ঢাকা,বুধবার 18 October 2017, ৩ কার্তিক ১৪২8, ২৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রচন্ড চাপে অর্থনীতি

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি প্রচন্ড চাপের মুখে পড়েছে এবং কিছু বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে ইতিবাচক ব্যবস্থা না নেয়া হলে দেশকে কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের কারণে আড়াল হয়ে গেলেও এবার সারাদেশেই অস্বাভাবিক বন্যা হয়েছে। বন্যায় প্রথমে বোরোর এবং তারপর আমন ও আউশ ধানের চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব ফসলই অনেক কম পরিমাণে উঠেছে ক্ষেত থেকে। একযোগে সবজির আবাদও মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে চালের পাশাপাশি বাজারে সবজির দামও অনেক বেড়ে চলেছে। এমন এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেই গত আগস্টে শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে ঢুকে পড়া। সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আসতে দেয়া হলেও দিন দিন রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কেবল বাড়ছেই। এখনো প্রতিদিন আসছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। সর্বশেষ বেসরকারি পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয়প্রাপ্ত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নয় লাখ ছাড়িয়ে গেছে। জাতীয় অর্থনীতির ওপর বিপুল এই বাড়তি জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে নানাভাবে। কক্সবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ থেকে খাবার ও চিকিৎসা দেয়া পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে সরকারের খরচ বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। অন্যদিকে আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও খুব কম রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাই বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় পরিমাণে সহায়তা দিয়েছে। ফলে সব ব্যয়ভারই সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। 

অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতি এমনকি বিপর্যয়ের মুখেও পড়তে পারে। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বন্যা ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি তারা রফতানি ও রেমিট্যান্স আয় কমে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সব মিলিয়েই বাংলাদেশের অর্থনীতি অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছে। এদিকে মানুষের আয়-রোজগার বাড়ছে না, তাদের জন্য চাকরির সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে না। কিন্তু চাল থেকে সবজি পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের মূল্য শুধু বেড়েই চলছে না, এসবের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের অনেক বাইরে চলে গেছে। 

এমন অবস্থায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কিছুটা হলেও স্বস্তির কারণ হতে পারতো, সৃষ্টি করতে পারতো সম্ভাবনার। কিন্তু মিয়ানমারের দিক থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হচ্ছে না। মাঝখানে একজন মন্ত্রী একদিনের সফরে এলেও দেশটির সরকার এমন কোনো প্রস্তাব দেয়নি কিংবা এমন কোনো পরিকল্পনা হাজির করেনি, যার ভিত্তিতে আশা করা যাবে যে, মিয়ানমার তার রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেবে। ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনী প্রধানসহ মিয়ানমারের শাসকরা বরং বিপরীতধর্মী ও নৈরাশ্যজনক কথাই শুনিয়ে চলেছেন। বিভিন্ন উপলক্ষে তারা বলছেন, রোহিঙ্গারা নাকি মিয়ানমারের নয় বরং বাংলাদেশের নাগরিক এবং দেশটিতে তারা নাকি অবৈধভাবে বসবাস করে এসেছে। যেহেতু সেদেশের নাগরিক নয় সেহেতু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রশ্ন ওঠে না। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কখনো আবার একথাও বলা হয়েছে যে, সেই সব রোহিঙ্গাকেই কেবল ফিরিয়ে নেয়া হবে- যাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নাগরিকত্বের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে। অথচ হত্যা ধর্ষণ ও নিষ্ঠুর দমন-নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসার সময় রোহিঙ্গাদের কারো পক্ষেই তেমন কোনো প্রমাণপত্র নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। এটা আসলে সম্ভবই ছিল না। একই কারণে বলা হয়েছে, ফিরিয়ে নেয়ার যে আশ্বাস মিয়ানমারের শাসকরা দিয়েছেন সেটা প্রতারণার নামান্তর এবং বিশ্ববাসীকে ধাপ্পা দেয়ার একটি কৌশল মাত্র।  

এ পর্যন্ত এসে থেমে গেলেও হয়তো কথা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মিয়ানমার সরকার নাকি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে নতুন একটি প্রস্তাব ও শর্তের কথা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নাগরিকত্বের তথ্য-প্রমাণ যাচাই সাপেক্ষে প্রতিদিন একশ’জন করে রোহিঙ্গাকে ফেরৎ নেয়া হবে। আল জাজিরা জানিয়েছে, রোহিঙ্গা বিষয়ক মন্ত্রী উইন মিয়াত আইয়ি বলেছেন, ফিরিয়ে নিলেও সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজেদের ঘর-বাড়িতে উঠতে বা বসবাস করতে দেয়া হবে না। পরিবর্তে প্রথমে তাদের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত বিশেষ ক্যাম্পে নেয়া হবে। ্এরপর সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী অনুসন্ধান করা হবে। অনুসন্ধানে যাদের দাবি ও তথ্য সঠিক পাওয়া যাবে তারাই শুধু নিজেদের ঘর-বাড়িতে ওঠার এবং বসবাস করার সুযোগ পাবে। যাদের ঘর-বাড়ি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যাবে না, তাদের সকলকেও সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে থাকতে হবে। জানা গেছে, সাম্প্রতিক গণহত্যার মুখে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে পারেনি এরই মধ্যে তাদের স্থান হয়েছে ওইসব ক্যাম্প। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ক্যাম্পগুলোতে দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে জোর করে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, শান্তিকামী বিশ্ববাসীর সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণও যখন রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে তেমন এক কঠিন সময়ে মিয়ানমারের নতুন প্রস্তাব ও পরিকল্পনা কেবল নৈরাশ্যজনক নয়, সকল বিচারে অগ্রহণযোগ্যও। কারণ, রোহিঙ্গারা যে জন্মগতভাবেই মিয়ানমারের নাগরিক সে বিষয়ে বিশ্বের কোনো দেশ বা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাই এ পর্যন্ত সন্দেহ-সংশয় প্রকাশ করেনি। এটা একটি ঐতিহাসিক সত্যও বটে। সুতরাং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে নতুন করে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করার প্রয়োজন পড়তে পারে না। তাছাড়া গণহত্যার মুখে কোনোভাবে জীবন বাঁচিয়ে যারা বাংলাদেশে এসেছে তাদের পক্ষে জাতীয় পরিচয়পত্র ধরনের কোনো তথ্য-প্রমাণও সঙ্গে আনা সম্ভব হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। এটাও একটি স্বীকৃত সত্য। 

এমন অবস্থায় যাচাই সাপেক্ষে প্রতিদিন মাত্র একশ’জন করে রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়ার ইচ্ছা বা পরিকল্পনার মধ্যে প্রতারণার উদ্দেশ্যই বরং পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। কারণ, এভাবে একশ’জন করে নেয়া হলে প্রায় নয় লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে কম করে হলেও ২৫ বছর সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে তাদের জনসংখ্যাও অনেক বেড়ে যাবে। বিষয়টি মিয়ানমার সরকারের না বোঝার কোনো কারণ নেই। তা সত্ত্বেও যেহেতু একশ’ জনের পরিকল্পনা হাজির করা হয়েছে সেহেতু ধরে নেয়া যায়, তাদের উদ্দেশ্যের মধ্যে সামান্য সততাও নেই। আমরা তাই মিয়ানমারের এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করি। সরকারের উচিত বিষয়টি অবিলম্বে জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করে মিয়ানমারের ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করা, দেশটি যাতে কোনো রকম প্রতারণামূলক কৌশল অবলম্বন করতে না পারে এবং যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে তারা রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ