ঢাকা, সোমবার 16 October 2017, ১ কার্তিক ১৪২8, ২৫ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদায় আশ্বিন এসেছে কার্তিক

সাদেকুর রহমান : আবহাওয়া অধিদফতরের তিন মাসের পূর্বাভাসে জানিয়েছিল, অক্টোবর মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ মাসে বঙ্গোপসাগরে ১-২ টি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। যার মধ্যে অন্তত একটি ঘূির্ণঝড়ে রূপ নিতে পারে। আগস্টে দেয়া ওই পূর্বাভাসে তারা এও জানায়, অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মওসুমী বায়ুপ্রবাহ (বর্ষা) বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিতে পারে। কিন্তু লঘুচাপের প্রভাবে প্রকৃতি অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। সদ্য বিগত আশ্বিনের বেশির ভাগ সময় জুড়েই বর্ষার আমেজ লক্ষণীয় ছিল। তবে গত ক’দিন ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জনপদে ভোরবেলায় মৃদু ঠান্ডা অনুভূত ও হালকা কুয়াশা পড়তে দেখা যাচ্ছে। যদিও দিবাভাগে তীব্র গরমে হাঁসফাঁস লাগছে। 

আবহাওয়ার এমনি খেয়ালিপনার মাঝেও পঞ্জিকার শাসন মেনে বাংলায় এসেছে কার্তিক মাস। আজ সোমবার পহেলা কার্তিক। ধারণা করা হচ্ছে, আশ্বিনের অস্বাভাবিকতা কাটিয়ে এই কার্তিকে ‘শীতে গা শিন শিন’ করতে থাকবে। নবান্নের দেশে বঙ্গাব্দের সপ্তম মাস কার্তিক। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ এই সময়ে প্রকৃতিকে দেখেছেন এভাবে -‘চারদিকে ঝাউ, আম, নিম, নাগেশ্বরে  হেমন্ত আসিয়া গিয়াছে.....।’ কার্তিকের সাথেই পদার্পণ করলো সোনার ফসলে ভরা হেম হাসির ঋতু। ধান কাটার সাথে সম্পর্কিত অঘ্রাণ বা অগ্রহায়ণ হেমন্তের দ্বিতীয় তথা শেষ মাস।

গতকাল রোববার আরেকটি আশ্বিনের সাথে শরৎকালও বিদায় নিয়েছে নিয়মের ভেলায় চড়ে। খাল-বিলের পানি কমে যাওয়ায় গারই, সিন্ধী শালুকে রসনাতৃপ্তি মন্দ ঠেকে না। মাছ মারার ধুমও পড়ে গেছে। ‘আবার আসিব ফিরে ... এই কার্তিকের নবান্নের দেশে’ পরজনমে বিশ্বাসী কবি মউ-মউ গন্ধে পাগল করা নবান্ন উৎসবের দেশে ফের আসতে চাইছেন। বিলম্বিত বর্ষার কারণে এবার এখনো ধান কাটা শুরু হয়নি। তবে তা শীঘ্রই শুরু হবে। প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি ঘরে চলবে ভোজ উৎসব। আনন্দে মাতবে সবাই। নতুন ধানের পিঠা-পায়েসে ভাগ বসাবে বাপের বাড়ির নাইওরিরা। শীতকালীন ফসল বপনেরও উৎকৃষ্ট সময় কার্তিক। মাঠের পাড়ের দূরের দেশ থেকে ভারা ভারা সোনালী ধান গৃহস্থ বাড়িতে তোলার পর খলসে মাছের ঝোল দিয়ে ‘কামলাদের’ ভূরিভোজ করানো হয় বলে প্রাচীন লোক ছড়ায়ও উল্লেখ রয়েছে।

বঙ্গাব্দের অন্যান্য মাসের মতো কার্তিকেরও নামকরণ হয়েছে তারার নামে। সে তারার নাম ‘কৃত্তিকা’। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কর্তৃক ১৩৯০ বঙ্গাব্দের বৈশাখে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মেলা’ শীর্ষক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে- ‘কার্তিক মাসে সারা দেশে মোট ৪০টি মেলা ও পার্বণ হয়। একদিন থেকে আঠারো দিনব্যাপী এসব উৎসবকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। উৎসবমুখরতার জন্যেই হয়তো রূপসী বাংলার কবির অত্যন্ত প্রিয় ঋতু হেমন্ত। তার কাব্যকীর্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে কার্তিক তথা হেমন্তের উপস্থিতি। কবি শেখর কালিদাস রায় ‘হেমন্তে’, ‘হেমন্তে নিশীতে’, ‘শীতের প্রতি’ ইত্যাদি কবিতা সাজিয়েছেন। হেমন্ত-প্রকৃতি আকৃষ্ট করে বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নোবেল জয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও। তিনি ‘নৈবেদ্যের স্তব্ধতা’ কবিতায় লিখেছেন ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/ জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে/ শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার/ রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার/ স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’ 

শরতের বিপরীতে হেমন্ত আনে অবসাদ-¤্রয়িমাণতা, নীরব চাঞ্চল্য ভেতর-বাইরে। রোদের রং কখনো রাঙা, কখনো ঘুমকাতুরে। সেই ইন্দ্রিয়ঘনতার মধ্যে হেমন্তের রূপান্তরিত আবহ ধরা পড়ে বাঙালির মগ্নচৈতন্যে- ‘শূন্য এখন ফুলের বাগান, দোয়েল কোকিল গাহে না গান,/ কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে।’ শরতের শিউলী বিলীন হয় এই সময়ে। রেশমী কোমল শুভ্র কাশবনেও মলিনতা ভর করে। শীতের আমেজ আলতো করে গায়ে মাখার প্রতীক্ষায় প্রকৃতি। সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে রং বদলের আবহ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। উদ্ভিদরাজিও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রকৃতির নিয়মকে কখনো বা উপেক্ষা করতে সক্ষম বলেই এখন বাজারে শীতকালীন তরিতরকারির ব্যাপক আমদানি হচ্ছে। শীম, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, ধনেপাতা হামেশাই বেচাকেনা হচ্ছে। চড়া দামের তোয়াক্কা না করে ভোজন রসিকরা কিনছেন, খাচ্ছেন। শীতবস্ত্রের বেচাকেনা শুরু না হলেও লেপ, তোষক ও জাজিম বানানোর কারিগর ধুনকারেরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তারা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ছে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। শীতকে চুপি চুপি ডেকে আনতেই বুঝি হেমন্তের মৌন তাপস ভূমিকা। এক সময় শীতকে সাড়ম্বরে অভ্যর্থনা জানিয়ে হেমন্ত স্বেচ্ছায় নির্বাসনে চলে যাবে যথাসময়ে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। 

এদিকে, কার্তিক মাসটি বিষ্ণুপ্রিয় মণিপুরীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসের শুক্লা পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। মণিপুরীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ‘মহারাসলীলা’। মহারাস উৎসবের আগে পুরো কার্তিক মাস জুড়ে থাকে উৎসবের আমেজ। মণিপুরী লেইসাং বা মন্দিরগুলো ঢাক, করতাল, মইবুঙ ও সেলবুঙের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। এছাড়া হিন্দুদের কাছে কার্তিক মাস শ্রীহরির সেবার মাস। কার্তিক মাস বা দামোদর মাস ভক্তগণের কাছে আদৃত একটি মাস। কেন না এই মাসে হরিভক্তির অনুকূল যে কোনো কার্যই সহ¯্রগুণ অধিক ফলদান করে। ভক্তিভরে স্বল্প পরিমাণ ভগবদ্ সেবা সম্পাদন করলেও ভগবান শ্রীহরি অতিশয় প্রীত হন। বিশেষ করে কার্তিক মাসের অন্যতম একটি ভগবৎ সেবা হচ্ছে ভগবানের মন্দিরে বা গৃহমন্দিরে ভগবানের উদ্দেশ্যে দীপদান। এই সম্বন্ধে বিভিন্ন শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই মাসে শ্রীহরি মন্দিরে দীপ দান করলে তাকে আর এই জন্ম মৃত্যুময় জগতে ফিরে আসতে হয় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ