ঢাকা, মঙ্গলবার 17 October 2017, ২ কার্তিক ১৪২8, ২৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ থাকলে এতোদিন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন?

স্টাফ রিপোর্টার: প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সরকারের সাজানো রূপকথার গল্প হিসেবে দেখছে বিএনপি। গতকাল সোমবার সকালে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির (সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো একেবারে পাতালপুরী থেকে নিয়ে আসা রূপকথার গল্প ছাড়া অন্যকিছু না। জোর করে সন্ত্রাসী কায়দায় জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে ছুটিতে পাঠিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার পর এখন চূড়ান্ত পদক্ষেপ পদত্যাগ করাতেই হঠাৎ এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে জনগণ বিশ্বাস করে। একইভাবে রিজভী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে- প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে আপীল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিকে ডেকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি বৈঠক করেছেন এবং তাদের বুঝিয়েছেন। দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও বলছেন যে, এটা সংবিধান নেই। প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে অন্য বিচারপতিদের নিয়ে বৈঠক করে রাষ্ট্রপতিও সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম আজাদ, মুনির হোসেন, কাজী আবুল বাশার, রফিকুল ইসলাম রাসেল, সাইফুল ইসলাম পটু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রিজভী বলেন, এটা একেবারে সুস্পষ্ট যে, তাকে (প্রধান বিচারপতি) ঘায়েল করার জন্য তার বিবৃতি, তার বক্তব্য, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে তার পর্যবেক্ষণে সরকার নানাভাবে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন বলেই এই বানোয়াট আক্রমন শুরু করেছে একের পর এক। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব প্রশ্ন করে বলেন, রাষ্ট্রপতি যদি প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এতো অভিযোগই থাকে তাহলে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করলেন না কেনো- এই প্রশ্ন এখন আইন অঙ্গনে ঘোরপাক খাচ্ছে। ওরা(সরকার) যে মুকীম গাজীর কায়দায় কাজ করছেন, সংবিধানের কায়দায় কাজ করছেন না। ডাকাতরা যেমন কেড়ে নেয়া, মেরে ফেলা, সন্ত্রাসীরা যেমন অন্যের জমি দখল করে নেয়ার জন্য যে কাজ করছেন ঠিক একইরকম হুবহু সেই ডাকাতির একই বৈশিষ্ট ধারণ করেছেন এই সরকার।

পাঁচ বিচারপতির সঙ্গে রাষ্ট্রপতির বৈঠক প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে- প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে আপীল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিকে ডেকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি বৈঠক করেছেন এবং তাদের বুঝিয়েছেন। দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও বলছেন যে, এটা সংবিধান নেই। প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে অন্য বিচারপতিদের নিয়ে বৈঠক করে রাষ্ট্রপতিও সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধানের নিয়ম হলো প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে অভিযোগগুলো রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তদন্তের জন্য পাঠাবেন। রাষ্ট্রপতি এই ধরণের ব্যবস্থা না দিয়ে কেনো আপীল বিভাগের অন্যান্য বিচারকদের নিয়ে বৈঠক করে তাদের অভিযোগ শুনালেন এটা মানুষের বুঝতে বাকী নেই।

তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ থাকলে তা পুরনো অভিযোগ। তাহলে এতোদিন এসব অভিযোগ দিলেন না কেনো? যখন প্রধান বিচারপতি বিচারিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন, নানা রায় দিচ্ছেন তখন তো এসব অভিযোগ সরকার তুলেনি। যখন ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে সরকার ক্ষুব্ধ হয়েছেন তখনই শুরু হলো একের পর এক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আক্রমনের পালা আমরা দেখতে পেলাম। তার মানে এই সরকার কত বড় অনৈতিক তাদের স্বার্থ আদায় হলে যতই অভিযোগ থাক, সেই অভিযোগ পাতালের মধ্যে একেবারে অতল পাতালে ঢেকে রাখা হয়। অভিযোগ যদি কারো বিরুদ্ধে নাও থাকে, স্বচ্ছ মানুষ যদি হয়ে থাকেন আর তিনি এই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তাহলে নানা ধরনের অভিযোগ তারা পাতাল থেকে তুলে নিয়ে আসবেন, একেবারে লিথোস্ক্রিয়া থেকে তুলে নিয়ে আসবেন।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেলসহ ১০ কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ সংক্রান্ত আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারিকে ‘বেআইনি’ বলে দাবি করেছেন রিজভী। তিনি বলেন, গতকাল (রোববার) আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেলসহ উচ্চ আদালতের প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। এটা নজির বিহীন ঘটনা। প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পূর্বে বলেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনের রদবদল শুধুমাত্র প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার। তাহলে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয়ের বদলীর প্রজ্ঞাপনও বেআইনি। এটা আইন মন্ত্রণালয় করতে পারে না। কিন্তু তাদের (আইন মন্ত্রণালয়) তো এসব যায় আসে না। কারণ তারা বেপরোয়া জমিদারির রাজত্ব কায়েম করেছে, তারা এখন সংবিধান, আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া-এসব থোড়াই কেয়ার করে।

রিজভী বলেন,  এখন আদালত প্রাঙ্গণে যা ঘটছে তা হচ্ছে সরকার প্রধানের একক কর্তৃত্বে বিচার বিভাগকে অধীন করার জন্য যাবতীয় আয়োজন। প্রধানমন্ত্রী অদ্বিতীয় স্বৈরাচার হওয়ার পথে সকল কাটা সরাতে এতোসব নির্লজ্জ দুর্বৃত্তপনা। বাংলাদেশে বেআইনি কর্মকান্ডরত অতি ক্ষমতাধররা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওদের কে ধরবে? ওদের কে গ্রেফতার করবে? এতো অন্যায় এতো বেআইনি কর্মকা- এতো লঙ্ঘন করছেন এই সরকার। কারণ জনগণের টাকায় যে বন্দুক, তার নিয়ন্ত্রণ তো ওদের হাতে। এই বন্দুক তো আর বিচার বিভাগের হাতে নেই, এই বন্দুক তো অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। এই বন্দুকটা নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। সরকার তা আইন অনুযায়ী পরিচালিত করছে না।

সরকার ডাকাত মুকীম গাজীর ভুমিকায় মন্তব্য করে রুহুল কবির রিজভী বলেন,আইনমন্ত্রী একটা বিবৃতি দিলেন যে তিনি(প্রধান বিচারপতি) ক্যান্সার রোগে ভুগছেন এই কারণে তিনি ছুটি চেয়েছেন। কত বড় নির্লজ্জ মিথ্যাচার। স্বয়ং প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথে বললেন,  আমি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ। তাহলে তো আইনমন্ত্রী, সরকার ওই যে আমরা আগে শুনতাম ডাকাত মুকীম গাজীর কথা। এই ডাকাত মুকীম গাজীর ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তারা। জোর করে প্রধান বিচারপতিকে দেশ থেকে বিতারণের জন্য অবলীলায় মিথ্যা কথা বলে, অবলীলায় তারা সন্ত্রাসী কর্মকা- করে দেশ থেকে তাকে বিতাড়ন করলেন। প্রধান বিচারপতি যাওয়ার সময় যে বিবৃতি দিয়ে গেলে এতে তো সরকারের মুখে চুনকালী পড়ার কথা। তারপরও এরা নির্লজ্জের মতো বিবৃতি দিচ্ছেন, বেপোরোয়া কর্মকান্ড করছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকালে ঢাকা, কুষ্টিয়া, ব্রাক্ষণবাড়ীয়া, বরিশাল, গাইবান্ধা, ফরিদপুর, রাজশাহী, বগুড়া, ঝিনাইদহদ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্র দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবি জানান রিজভী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ