ঢাকা, মঙ্গলবার 17 October 2017, ২ কার্তিক ১৪২8, ২৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাহত্যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মুসলিম নিধনের অংশমাত্র

জিবলু রহমান : [দুই]
পরের দিনগুলোতে খালেদার যখনই ওই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তখনই তাঁর চোখ জলে ভরে ওঠে। এবারই প্রথম তিনি বিশ্বাস করতে চাইলেন যে গ্রামের অন্যরা যারা তাঁর ছেলে রফিককে গ্রাম থেকে বের করে আনতে সাহায্য করেছেন তাঁরা সত্যিই চেয়েছিলেন যে তাঁর ছেলে যেন বেঁচে থাকে। এই রোহিঙ্গারা বলেছে, তারা জানত সামনে আরো কঠিন সময় আসছে। এ ছাড়া শরীরও সায় দিচ্ছিল না। তাই তারা পাহাড়-পর্বত পাড়ি দেওয়ার ফাঁকে, এমনকি কাদামাটির মধ্যেও কিছুক্ষণের জন্য হলেও ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিয়েছে। তবে চোখ বন্ধ করলেই তাদের প্রতিবেশীদের প্রাণহীন নিথর দেহ মনের মধ্যে ভেসে উঠত। কানে বাজত মুহুর্মুহু গুলির শব্দ, যা আজও তাদের তাড়া করে। (সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
২৫ আগস্ট সহিংসতা শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা নানান সমস্যার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁদেরই একজন ৩০ বছর বয়সী আহসান। রাখাইন রাজ্যর চীন খালি গ্রামে নিজ বাড়িতে চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় মাসহ পরিবারের পাঁচজনকে। নির্মম সেই ঘটনার বর্ণনা কক্সবাজারের কুতুপাংলয়ে তিনি শুনিয়েছেন কাতারভিত্তিক আল জাজিরার প্রতিবেদককে। সেই নৃশংসতা, এহসানের বেঁচে যাওয়া, রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে তাঁর কথা ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে তুলে ধরা হলো:
আহসান বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হওয়ার আগে নিজ জমিতে কৃষিকাজ করতাম। কাজ  শেষে ছেলেমেয়েকে পড়াতাম। তাদের ইংরেজি শেখাতাম। সব মিলিয়ে আমার ব্যস্ত সময় কাটত। নৃশংসতা শুরু গত ২৫ আগস্ট সকালে। প্রতিদিনের মতো পরিবারের সবাই আমরা একসঙ্গে খাচ্ছিলাম। ওই সময় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে। অতর্কিত গুলি ছুড়তে শুরু করে। তাদের নির্বিচার গুলিতে আমাদের পরিবারের পাঁচ সদস্য প্রাণ হারায়।’ তিনি বলেন, ‘আমি দেখলাম, পিঠে গুলি লেগে মা মাটিতে পড়ে আছেন। মুখ ও শরীরে অনেক ছুরিকাঘাত খাওয়া আমার বোন পড়ে ছিল মায়ের পাশেই। এ ভয়ংকর দৃশ্য আমাকে দেখতে হয়েছে। তাঁদের এ অবস্থা দেখে যে একটু কাঁদব, সেই সামান্য সুযোগটুকুও পাইনি। কারণ সামরিক বাহিনীর গুলি থেকে বাঁচতে পালাতে হয়েছে।’
নিজের বোনের সেই ধর্ষণের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আহসান বলেন, একজন সেনাসদস্য বোনকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে তিনি বাধা দেন। এ সময় তাঁকে পিটিয়েছে সেনারা। তিনি বলেন, ‘এরপর থেকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত বোনটি কথা বলে না, কোনো রকমে একটু-আধটু চলতে পারে। বাঁশ ও কম্বলের সাহায্য আমি আর আমার ভাই বোনকে বাংলাদেশে বহন করে এনেছি।’
বাংলাদেশে আসার কথা বর্ণনা করে আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশে আসার পথে আমরা আরও ভয়ংকর দৃশ্য দেখেছি। পথে অসংখ্য মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। খেতে না পাওয়া শিশু ও বৃদ্ধের কান্না দেখেছি। যখন আমরা সীমান্তে পৌঁছালাম, দেখি হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আমাদের মতো নদী পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। তখন আমরা একটি নৌকা দেখতে পেলাম, যেটা সবাইকে পারাপারের কাজে ব্যবহার করছে।’
আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা খুব কষ্টে আছি। জীবন খুব অমানবিক ও নির্মম। আমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই, প্রাকৃতিক কাজ সারারও কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু এই বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। এই বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। যারা মিয়ানমারে আছেন, তাঁরা মারা যাবেন। কিন্তু এখানেও আমাদের জীবন বলে কিছু নেই।’ আহসান বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, পুরো বিশ্ব আমাদের সাহায্য করছে এবং সমর্থন করছে। এ জন্য আমি খুবই কৃতজ্ঞ। আপনারা যেভাবে বেঁচে আছেন, আমরাও ঠিক সেভাবেই বাঁচতে চাই।’ (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমারে পরিপূর্ণ স্বাধীনতাপ্রাপ্তির বহু আগে মধ্য এশিয়া থেকে মোন জাতির একটি অংশ মিয়ানমারে এসে বসবাস শুরু করে। মোনদের প্রতি ভারতীয় সভ্যতার ব্যাপক প্রভাব ছিল। সবচেয়ে বেশি ছিল ধর্মের প্রভাব। মোনদের পরপরই উত্তর থেকে তিব্বতি বর্মিরা মিয়ানমারে আগমন করে, বর্তমানে যাদের মনে করা বর্মিদের পূর্ব-পুরুষ। তিব্বতি বর্মিদের প্রধান শহর ‘পাগান’ এর প্রতিষ্ঠাকাল ৮৫০ খৃষ্টাব্দ। পাগানে মিয়ানমারের রাজধানী স্থাপন করে রাজা অনর্থ-যাকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বলে মনে করা হয় তিনি বর্তমান মিয়ানমারের অধিকাংশ অঞ্চল নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
রাজা অনর্থের সময়েই সর্বত্র বৌদ্ধ ধর্ম এবং পালি ভাষার বিস্তার ঘটে। অনর্থের বংশধররা দুইশ’ বছর মিয়ানমার শাসন করেছিল। এরপর মোনরা পাগান দখল করে এবং মোনশান রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এ রাজত্ব ১৮৮৫ সালে মিয়ানমারের শেষ রাজা থিবাউসের পরাজয়ের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে। এরপর মিয়ানমারে শুরু হয় বৃটিশ শাসন। বৃটিশ শাসন আমলেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা-যুদ্ধ করে মিয়ানমারের সীমানা নির্ধারিত হয়। এ সময় মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য প্রতিবেশী ভারতও চীন থেকে বৃটিশ সরকার অনেক শ্রমিক ভাড়া করে আনে। তাছাড়া ১৩৫টি জাতিসত্তায় বিভক্ত মিয়ানমারের জাতিগত বিদ্রোহ দমনের জন্যও প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় সৈন্য আনা হয়। পরে তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। আর এভাবেই মিয়ানমার হয়ে ওঠে পৃথিবীতে বহু জাতিসত্তায় বিভক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দেশ।
রোহিঙ্গারা শতভাগ মুসলমান। এ মুসলিম জনগোষ্ঠী ব্রিটিশ আমলে ভাগ্যান্বেষণে আরাকানে গিয়ে বসতি গেড়েছিল-এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় না। আরাকান আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে খুঁটি বা স্তম্ভ। আরব নাবিকরা বহু আগে থেকে বাণিজ্য করতে আরাকানে আসত। এই ‘অনেক আগে’ প্রাক ইসলামী যুগ নাকি ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের প্রায় সমসাময়িক, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। জনশ্রুতি হচ্ছে, একদা এক আরব বাণিজ্য তরী আরাকান উপকূলের কাছে ডুবে যায়। নাবিকরা সাঁতার দিয়ে কূলে উঠে আরবিতে ‘রহম’ ‘রহম’ ধ্বনিতে সাহায্য প্রার্থনা করে। ‘রহম’ থেকে তারা ক্রমে রোহাং এবং আরো পরে রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত লাভ করে। সে সময় রাজধানীর নামে রাজ্য পরিচিত হতো।
আরাকানের রাজধানী ছিলো ওয়াছেলি নগরী, যা বাংলা সাহিত্যে বৈশালী নামে পরিচিত। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান ও আবার বৌদ্ধ রাজারা পর্যায়ক্রমে স্বাধীন আরাকানে রাজত্ব করেন। ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী কবি আলাওল নৌপথে চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় পর্তুগীজ দস্যুদের হাতে আটক হয়েছিলেন। তাকে আরাকানের রাজার কাছে যখন বিক্রি করে দেয়া হয় তখন এক বৌদ্ধ রাজ্যটি শাসন করতেন। আলাওলের রচনায় আরাকানে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক উপস্থিতির বিবরণ আছে। ১৬৫৯ সালে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীরজুমলার কাছে পরাজিত হয়ে শাহ সুজা যখন আরাকানে পালিয়ে যান তখনো এটা স্বাধীন রাজ্য ছিল। ১৭৮৪ সালে বার্মার (মিয়ানমার) রাজা বোধোপায়া আরাকান দখল করে রাজ্যে প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বর্মি সৈন্যদের অত্যাচারে সেখানকার বৌদ্ধ ও মুসলমান অধিবাসীরা দলে দলে চট্টগ্রামে ও পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে আসে। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশরা আরাকানসহ সমগ্র বার্মা দখল করে নিলে এদের অনেকে আবার সেখানে ফিরে যায়।
উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন সূত্রে থেকে জানা যায়, অষ্টম ও নবম শতকে যখন আরবরা এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আসেন, তখনই পশ্চিম মিয়ানমারে মুসলমানরা বসতি শুরু করেন। রাখাইন প্রদেশের ৪০ লাখ বাসিন্দার মধ্যে ৩০ লাখ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, যারা রাখাইন নামে পরিচিত। বাকি ১০ লাখ মুসলমান ধর্মাবলম্বী এবং বেশির ভাগই বাংলাভাষী।
সুচি ও মিয়ানমারের অন্য কর্মকর্তারা ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানান। তারা রোহিঙ্গাদের দেখে থাকে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে। কিন্তু তাদের এই ধারণাটি অযৌক্তিক (অ্যাবসার্ড)। ১৭৯৯ সালের দলিল পর্যন্ত বলছে, তখনও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটিশ সরকার জাপানের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সমর্থন আদায় করে এই শর্তে যে, যুদ্ধে জয়ী হলে তাদের জন্য ‘ন্যাশনাল এরিয়া’ ঘোষণা করা হবে। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালে রোহিঙ্গা মুসলমান নেতারা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করে পশ্চিম মিয়ানমারের মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাকে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করার দাবি জানান। যদিও সে দাবি গ্রাহ্য হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ