ঢাকা,বুধবার 18 October 2017, ৩ কার্তিক ১৪২8, ২৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাহত্যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মুসলিম নিধনের অংশমাত্র

[তিন]

জিবলু রহমান : মিয়ানমারে প্রধান প্রধান জাতিসত্তাগুলো মধ্যে পূর্বে দ্বন্দ্ব থাকলেও বৃটিশ সরকারের ‘বিভক্ত কর-শাসন কর’ নীতি এ দ্বন্দ্বে নতুন করে মাত্রা দিয়েছে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর আরাকানকে স্বাধীন রাজ্য করার জন্য রোহিঙ্গারা শুধু নয়, স্থানীয় বৌদ্ধ রাখাইনরাও সশস্ত্রভাবে চেষ্টা করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে অনেক রোহিঙ্গা পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। ১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাই মিয়ানমারে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অউং সানকে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রিত্ব পান উপপ্রধান উনু। নিহত হওয়ার পাঁচ মাস আগে অউং সান শান, চায়না ও ক্যাচিন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের জন্য ইতিহাসখ্যাত ‘পাংলং’ চুক্তিটি করেন। তবে কারেনরা এ চুক্তি থেকে বিরত ছিল। এরপর বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করেও উ নু মিয়ানমারের ১৯৫২, ১৯৫৬, ১৯৬০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন এবং ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হন।

দেশ বিভাগের পর ওমর মিয়ার নেতৃত্বে রোহিঙ্গা ধর্মীয় নেতারা জমিয়াতুল উলেমা-ই-ইসলাম নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে এবং মেও অঞ্চলকে নিয়ে পৃথক মুসলিম রাজ্য গঠনের দাবি জানান। মিয়ানমার সরকার এই দাবি অগ্রাহ্য করলে রোহিঙ্গারা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই শুরু করে। মিয়ানমার সরকার তাদের মোকাবিলায় ১৯৫০ ও ১৯৫৪ সালে সেনা অভিযান চালায়। ‘অপারেশন মনসুনের’ মাধ্যমে সেনাবাহিনী বেশির ভাগ মুজাহিদ ঘাঁটি দখল করে নেয়। কয়েকজন মুজাহিদ নেতা নিহত হন।

এরপর ১৯৬১ সালের ৪ জুলাই সরকারের শান্তি-প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে মুজাহিদীন নেতারা ব্রিগেডিয়ার অং গির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে মিয়ানমারে নে উইনের নেতৃত্বে সেনাশাসন জারি হলে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রেঙ্গুনে উ নু এক সম্মেলনে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন প্রদানের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নিয়ে কথা বলেন। ২৮ মার্চ সামরিক বাহিনী সমর্থিত বিরোধী দল উ নু’র সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। ২ মার্চ সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল নে উইন মধ্যরাতে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে উ নু’কে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে ক্ষমতা দখল করে নেয়। ৪ মার্চ তিনি ১৯৪৭ সালের সংবিধান বাতিল করে দেন এবং পার্লামেন্টে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। ৫ মার্চ জেনারেল নে উইন এক সংবাদ সম্মেলনে সগর্বে ঘোষণা দেন, ‘সামরিক বাহিনী গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও সুস্থ রাজনীতিতে বিশ্বাসী।’ এরই মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের ১৪ বছরের গণতন্ত্র ও ফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৃত্যু রচিত হয়। জেনারেল নে উইন শুরু থেকেই ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য প্রতিপক্ষ ও সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে হত্যার পথ বেছে নেন। ছাত্র ইউনিয়নের সদর দফতর ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়াসহ সব সম্ভাব্য নেতাকে গ্রেফতার করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রোহিঙ্গারা নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং সীমান্ত এলাকায় তৎপরতা চালায়। ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই রোহিঙ্গা লিবারেশন পার্টি (আরএলপি) গঠিত হয়, যার সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ জাফর হাবিব নামে ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতক। তাদের ঘাঁটি ছিল বুথি ডং জঙ্গলে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে তাদের তৎপরতা থেমে যায়। আরএলএফ আন্দোলনের ব্যর্থতার পর মোহাম্মদ জাফর হাবিব গঠন করেন রোহিঙ্গা প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট (আরপিএফ)। এর কমান্ডার ছিলেন মোহাম্মদ ইউনুস নামের এক চিকিৎসক। ১৯৮৬ সালে নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের আরেকটি জঙ্গি সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে।

প্রখ্যাত সুইডিশ সাংবাদিক ও ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর সাবেক সংবাদদাতা বার্টিল লিনটার ১৯৮১ সালে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘুরে দেখতে পান যে আরএসওর অনেক সামরিক ঘাঁটি আছে। এসব ঘাঁটিতে হালকা মেশিনগান একে-৪৭ রাইফেল, আরপিজি ২ রকেট লঞ্চার, ক্লেমো মাইন ও বিস্ফোরক মজুত রয়েছে। এসব ক্যাম্পে আফগানিস্তানের তালেবান প্রশিক্ষকদেরও দেখা গেছে। অন্যদিকে আরএসওর ১০০ জঙ্গি আফগানিস্তানের খোশত প্রদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। আল-কায়েদার ভিডিও টেপ থেকে আরও জানা যায় যে মিয়ানমারের মুসলমানরা আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে আরএসও বহু রোহিঙ্গা গেরিলাকে সংগ্রহ করে এবং এর বিনিময়ে তারা প্রত্যেককে ৩০ হাজার বাংলাদেশি টাকা দেয়। এ ছাড়া তারা ১০ হাজার টাকা করে মাসিক বেতন পেত। যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ মারা গেলে তার পরিবারকে দেওয়া হতো এক লাখ টাকা। অনেক রোহিঙ্গাকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগানিস্তানে পাঠানো হয়েছে।

এই জঙ্গিদের প্রতিহত করতে মিয়ানমার সরকার সীমান্তে ব্যাপক অভিযান চালায় এবং ১৯৯২ সালের এপ্রিলে আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ত্যাগে বাধ্য করে। যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ১৯৯৪ সালের ২৮ এপ্রিল আরএসও জঙ্গিরা মংডুর বিভিন্ন স্থানে ১২টি টাইমবোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। ১৯৯৮ সালে আরএসও, এআইএফ যুক্ত হয়ে গঠন করে রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিল, যাদের সামরিক শাখার নাম রোহিঙ্গা ন্যাশনাল আর্মি। মিয়ানমার সরকারের দমন-পীড়ন এবং মৌলবাদী জঙ্গিদের সশস্ত্র তৎপরতাই সাধারণ রোহিঙ্গাদের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা নিজ দেশে হয়েছে পরবাসী। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ২১ মার্চ ২০১৪)

মিয়ানমারের নাগরিক জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট ১৯৭৪ সালের ২৫ নভেম্বর নিউ ইয়র্কে মৃত্যুবরণ করেন। ৬ ডিসেম্বর উ থান্টের সমাধস্থলে জেনারেল নে উইনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। ১১ ডিসেম্বর সরকার সামরিক আইন জারি করে, ১২ ডিসেম্বর প্রতিবাদী ছাত্র-জনতার সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। বার্মায় সামরিক শাসন জারির পর আরাকানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বেড়ে যায়। ১৯৭৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আরাকানের মুসলমান বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য সরকার “Operation Dragon King” পরিচালনা করে। বিদ্রোহ দমনের নামে এ অভিযানে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ সব রকম ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।

জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রায় দুই লাখ আরাকান মুসলিম যারা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই শরণার্থীদের অভিযোগ ছিল, মিয়ানমার সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণে একান্ত বাধ্য হয়ে তারা বাংলাদেশে এসেছে। তখন কূটনৈতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনাক্রমে বিষয়টির সুরাহা হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা দেশে ফিরে যায়। অনেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক অ উং সান কন্যা অং সান সু চি দেশে তার অসুস্থ মাকে দেখার জন্য ফিরে আসেন। দেশে ফিরে সামরিক জান্তাদের দমন ও পীড়ন নীতি দেখে তিনি ব্যথিত হন এবং সামরিক সরকার বিরোধী আন্দোলনে সরাসরি যোগ দেন। স্বৈরশাসনে নির্যাতিত মিয়ানমারের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অংশ নিতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গঠিত হয় National League for Democracy যার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে অউং সি ও অং সান সু চি। 

আশির দশকের শেষদিকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে, রেঙ্গুনের রাজপথ প্রকম্পিত হয় হাজার হাজার তরুণের দৃপ্ত পদভারে, শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত চারদিক। অং সান সু চি সারাদেশে সমাবেশে করে জনগণকে উজ্জীবিত করেন। তার প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও উচ্চারণ জনমনে বিদ্রোহের আগুন ধরিয়ে দেয়। ১৯৮৮ সালে ২৬ আগস্ট রেঙ্গুনের গ্রেট শোয়েডাগন বৌদ্ধ মন্দিরের পশ্চিম পাশের ময়দানে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে অং সান সু চি যে ভাষণ দেন তা এখনও স্মরণীয় আছে।

সূচী বলেছিলেন-আমি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে নিজেকে শামিল করেছি বাবার ঐতিহ্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনগণকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এটি অত্যন্ত পরিস্কার এবং খোলাখুলি ব্যাপার। আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হলে কিছুই অর্জন করতে পারব না। যদি দেশব্যাপী ঐক্যবদ্ধ হতেই না পারে তাহলে কোন আদর্শ বা পদ্ধতির সরকারই দেশের জন্য বড় কোন ব্যবস্থাই স্মরণ রাখতে হবে। শৃঙ্খলা না থাকলে কোন ব্যবস্থাই সফল হবে না। অতএব আমাদের জনগণকে সর্বদা ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল থাকতে হবে। যখন আমি ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কথা বলছি তখন আরও একটি বিষয়ে উল্লেখ করতে চাই। আমি যা বলব কারও কারও তা পছন্দ নাও হতে পারে কিন্তু আমি মনে করি, যা সত্য বলে জেনেছি, জনগণকে তা বলা উচিত। এ কারণেই আমার মনের কথা আপনাদের জানাতে চাই। যদি আমার বক্তব্য আপনাদের ভাল লাগে, আমার প্রতি সমর্থন জানাবেন। যদি তা আপনাদের অনুমোদন না পায় তাহলে তা কোন কাজেই আসবে না। আমি যা সত্য জেনেছি তা-ই করছি।

মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর কথা উল্লেখ করে সুচি  বলেন, এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা আমার বাবা। একে লালনও করেছেন তিনি। এ যে শুধু কথার কথা, তা নয়। আমার বাবা এই সশস্ত্র বাহিনীকে গড়ে তুলেছেন-এ ছিল বাস্তব ঘটনা। বাবার স্বহস্তে লেখা কাগজপত্রে সশস্ত্র বাহিনীকে সংগঠিত এবং তাকে সমৃদ্ধ করার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী প্রতিষ্ঠায় বাবার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এ রকম: 

‘সশস্ত্র বাহিনী এই দেশ ও দেশের জনগণের জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং একে জনগণের সম্মান ও শ্রদ্ধাও অর্জন করতে হবে। এর বদলে যদি সশস্ত্র বাহিনী জনগণের ঘৃণা কুড়োতে থাকে তাহলে যে উদ্দেশ্যে বর্মী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে সেই উদ্দেশ্যই ধবংস হয়ে যাবে।’

 

সেই সমাবেশে সু চি আরও বলেছিলেন-এবার আমি খোলাখুলি বলতে চাই, আমি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে দৃঢ় সম্পৃক্ততা অনুভব করি। আমার বাবা শুধু সশস্ত্র বাহিনীকে গড়েই তোলেননি-এর জওয়ানরাও শৈশবে আমাকে আদর-যতœ করেছে। একই সঙ্গে আমার বাবার প্রতি জনগণের যে অপরিসীম ভালবাসা ও স্নেহ ছিল সে সম্পর্কেও আমি সজাগ। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এ কারণে আমি চাই না আমার পিতার হাতে গড়া সশস্ত্র বাহিনী এবং তার প্রতি ভালবাসায় অকুণ্ঠ জনগণের মধ্যে কোন বিভেদ বা সংঘাত ঘটুক। এই সভামঞ্চ থেকে কি আমি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতিও অনুরূপ সমঝোতা ও সমবেদনার আহবান জানাতে পারি না? আমি তাদের কাছে এমন একটি বাহিনী গড়ে তোলার আবেদন জানাই। যে বাহিনী জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম। এই সশস্ত্র বাহিনী পরিণত হতে পারে আমাদের দেশের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ