব্যাহত ভাবে এবং সাফল্যজনকভাবে এ প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে। কোন গণতান্ত্রিক সরকার এ প্রকল্প বন্ধ করেনি। এখনো এ প্রকল্প চলমান। বর্তমান তত্তা¡বধায়ক সরকার এই প্রকল্প বাতিল করার কোন ক্ষমতা রাখেন না। শিক্ষা ও সুবিধা বঞ্চিত শিশু যারা কোনদিনই শিক্ষার আলো পেতো না তাদেরকে এ প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার মূল স্রোতের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। এরা এ প্রকল্পের মাধ্যমে এক বছরের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে পার্শ্ববর্তী প্রাইমারী স্কুলে ভর্তির সুযোগ পায়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের ফলে তাদের মধ্যে স্কুল ভীতি ও অন্যান্য জড়তা থাকে না। ফলে প্রাইমারী স্কুলে তাদের ঝরে পড়ার হার হয় খুবই কম। অন্যদিকে প্রথম শ্রেণী থেকে পরবর্তী শ্রেণীসমূহে তাদের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল খুবই ভাল। এতে তারা এবং তাদের অভিভাবকগণ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হন। এভাবে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৭ পর্যন্ত প্রায় ২৫ লাখ শিশুকে এ প্রকল্পের মাধ্যমে শিশু শিক্ষার মূল স্রোত সরকারী-বেসরকারী প্রাইমারী স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়েছে। মাত্র ৫০০/১২০০ শত মাসিক টাকায় প্রতিদিন ২ ঘন্টা শিক্ষাকতা করে একজন বেকার যুবক শিক্ষক মূলতঃ স্বাক্ষরতা অর্জনে শতভাগ সফলতা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছেন। এব্যাপারে প্রকল্পের কুমারখালী শহরের এলঙ্গী কোরাপাড়া জামে মসজিদের শিক্ষক হাফেজ আব্দুল কুদ্দুস  জানান, এই শিক্ষা প্রদান চাকরী হিসেবে নয় মূলতঃ শিক্ষা ক্ষেত্রে এটি একটি আন্দোলন। এই আন্দোলনকে আরো বেগবান করার জন্য সহযোগিতা দরকার। ঐ শিক্ষক জানান সহযোগিতার পরিবর্তে এই প্রকল্প বন্ধের ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এটা একটি আত্মঘাতি ষড়যন্ত্র।
দেশের ৬৪টি জেলায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা মনিটরিং কমিটি এবং ৪৭৯ টি উপজেলায় ইউ,এন,ও-এর নেতৃত্বে উপজেলা মনিটরিং কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে এই কার্যক্রমটি নিঃসন্দেহে শতভাগ সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। মসজিদের আঙ্গিনায় তাদের পাঠদান করানো হয় বিধায় সাধারণ শিক্ষা যথা- বাংলা, ইংরেজি, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও গণিতের পাশাপাশি তাদেরকে ধর্মীয় নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া হয়। একে কোনভাবেই মৌলবাদ শিক্ষা বলা যুক্তিসঙ্গত হবে না। তাছাড়া যেসব শিক্ষার্থীর বয়স মাত্র ৪-৫ বছর তাদেরকে কী মৌলবাদ শিক্ষা দেওয়া সম্ভব? তা যে কোন বিবেকবান মানুষেরই অনুধাবন করার কথা। তাছাড়া এ প্রকল্পটি গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে সর্বনিু প্রশাসন পর্যন্ত সকলেই জড়িত। তাই ইতোপূর্বে এ ধরনের কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে নিশ্চয় তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে দ্বিধা করতেন না। অথচ সম্প্রতি একটি ইসলাম বিদ্বেষী মহল ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে প্রকল্পটি বন্ধের জন্য আদা-জল খেয়ে লেগেছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় বিভ্রাতিকর তথ্য উপস্থাপন করার হীন প্রচেষ্টা রেখেছে অব্যাহত। প্রকৃত পক্ষে এই প্রকল্পের আওতাধীন ৪৭৯টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিদর্শন ও তদারকির জন্য ৪৬০টি ফিল্ড সুপারভাইজারের পদ রয়েছে। এ সকল পদে একাধিক জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় উন্মাক্ত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি সমন্বয়ে সরকার কর্তৃক গঠিত নির্বাচনী কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। মূলতঃ মটর সাইকেল-এর সংখ্যাও মাত্র ৪৭৭টি। ঐ মহলের পত্রিকায় যে ৩২ হাজার এবং ৪০ হাজার মটর সাইকেল ও সুপারভাইজারের সংখ্যার যে তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এবং সরকার কর্তৃক অনুমোদিত একটি প্রকল্পের কর্মচারীদের ‘শিবির কর্মী’ বলে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে তাও সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এটি ষড়যন্ত্রকারীদের মিথ্যা আশফলন ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃত পক্ষে মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্প এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্প দুইটির আওতায় লাখ-লাখ কৃষক, জেলে, কুলি, কামার, কুমার, দিন-মজুর, শ্রমিক তথা দরিদ্র ও সুবিধা বঞ্চিত পরিবার ও পরিবারের সদস্যবৃন্দ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। অত্র প্রকল্পের জন্য সরকারকে অতিরিক্ত ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণ করার প্রয়োজন হচ্ছে না। এতে বলা যায়, দেশের স্কুল আছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আছে, প্রয়োজন ছিল শুধু শিক্ষা কার্যক্রমের এবং সেটা বাস্তবায়ন হয়েছে। এর সফলতা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলা যায়। প্রমাণ স্বরূপ একটি শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধ্যায়নের সফলতা তুলে ধরছি।
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চর কেশবপুর লালন বাজার জামে মসজিদ কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী চর কেশবপুর বে-সরকারী রেজিঃ প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে এবছর ২য় শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষার্থী জনি আহমেদ বর্তমানে রোল নং-২, সাবিনা খাতুন, রোল নং-৬, এবং স্বপ্না পারভীন- রোল নং-৩ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। তৃতীয় শ্রেণীতে অনুরূপ গৌরব অর্জন করেছে শামিরন, শিরিনা খাতুন, শাহানুর রহমান ও রিমা পারভীন।
অন্যদিকে বর্তমান চতুর্থ শ্রেণীতে ক্লাসের সেরা ছাত্র হয়ে রোল নং-১ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে শাকিল আহমদ। চর কেশবপুর রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ রেজাউল ইসলাম এব্যাপারে জানান, ইফার মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে প্রাক-প্রাথমিক স্তর সম্পূর্ণ করা শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকটা ক্লাসেই ১-১০ রোল নম্বরের মধ্যে অবস্থান করে। এক্ষেত্রে তিনি ইফার এই শিক্ষা কার্যক্রমকে একটি সফল-সার্থক প্রকল্প বলে মন্তব্য করেন।
শেষে বলা যায়, এপ্রকল্পের অব্যাহত সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ইসলামী বিদ্বেষী একটি চক্রের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। মসজিদ ভিত্তিক এ কার্যক্রমের দ্বারা জাতির সার্বিক উন্নতি সুবিধা বঞ্চিত ও হতদরিদ্র মানুষের উন্নতি হক ঐ মহলটি তা চায় না। অথচ মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ঐ কুচক্রি মহলের কোন মাথা ব্যথা নাই। এখানেই প্রমাণিত হয় তারা দেশ ও জাতির জন্য কতটা ভয়ংকর। তাই এক্ষেত্রে দেশের সচেতন জনগণকে উদ্দেশ্যেমূলক এই মিথ্যা অপপ্রচার সম্পর্কে থাকতে হবে সজাগ।
কেননা, সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম এই বাংলাদেশে মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করা মানেই ইসলামী নীতি নৈতিকতা শিক্ষার কবর রচনা করা। আর যারা এই প্রকল্পটির প্রতি ঈষান্বিত হয়ে বন্ধের চক্রান্ত করছেন, তারা কি তাহলে নিজের জাতি ধর্ম ও জন্মকে অস্বীকার করতে চান? যদি না চান তাহলে এই মৌলিক শিক্ষা বন্ধের ষড়যন্ত্র নয়, আরো গতিশীল করার জন্য কাজ করুন। এতেই হবে দেশের মঙ্গল, দশের মঙ্গল, আপনার নিজের মঙ্গল। এতেই সফলতা আর স্বস্তি পাবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ