ঢাকা, মঙ্গলবার 17 October 2017, ২ কার্তিক ১৪২8, ২৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের সামনে প্রযুক্তির চরম অভিশাপ!

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ব্লু-হোয়েল বা নীল তিমি। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের ১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশেও এই নীল-তিমির দেখা মিলেছে। দেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে এই নীল তিমি নামক গেম আসক্তির মাত্রা একে একে বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই গেমে আসক্তির ফলাফলের কারণে নানা বয়সী অনেকেই উৎসাহী হয়ে পড়েছেন। সর্বস্তরে এখন জানার বিষয়ে পরিণত হয়েছে গেমটি। প্রযুক্তির কল্যাণে এটি বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লেও আসক্তদের জন্য এটি অকল্যাণ হয়ে দেখা দিয়েছে। যার কারণে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের কাছে ইতোমধ্যে গেমটি অভিশাপে রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারসহ সকল মহলেরই টনক নড়েছে। সংশ্লিষ্টরা গেমটি রোধে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলেও খবর এসেছে।

বয়সের নিয়মে মোবাইল-ট্যাব বা পিসিতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, গেম খেলা কিংবা মুভি দেখাটা আর বিনোদন পর্যায়ে থাকছে না। মান-অভিমান-জেদকে উসেকে দিচ্ছে তা। জীবনের একটি পর্যায়ে নীল তিমি নিজেই যেমনটা সমুদ্র তীরে চলে আসে, শুকনো ভূমিতে ধীরে ধীরে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, অনেকটা সেভাবেই কিশোর জীবনের অপমৃত্যু ঘটছে ব্লু-হোয়েল ( নীল তিমি ) গেমের কারণে।

প্রতিনিয়ত এ দেশের ভার্চুয়াল দুনিয়া অতলান্ত সাগরের মতো গাঢ় নীল হয়ে উঠছে। মিলছে কৃষ্ণগহ্বরে। সীমানা রেখা মুছে দিয়ে যা অনেকক্ষেত্রেই অন্তর্ঘাত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তারপরও কেউ কেউ দাবি করছেন, বাংলাদেশে নীল তিমির অস্তিত্ব নেই; কিশোরিটি ব্লু-হোয়েল খেলে আত্মহত্যা করেনি ইত্যাদি মন্তব্যে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে কিংবা বিষয়টিতে কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। প্রকারন্তরে এটাও আত্মঘাতির নামান্তর।

বিষয়টিকে প্রযুক্তির চরম অভিশাপ বলে উল্লেখ করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, তথ্য প্রযুক্তির যেমন ভাল দিক আছে তেমনি খারাপ দিকও রয়েছে। এটি প্রযুক্তির খারাপ দিকের চরম পর্যায়। মূলত কম বয়সী ছেলে মেয়েরা অতিরিক্ত কৌতুহল থেকে এসব দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, একাকিত্ব ও বাবা-মায়ের অসচেতনতা এর জন্য বড় দায়ী।

সম্প্রতি রাজধানীতে অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা (১৩) নামের এক তরুণির আত্মহত্যার খবর প্রকাশের পর এ নিয়ে দেশব্যাপী উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। সর্বশেষ ব্লু-হোয়েলে আসক্ত দুই কিশোরের খোঁজ মিলেছে বলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়।

এদিকে, গাজীপুরের শ্রীপুরে ‘ব্লু-হোয়েল’ গেমে আসক্ত ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার সকালে স্কুলে গেলে শিক্ষকরা তার হাতে নীল তিমি সদৃশ ছবি আঁকা দেখতে পান। পরে তার পরিবারকে খবর দেন তাঁরা।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেন বলেন, সকাল থেকে সে ক্লাস করছিল। দুপুরের দিকে হঠাৎ সহপাঠীদের একজন তার হাতে কোনো কিছু আঁকা আছে দেখতে পেয়ে শিক্ষককে জানায়। পরে শিক্ষক তার শার্টের হাতা খুলে ডান হাতে রক্তাক্ত তিমি সদৃশ ছবি দেখতে পান। তার ব্যবহৃত মোবাইলে ব্লেড দিয়ে কেটে কেটে তিমির ছবি আঁকার ২ মিনিট ১০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রটি কিছুদিন ধরে স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। অসুস্থতাসহ নানা কারণ দেখিয়ে সে স্কুল থেকে বিভিন্ন সময় ছুটিও নেয়।

ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, সে কিছুদিন আগে মোবাইলে একটি গেম ইনস্টল করেছিল। পরে তা ফেলে দেয়। গতকাল রাতে কৌতূহলবশত সে তার হাতে তিমি মাছের ছবিটি এঁকেছে। আগে ইনস্টল করা গেমে তাকে হাত কেটে তিমির ছবি আঁকতে বলা হয়েছিল বলে প্রথমে স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করে।

এ ব্যাপারে ছেলেটির মা বলেন, ‘আমার ছেলে যে গেমে আসক্ত হয়ে গেছে, আমি আগে তা খেয়াল করিনি। আমি তার ঘরে খুব কম যাই। কিছুদিন ধরে সে আগের থেকে বেশি রাগারাগি করছে। সাধারণ বিষয় নিয়ে রাগ করে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে, আগে এমনটা দেখিনি।’

এর আগে সাভারে ব্লু-হোয়েল তরুণীর সন্ধান পাওয়ার খবর জানা গেছে। তার নাম তানিয়া আক্তার। রাজধানীর শ্যামলীর পিসি কালচার এলাকার একটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতালে কাজ করেন। স্থানীয়ভাবে একটি ফিজিওথেরাপির চেম্বারও রয়েছে তার। পরিবারিকভাবে একটি কন্যা সন্তানের জননী হলেও গত কয়েক বছর হলো স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বাবা-মায়ের সঙ্গেই সাভার পৌর এলাকার ইমান্দিপুর মহল্লায় বসবাস করতেন তানিয়া। মেয়েটি তার বাবার কাছে থাকায় তিনি কিছুটা হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে সাভারের ওই তরুণীই ব্লু-হোয়েল গেমে আসক্ত হয়ে পড়েন। অর্ধেকেরও বেশি ধাপ খেলে ফেলা এ তরুণীর অস্বাভাবিক আচরণে সন্দেহ হলে পরিবারের সদস্যরা গত শুক্রবার বিকালে তাকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে সাভারের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ঘটনার পর হাসপাতাল ও এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে পরদিন শনিবার সকালে তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেয় পরিবারের লোকজন।

আসক্ত ওই তরুনী জানান, তার মোবাইলের ইমু অপশনে তিনি এই গেমের লিংক পান। প্রথমে কিছুটা আনন্দ পান। পরে তিনি আসক্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি নিজের শরীরের বিভিন্ন স্থান কাটেন। তানিয়া জানান, তার এক বন্ধুর সহায়তা নিয়ে তিনি এই গেম থেকে বেরিয়ে এলেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, কৌতূহল থেকে গেমটি খেলতে শুরু করলেও পরবর্তীতে এর ভয়াবহতা বুঝতে পারেন। তবে গেম থেকে বের হয়েও আসতে পারছিলেন না তিনি। এরই মধ্যে ধাপে ধাপে খেলে ফেলেছেন ৩৯টি ধাপ। তবে পরিবারের সদস্যদের কারণে গেমটির সবকিছু বাস্তবায়ন করতে পারছিলেন না তিনি।

এদিকে, রাজধানীর মিরপুরের ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সে কৌতূহলবসত ব্লু-হোয়েল খেলত। তার নির্দেশনা মানতে মানতে নিজের শরীরে ব্লেড দিয়ে ক্ষত করেছে সে। গেমটির শেষের স্টেজে সে আত্মহত্যার জন্য ঘুমের ওষুধ খায়।

ওই কিশোর বলে, ‘চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় আমি গেমটি খেলা শুরু করি। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ভালো লাগত। অ্যাডমিনরা অনেক সময় অপমান করে কথা বলত, আমাকে বোকা বলত। তাই আমি চ্যালেঞ্জগুলো পার করতাম। এখন একটু অসুস্থ বোধ করছি। আম্মুকে বলেছিলাম এখানে আনলে আমি ভালো হব না। তাও আমাকে নিয়ে এসেছে।’

অপরদিকে, মরণঘাতী ব্লু-হোয়েল গেমসে আসক্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তবে ওই ছাত্রের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা জানিয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা। বর্তমানে ওই শিক্ষার্থীকে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে।

হেফাজতে নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মশিউদ্দোলা রেজা বলেন, চবির ওই শিক্ষার্থীকে মঙ্গলবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে ক্যাম্পাস থেকে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়েছে। বর্তমানে তাকে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে ওই শিক্ষার্থীর বিস্তারিত জানাতে অপরাগতা জানান তিনি।

তবে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, হেফাজতে থাকা ওই শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। গেমটিতে আসক্ত জানতে পেরে তার বন্ধুরা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে। পরে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। এছাড়া হেফাজতে নেয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর লিটন মিত্রও নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর এই গেমের শিকার হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী। গত দু’মাস ধরে ভারতজুড়ে চলছে ব্লু-হোয়েল আতঙ্ক। এই গেমের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা। আর গেমে প্রবেশ করে তারা বিবেকহীন হয়ে পড়ে। এটা মাদকাসক্তের চেয়ে ভয়ঙ্কর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান বলেন, এটা ইন্টারনেটে একটা অভিশাপ। টেকনোলজির নতুন নতুন আবিষ্কার সমাজের কল্যাণের পাশাপাশি অকল্যাণেরও বার্তা দেয়। ব্লু- হোয়েল খেলা তারই একটি ফল। এ গেমকে অত্যাধিক আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হয়েছে। এটা এতটাই আকর্ষণীয় যে, এক স্টেপের পর আরেক স্টেপে যেতে ছেলেমেয়েরা অস্থির হয়ে পড়ে। একটা পর্যায়ে সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। এর হাত থেকে শিশু কিশোরদের রক্ষার উপায় হিসেবে প্রবীণ এ মনোবিজ্ঞানী, সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণকারীদের নজরদারি বাড়ানো, এসব গেমের উৎস বন্ধ করা এবং ছোটকাল থেকেই সন্তানের সব বিষয় বাবা মায়ের সাথে শেয়ার করার সুযোগ করে দেয়া, প্রযুক্তির ব্যবহারে সচেতন হওয়ার কথা বলেন।

অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সমাজে আমরা বাস করছি। এ পরিবর্তনের মাঝে এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় অনেক কিছুই আমাদের সমাজে ঢুকে পড়ছে। ব্লু-হোয়েল তারই একটি ফল। যারা মানসিকভাবে সুস্থ নয় তারা তরুণদের কাছে এই ধরনের অ্যাডভেঞ্চার ছুড়ে দেয়। আর তরুণরা এই গেমের একটা স্টেপ পার করাকে অর্জন হিসেবে নেয়। নবাগত অনেক বিষয় আমাদের সামাজিক অনুশাসনের সাথে খাপ খাচ্ছে না। সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে স্কুলিং, কাউন্সেলিং, কমিউনিটি পর্যায়ে কার্যক্রম বাড়াতে হবে। আর সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অভিভাবকদের সচেতনতা।

প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানি অধ্যাপক ডা. মুহিত কামাল জানান, অনেক কিশোর-শিশোরী এখন এই গেমে আসক্ত হচ্ছে। গেমটি তাদের এক পর্যায়ে বিবেকহীন করে ফেলে। তখনই আস্তে আস্তে তাদের আত্মহননের পথে নিয়ে যায়। কিশোর-কিশোরীরা বিষয়টি বুঝতে পারে না। মুহিত কামাল তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জিত তরুণ সমাজকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, বাংলাদেশে নতুন আতঙ্ক ব্লু-হোয়েল গেমের ব্যাপারে তদন্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনকে (বিটিআরসি) এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। তারা তদন্ত প্রতিবেদন দিলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

‘ব্লু-হোয়েল’ গেমের শুরুটা

বৃটেনের জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক দ্য সান জানায়, বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার গেম হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ‘ব্লু-হোয়েল’ গেমটি মূলত তৈরি করা হয়েছিল হতাশাগ্রস্ত মানুষের পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় করে দেওয়ার জন্য। নির্মাতার সেই উদ্দেশ্য অনুযায়ী হতাশ, বিষন্নতা যাদের নিত্যসঙ্গী তারাই এখন এই গেমের প্রধান শিকার।

গত কয়েক মাসে সারা বিশ্বের শত শত কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার জন্যে দায়ি সেই ‘ব্লু-হোয়েল’ গেমটির উদ্ভাবক ফিলিপ বুদেকিন (ফক্স) নামের এক রাশিয়ান তরুণ। ২০১৩ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে এফ-৫৭ নামে একটি গ্রুপ তৈরি করেন তিনি। যা সামাজিক মাধ্যম 'ভিকে' তে খোলা হয়েছিল। আর এই গ্রুপ থেকে প্রথমে বুদেকিন ও তার অন্যান্য অ্যাডমিনদের মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত হতাশাগ্রস্ত এবং দুর্বলচিত্তের টিনএজারদের শনাক্ত করত। এরপর নিজের পাতানো ফাঁদে ফেলে তাদের আত্মহত্যার পথে এগিয়ে নিয়ে যেত।

বুদেকিন সেইন্ট পিটার্সবার্গ এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি তার উদ্ভাবিত খেলার মধ্য দিয়ে সমাজের 'শুদ্ধিকরণ' করছেন। তিনি গর্বের সাথে বলেন, হতাশাগ্রস্ত মানুষের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই, তাদের পৃথিবী থেকে বিদায় দেয়াই তার লক্ষ্য।

যা শুনে বুদেকিনের মানসিক সুস্থতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে পুলিশ। তবে, ব্লু-হোয়েল গেমের মাধ্যমে যে সরাসরি আত্মহত্যার নির্দেশ দেয়া হয়-সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বুদেকিন। তিনি বলেন, এই গেমে কাউকে আত্মহত্যার জন্য অনুপ্রাণিত করা হয় না। তার দাবি, গেইমটির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই ইউজাররা নিজে থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

কিন্তু বুদেকিন শুধু কি সমাজের 'শুদ্ধিকরণ' করতে চেয়েছিলেন, নাকি এই গেমের পেছনে তার অন্য কোনো কারণ ছিল? বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বুদেকিনের কৈশোর অন্য দশটা রাশিয়ান কিশোরের মত ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তাকে তার মা বাবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। তার একটা কারণ রয়েছে এই গেমটি তৈরির পেছনে। অন্যদিকে, বুদেকনি নিজেও মানসিকভাবে কিছুটা বিকারগ্রস্ত ছিল বলে জানিয়েছে রাশিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বুদেকিনের সৃষ্টি করা এই গেইমটি একবার কারো মোবাইলে ডাউনলোড হয়ে গেলে তা আর কোনোভাবেই আনইনস্টল করা যায় না। তখন খেলতে না চাইলেও অনবরত নোটিফিকেশন আসতে থাকে। তখন এক পর্যায়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিশোর-কিশোরীরা গেমটি খেলতে শুরু করে। প্রথম দিকে গেমটি আপনার ফোনের সিস্টেমে ঢুকে আপনার আই পি এড্রেস, মেইলের পাসওয়ার্ড, ফেসবুক পাসওয়ার্ড কনট্যাক্ট লিস্ট, গ্যালারী ফটো এমনকি আপনার ব্যাংক ইনফর্মেশান! আপনার লোকেশানও তারা জেনে নেবে। এভাবে আপনাকে কৌশলে এমনভাবে পরিচালনা করবে যে আপনি আর গেমটি থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন না। কিংবা আসতে চাইলেও তারা বিভিন্নভাবে আপনাকে ক্ষতি করার হুমকি দিতে থাকবে। আর সেই পথে আপনাকে নিতে পারলে গেমটি শেষ ধাপ অর্থাৎ ৫০তম স্টেপে আপনাকে আত্মহত্যার করার কথা বলা হবে। আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হবে গেমটি।

'ভিকে' নামক ওই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে 'ব্লু-হোয়েল সুইসাইড গেম' নামের পেজের অ্যাডমিন ছিলেন বুদেকিন নিজেই। সেই সূত্র ধরেই বেশ কিছুদিন তদন্ত চালিয়ে বুদেকিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর গত মে মাসে এক গোপন বিচারের মাধ্যমে তাকে ৩ বছরের কারাদ- দেয়া হয়। বর্তমানে তিনি সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে কারাভোগ করছেন বলে জানিয়েছে ডেইলি মেইল। তবে বুদেকিন গ্রেফতার হলেও তার সৃষ্টি করা এই গেইম সারাবিশ্বে ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে আগের মতই ছড়িয়ে পড়ছে।

আসক্তদের চিহ্নিত করা যাবে যেভাবে

যেসব কিশোর-কিশোরী ব্লু-হোয়েল গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে তারা সাধারণভাবে নিজেদেরকে সব সময় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। অনেকটা অস্বাভাবিক আচারণ করে। স্বাভাবিক আচরণ তাদের মধ্যে দেখা যায় না। দিনের বেশিরভাগ সময় তারা কাটিয়ে দেয় স্যোশাল মিডিয়ায়। থাকে চুপচাপ। কখনো আবার আলাপ জমায় অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে। গভীর রাত পর্যন্ত ছাদে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় অনেককে। একটা সময়ের পর নিজের শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলতে থাকে তারা।

ব্লু-হোয়েলের ৫০ চ্যালেঞ্জ

অনেকের মনেই ব্লু-হোয়েল গেমটির চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ, গেমটিতে একজন গেমারকে ৫০ টি চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়। সব শেষ ধাপটিতে গেমারকে আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়। হিগিপপ ওয়েবসাইটে ব্লু-হোয়েল গেমের ৫০টি চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলা হয়েছে। পাঠকদের ভয়াবহ গেমটির ব্যাপারে সচেতন করার জন্য চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হল।

ব্লেড কিংবা রেজর দিয়ে নিজের হাতে 'এফ ৫৭' গ্রুপের নাম লিখতে হবে। একই সঙ্গে প্রমাণ হিসেবে সেটির ছবি তুলে তাদেরকে পাঠাতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে ভোর ৪টা ২০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে অ্যাডমিনের পাঠানো ভীতিকর ভিডিও দেখতে হবে। নিজের হাত কাটতে হবে। তবে খুব বেশি না। তিনটি দাগ কেটে তার ছবি এডমিনকে পাঠাতে হবে। হাতে তিমি মাছের ছবি এঁকে গেমের কিউরেটরকে পাঠাতে হবে। গেমার যদি 'হোয়েল' হতে চান তবে পায়ে 'ইয়েস' লিখে জানাতে হবে। না চাইলে নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করতে হবে। একটি গোপন ধাঁধা দেয়া থাকবে, তার সমাধান করতে হবে। নিজের হাত কেটে 'এফ ৪০' লিখে তার প্রমাণ হিসেবে ছবি তুলে অ্যাডমিনকে দেখাতে হবে। নিজের ভিকনটাকের স্ট্যাটাসে ('#রথধসথযিধষব (ৎঁং. #яথкит)' লিখতে হবে। শরীর ও মৃত্যুর ভয়কে জয় করার প্রমাণ দেখাতে হবে। ভোর ৪টা ২০মিনিটে ঘুম থেকে উঠে উঁচু ছাদে হাঁটতে হবে। এই উচ্চতা যত বেশি হবে তত ভালো। আবারো হাতে ব্লেড কিংবা রেজর দিয়ে তিমি আঁকতে হবে। সারাদিন ভৌতিক এবং সাইকোডেলিক ভিডিও দেখতে হবে। অ্যাডমিন যে গান পাঠাবে তা শুনতে হবে। নিজের ঠোঁট কেটে দেখাতে হবে। সুঁই দিয়ে হাতের বিভিন্ন জায়গায় ফুটো করতে হবে। নিজেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তুলতে হবে। পরিচিত সবচেয়ে উঁচু ছাদে নিজেকে নিয়ে যেতে হবে এবং কিছুক্ষণ তার একেবারে কোণায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। ব্রীজের কিনারে যেতে হবে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। একটি ক্রেনের উপর উঠতে হবে, না পারলে চেষ্টা করতে হবে। অ্যাডমিন যাচাই করে দেখবে গেমারকে বিশ্বাস করা যায় কিনা। স্কাইপেতে অন্য গেমার কিংবা কিউরেটরের সঙ্গে কথা বলতে হবে। পা ঝুলিয়ে কিছুক্ষণ একটি উঁচু ছাদে গিয়ে বসতে হবে। এবার একটি ধাঁধার সমাধান করতে হবে। গোপনীয় কাজ দেয়া হবে। তবে কি কাজ সেটা এডমিনের উপর নির্ভর করবে। গেমারকে আরেকজন গেমারের সাথে দেখা করতে হবে। অ্যাডমিন গেমারের মৃত্যুর একটি তারিখ নির্ধারণ করবেন এবং গেমারকে তা বিনা বাক্যে মেনে নিতে হবে। ভোর ৪টা ২০মিনিটে ঘুম থেকে উঠতে হবে এবং রেলপথ বেছে সেখানে হাঁটতে হবে। সারাদিন কারো সাথে কথা বলা যাবে না। গেমার যে একজন ‘হোয়েল' হতে পেরেছেন তা নিশ্চিত করতে মাথা নিচু করে সম্মান জানাতে হবে। এরপর ৩০ থেকে ৪৯ ধাপে প্রতিদিন ৪টা ২০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে ভৌতিক ভিডিও দেখতে হবে। তাদের পাঠানো গান শুনতে হবে। এছাড়া প্রতিদিন শরীরের যে কোনো স্থানে ক্ষত সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি অন্য গেমারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। একটি উঁচু ভবন থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে হবে।

বাঁচতে শেখায় পিঙ্ক হোয়েল

ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জ, এখন এই আতঙ্ক ছেয়ে রয়েছে বিশ্ব তথা সারা দেশ। চিন্তায় রয়েছেন বাবা-মায়েরা। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অনলাইন গেম খেলার প্রবণতা রয়েছে। আর তার ফলেই মাঝে মধ্যেই ঘটে যাচ্ছে ভয়ঙ্কর সমস্ত ঘটনা। ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জ নামে ওই অনলাইন গেমের ফাঁদে নিজেদের প্রাণ শেষ করে দিচ্ছে ছোট ছোট কিশোর-কিশোরীরা।

ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জের মতো আরো একটি অনলাইন গেম রয়েছে ইন্টারনেটে? তার নাম পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ। কী এই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ? এও কি কোনো মারণ খেলা?

জানা যাচ্ছে, ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জের একেবারে বিপরীত এই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ। একদিকে যখন ব্লু-হোয়েল চ্যালেঞ্জের কারণে ছোট ছোট শিশুর প্রাণ যাচ্ছে, নিজেদের প্রাণ নিজেরাই শেষ করে দিচ্ছে, তখন অন্যদিকে পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ একইরকম অনলাইন গেমের মাধ্যমে শেখাচ্ছে কীভাবে জীবনে খুশি থাকতে হয়।

পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জেও রয়েছে বেশ কিছু টাস্ক। হাত কাটা নয়, সেখানে হাতে লিখতে বলা হচ্ছে, আপনি আপনার প্রিয়জনকে কতটা ভালোবাসেন। নিজেকে শেষ করে দেয়া নয়, পিঙ্ক হোয়েল গেম বলছে নিজেকে ভালোবাসার কথা। তাই এই অনলাইন গেমটি নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ