ঢাকা, সোমবার 16 October 2017, ১ কার্তিক ১৪২8, ২৫ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাহত্যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মুসলিম নিধনের অংশমাত্র

জিবলু রহমান : ২৫ আগস্ট ২০১৭ ৩০টি পুলিশ স্টেশন ও একটি সামরিক ঘাঁটিতে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা হামলা চালায়। এরপরই শুরু মানুষ বধ উৎসব। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা বেসামরিক মানুষের ওপর পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্ট উপায়ে জবাব দেয়। ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনী, পুলিশ ও এলাকার সশস্ত্র লোকজন যে সুপরিকল্পিত, সমন্বিত জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রধান গণমাধ্যমগুলোয় প্রতিবেদন ও ছবি ছাপা হচ্ছে। বিশিষ্ট কলামিস্টরা ক্ষুব্ধ হয়ে কলম ধরেছেন। কার্টুনিস্টরা বিদ্রুপবাণ ছুঁড়ছেন। রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর তথাকথিত ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ত্যাগ না করলে গুলি করে মারা হবে-এ ঘোষণা দিয়ে রাখাইন রাজ্যের গ্রামে মাইকিং করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার আগেই বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় রোহিঙ্গাদের গ্রাম পোড়ানো হয়েছে। ফলে এত দিন মাটিকামড়ে ছিল যে রোহিঙ্গারা, এখন তারাও দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে।
মিয়ানমারের রাখাইনে প্রাদেশিক রাজধানী সিতওয়ে (সাবেক আকিয়াব) শহরসহ আশপাশের ২৯টি ক্যাল্ফেপ আশ্রিত দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে এবার বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে মিয়ানমার। ২০১২ সালের জুন মাসে জাতিগত দাঙ্গার পর অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ (আইডিপি) হিসেবে এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, আকিয়াবের বিভিম্ন ক্যাম্পে গত পাঁচ বছর ধরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন হুমকি দিচ্ছে। ফলে অনেকেই এখন ক্যাম্প ছেড়ে সমুদ্রপথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানায়, নৌকায় করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে মিয়ানমার পুলিশ ও নৌবাহিনী তাদের বাধা দেয় না; বরং সহযোগিতা করে থাকে।
কক্সবাজারে জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, রাখাইনে ২০১২ সালে জাতিগত দাঙ্গার পর এক লাখ ৪৬ হাজার রোহিঙ্গা সিতওয়ে এবং আশপাশের ২৯টি ক্যাল্ফেপ আশ্রিত হিসেবে থাকে। এর মধ্যে সিতওয়ে শহরের বাইরে ১৫ ক্যাম্পে রয়েছে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হলে প্রথমে তাদের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ক্যাম্পে রাখা হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও বাড়িঘরে ফিরতে দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক কয়েকটি এনজিও সংস্থা ক্যাম্পে আপ্রিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে এলেও গত ২৫ আগস্টের পর সেখানে কর্মরত এনজিও কর্মীদের নিরাপত্তার অজুহাতে রাখাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ক্যাম্প ছেড়ে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করেছে। (সূত্র : দৈনিক সমকাল ১ অক্টোবর ২০১৭)
সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ। আর এ হিসাবের পরিসংখ্যান হলো নির্যাতন শুরুর এক সাপ্তাহ পরের। বাংলাদেশে জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এদেশীয় ভারপ্রাপ্ত পরিচালক দীপায়ন ভট্টাচার্য ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সন্ধ্যায় এ তথ্য জানান। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকায় রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের আসা অব্যাহত আছে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল হলেও সংখ্যাটা এখন ৩ লাখের ধারেকাছে বলে মনে করছে জাতিসংঘ।
বাংলাদেশে আসা নতুন রোহিঙ্গাদের সংখ্যার ধারণা কীভাবে করা হচ্ছে জানতে চাইলে দীপায়ন বলেন, প্রতিদিন যেভাবে রোহিঙ্গা আসছে, সে সম্পর্কে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও মানবিক সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে এই ৩ লাখ রোহিঙ্গার সংখ্যাটি বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি জানান, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের জন্য খাবার নিশ্চিত করতে বাড়তি ১১.৩ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ডব্লিউএফপি। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
অবশ্য এখন বলছে ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ রাজধানীর একটি হোটেলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া) বীরবিক্রমের সঙ্গে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলে সাক্ষাৎকালে ৫ লাখ রোহিঙ্গাকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নাগরিকদের জীবনযাত্রা, খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি নিয়ে মতবিনিময় করেন তারা। রোহিঙ্গা শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের আলাদা করে বিশেষ পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করবে বলে মন্ত্রীকে অবহিত করে ডব্লিউএফপি।
২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাখাইনে পুলিশ ক্যাম্পে সহিংস হামলার পর ৯০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। ২৫ আগস্ট ২০১৭ হামলার পর এ পর্যন্ত এসেছে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে ২০১২ সালে দাঙ্গার পর এসেছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থার তথ্যমতে, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে অবস্থান নিয়েছে। এখন খুব স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে অবস্থান করছে। ২০১৫ সালের তথ্যমতে, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১১ লাখ। ইন্টারনেটে তথ্য প্রদানকারী ওয়েবসাইট উইকিপিডিয়াতে রোহিঙ্গাদের এ সংখ্যা উল্লেখ রয়েছে। এই তথ্যমতে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিবেদনে যেসব অপরাধের বর্ণনা আছে তা ভয়াবহ। এই প্রতিবেদনে নারী এবং মেয়েশিশুদের গণধর্ষণের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। নির্যাতনের পর এসব নারী ও মেয়েদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে। কীভাবে পরিবারের সদস্যদের সামনেই শিশু এবং বয়স্কদের একবারে চিরে ফেলা হয়েছে, তার বর্ণনাও আছে সেখানে।
এ প্রতিবেদনে শিক্ষক, বয়স্ক মানুষ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতাদের দ্রুত মৃত্যুদ- কার্যকরের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ, ঘর বন্ধ করে রেখে তাতে আগুন দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, গর্ভবতী এক নারীকে সেনাদের পিটিয়ে মারার দৃশ্য আর ভূমিষ্ঠ সন্তানকে পিষে মেরে ফেলা-এমন ভয়াবহ সব বর্ণনা আছে সেই প্রতিবেদনে।
এ প্রতিবেদনে বর্ণনা আছে, কীভাবে জোর করে ফসল ধ্বংস করা হচ্ছে এবং গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে মানুষদের গ্রামছাড়া করা হচ্ছে। আর জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনটি মাত্র একটি প্রতিবেদন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০১৬ সালে ঠিক এ ধরনের আরেকটি প্রতিবেদন তুলে ধরে। রোহিঙ্গাদের ওপর এসব নির্যাতনের পর্বতপ্রমাণ উদাহরণ আছে, যাতে এটা সহজেই প্রমাণিত হয় যে এই জাতিগোষ্ঠীকে মিয়ানমার থেকে একেবারে নির্মূল করার জন্যই এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
পশ্চিমের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৪০% রোহিঙ্গা গ্রাম এখন জনশূন্য, খোদ মিয়ানমার সরকার এ তথ্য দিয়েছে বলে জানায় সিএনএন। ২৫ আগস্টের পর থেকে রোহিঙ্গাদের বসবাসরত এলাকায় কমপক্ষে ৮০টি বড় ধরনের অগ্নিসংযোগের ঘটনা শনাক্ত করা গেছে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। গত চার বছরে এত প্রকটভাবে অগ্নিসংযোগের ঘটনা আর ঘটেনি।
বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কিভাবে রাখাইনের গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে, ঘরের ভেতরে আটকে রেখে কিভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, লুটপাট চালিয়ে কিভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেই বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বক্তব্যে। যদিও সেনাবাহিনীর দাবি, তারা রাখাইনে জঙ্গি দমন অভিযান চালিয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিক তাদের লক্ষ্য নয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত নিকোলাস ডি ক্রিস্টফ তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়ে আসছিলেন নূর সায়মন নামে এক নারী। তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একজন সাংবাদিককে বলেছেন, বৌদ্ধরা আমাদের গুলি করে হত্যা করছে। জ্বালিয়ে দিয়েছে বাড়িঘর। আমাকেও গুলি করে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে সেনাবাহিনী।
ফোরটিফাই রাইটস নামের মানবাধিকার গ্রুপের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ স্মিথ বাংলাদেশ সীমান্তে আসা শরণার্থীদের সাক্ষাৎকার নেয়ার পর বলেছেন, রোহিঙ্গারা বলেছেন, তারা (মিয়ানমার) আমাদের সন্তানদের হত্যা করছে। ম্যাথিউ স্মিথ-এর দুঃখ-ন্যূনতম হলেও, আমরা তো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নিয়ে কথা বলছি। ম্যাথিউ স্মিথকে একজন রোহিঙ্গা বলেছেন, ‘আমার দুই ভাতিজার মাথা কেটে নিয়েছে তারা। তাদের একজনের বয়স ৬ বছর। অন্যজনের ৯ বছর’। অন্যরা বর্ণনা দিয়েছেন আরো ভয়াবহ সব কথা। তারা বলেছেন, কোল থেকে নবজাতকদের কেড়ে নিয়ে নদীতে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে সেনাবাহিনী। শিরচ্ছেদ করেছে একজন প্রবীণ নারীর। সীমান্ত থেকে অসাধারণ নিউজ কাভার করছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সহকর্মী হান্নাহ বিচ। তিনি বলেছেন, আমি এর আগেও শরণার্থী সংকট নিয়ে রিপোর্ট কাভার করেছি। কিন্তু এ যাবৎ যত শরণার্থী সংকট দেখেছি তার মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ।
ধীরগতিতে বয়ে চলা সংকীর্ণ মায়উ নদীর পাশে খুবই ছোট একটি পল্লী মং নু। যেখানে ৭৫০টির মতো ঘরে রোহিঙ্গারা দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করে আসছিল। মুসলমানরা তাদের বৌদ্ধ প্রতিবেশীদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে চা পান করত-এমনই ছিল সম্প্রীতির সহাবস্থান। তাদের এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অবসান ঘটে ২৫ আগস্ট। শান্তির বদলে এখন সেখানে কালো ধোঁয়ার কু-লীতে ছেয়ে আছে আকাশসীমা, যা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে এখনো দেখা যায়।
রাখাইনের একটি পল্লীর নাম মং নু। ফোরটিফাই রাইটস নামের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, মং নু এবং এর আশপাশের তিনটি গ্রামে আনুমানিক ১৫০ জন লোক মারা গেছে।
গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ রশিদ স্ত্রী-পুত্র নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছেন বাংলাদেশে। কিন্তু লাঠিতে ভর দিয়ে চলা তাঁর ৮০ বছরের বৃদ্ধ বাবা দৌড়াতে পারছিলেন না। ইউসুফ আলী নামের ওই বৃদ্ধ লোকটির গলা একজন সৈন্য এত জোরে চেপে ধরে যে তাঁর গলা দেহ থেকে প্রায় আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। ‘আমি চেয়েছিলাম ফিরে গিয়ে বাবাকে বাঁচাই। কিন্তু কয়েকজন আত্মীয় আমাকে আটকায়, কারণ সৈন্যরা সংখ্যায় ছিল অনেক।’ ওয়াশিংটন পোস্টকে বলছিলেন ৫৫ বছর বসয়ী রশিদ। তিনি আরো বলেন, ‘এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, আমি আমার বাবার জন্য কিছুই করতে পারলাম না।’
সোই উইন নামের দশম শ্রেণির এক শিক্ষক বলেছেন, ‘আমি গুনতে পারিনি কতজন মরেছে। তবে আমরা সবাই দেখেছি সৈন্যরা কী করেছে। তারা একজন একজন করে গ্রামবাসীকে জবাই করছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল গ্রামের রাস্তাঘাট।’
গাড়ি সারাইয়ের কাজ করা ২৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ শফি বলেছেন, ‘যেদিন সৈন্যরা আমাদের ওপর চড়াও হলো ওই দিন কেবল আমরা ফজরের নামাজ পড়ে সকালের খাবারের জন্য ভাত রান্নার প্রস্তুতি নিয়েছি। এমন সময় তিনজন সৈন্য মেশিনগান নিয়ে আমাদের উঠোনে এসে দাঁড়ায় এবং দ্রুত বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বলে।’ শফি বলেন, ‘সৈন্যরা বলছিল, তোরা বাঙ্গালি, ঘর থেকে বের হ। যেখানে খুশি যা, কিন্তু এখানে থাকতে পারবি না।’
শফি বলেন, ‘আমি এবং আমার পরিবার খুব ভয় পেয়ে যাই। এ কারণে আমি আমার প্রতিবেশী ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিককে কোনো সহযোগিতা করতে পারিনি। তার পশ্চাদ্দেশের ডান দিকের অংশ গুলি লেগে পুরো আলাদা হয়ে যায়। তারা দস্যুর মতো আমাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয় এবং সৈন্যদের কাঁধে থাকা রকেট লাঞ্চার দিয়ে গোলা ছুড়ে আরো ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।’ এর পরও অনেকে ঘন গাছপালা আর বৃষ্টিতে ভেজা ওই স্যাঁৎসঁতে জঙ্গলে যেতে অস্বীকার করে। সেখানে কয়েকজন নারী বসে বসে মুখ বুজে কান্না করছিল। অন্যরা একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। তারা এখন কী করবে? তারা সিদ্ধ পানি দিয়ে রফিকের ক্ষত ধুয়ে একটি ময়লা ন্যাকড়া দিয়ে বাঁধার চেষ্টা করছিল। এভাবেই প্রথম রাতটি নেমে এলো। এক অস্বাভাবিক অন্ধকার ছেয়ে ফেলল গ্রামটিকে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল, আকাশ কিছুক্ষণ পরপর আগুনে জ্বলজ্বল করে ওঠে আবার কিছুক্ষণ পর মিইয়ে যায়। তারা তখনো জানে না এমন আরো পাঁচটি রাত অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।
দ্বিতীয় দিন। ঘরে লুকিয়ে থাকা এক এক ব্যবসায়ী লম্বা হাড্ডিসার এক আর্মি সার্জেন্টের ডাক পেলেন। ওই সার্জেন্টকে সবাই চিনত এবং ‘বাজো’ বলে ডাকত, যে কিনা প্রায়ই ওই ব্যবসায়ীর বাসায় দাওয়াত খেতে আসত। বাজো বলে, সৈন্যরা ব্যবসায়ীর একটি খেয়া নৌকা তাদের কাজে অধিগ্রহণ করতে যাচ্ছে। মোহাম্মদ জুবায়ের নামের ৪০ বছর বয়সী ওই ব্যবসায়ী বুঝে যান, নৌকা না দিলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে। তিনি ওই আর্মি অফিসারকে দিয়ে নৌকাটি সেনা শিবিরের কাছের জেটিতে পাঠিয়ে দেন। সেনা কর্মকর্তা নৌকার চাবি নেন এবং কী কারণে ওই সার্জেনন্টকে হুমকি দেন এই বলে যে ‘তোকেও খুন করা হবে।’ তবে শেষমেশ নৌকাচালক অন্যদের নিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
জুবায়ের ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, তিনি নিজে গিয়েছিলেন নৌকার কী হচ্ছে দেখতে। সে ছিল এক ভয়ংকর দৃশ্য! সৈন্যরা একটার পর একটা লাশ নৌকায় তুলতে শুরু করল, ঠিক যেভাবে পাঁজা করে চেরাই করা কাঠ তোলা হয়। ওই লাশগুলোর মধ্যে ১৩ বছরের দুটি কিশোরের লাশও ছিল। অল্প বয়সী এই ছেলেগুলো জুবায়েরের পরিচিত ছিল। ‘এটা দেখে আমার জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয়’-বলেন জুবায়ের। তারপর তিনি চলে এসেছিলেন ওই স্থান ছেড়ে। তাঁর বিশ্বাস, ওই লাশগুলো মাঝনদীতে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় দিন রফিকের মা খালেদা বেগম তাঁর ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তাঁর অন্য চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে। বছরখানেক আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি তাঁর ভরণ-পোষণের ভাতা তুলে ছেলে-মেয়েদের মানুষ করছিলেন। তাঁরা একপর্যায়ে জঙ্গলে এসে দেখেন রফিক টানটান হয়ে শুয়ে আছে গাছের নিচে। কিছুক্ষণ সবাই মিলে হাউমাউ কান্না করে পালানোর চিন্তায় মন দেন।
বিপদ বাড়ছে দেখে ষষ্ঠ দিনে মং নু পল্লীর বাসিন্দারা দলবেঁধে দক্ষিণে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে হেঁটে রওনা দেন। ঘটি-বাটি যা পেরেছেন এবং সঙ্গে কিছু খাবার নিয়ে তাঁরা হাঁটা শুরু করেন। পথে খাবার ফুরিয়ে যায় এবং কলাগাছের কচি পাতা ও ঝরনার পানি খেয়ে আট দিন ধরে তাঁরা হাঁটেন। এ সময় সঙ্গের বাচ্চাগুলো মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। রফিককে কাঁধে নিয়ে হাঁটছিলেন শফী। রফিক কিছুক্ষণ পরপর এক পাশে ঝুলে পড়ছিল এবং অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল। তার পাও ফুলে উঠেছিল। অবশেষে তাঁরা একটি উঁচু পাহাড় পেরিয়ে একটি পিলার দেখতে পান। তাঁরা বুকে বল ফিরে পান, যখন মনে হলো সামনেই বাংলাদেশ! তখন বিকেল সাড়ে ৪টা বাজে। বৃষ্টি হচ্ছিল। এভাবেই তাঁরা শরণার্থীদের এক নতুন শহরে এসে পৌঁছায়, যেখানে রয়েছে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কালো প্লাস্টিক শিটে ছাওয়া হাজার হাজার অস্থায়ী তাঁবু। এত সব বিভীষিকা পেরিয়ে যখন তাঁরা সীমান্ত পিলারের কাছে চলে এলেন, তখন তাঁরা জড়িয়ে ধরলেন একে অন্যকে। খালেদা বেগম ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক অ্যানি গোয়েনকে বলেন, ‘আমি তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে গেছি। আমার কেবলই মনে হতে লাগল আর আমাদের কেউ মারতে পারবে না।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ