ঢাকা,বৃহস্পতিবার 19 October 2017, ৪ কার্তিক ১৪২8, ২৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ইইউ’র বার্ষিক রিপোর্টে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কিত বার্ষিক রিপোর্টে বলেছে, দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটাই এখনো বাংলাদেশের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। দেশটিতে বিরোধী দল শুধু সংসদের বাইরেই নেই, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়ও তাদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। গত সোমবার প্রকাশিত ইইউ’র রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে বলা হয়েছে, দারিদ্র্যবিমোচন ও আর্থ-সমাজিক ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হলেও মানবাধিকার সুরক্ষা ও সংরক্ষণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র দুটিতে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারেনি। ইইউ বলেছে, নাজুক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক পরিবেশের সংকোচন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, গুম এবং বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ডসহ সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের অব্যাহত অবনতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এখনো গভীর উদ্বেগ রয়েছে। 

রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক সংলাপ, জনকূটনীতি ও উন্নয়ন সংস্থাসমূহের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ইইউ নিবিড়ভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। এই পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিরোধী দল সংসদের বাইরে রয়েছে এবং দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো প্রভাব ও অংশগ্রহণ নেই। থাকলেও তা খুবই সামান্য। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংঘাতময় এবং প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলে উল্লেখ করে  ইইউ’র রিপোর্টে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অপরাধের অভিযোগে নেতাদের মৃত্যুদন্ড দিয়ে এবং নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর সার্বক্ষণিক চাপ অব্যাহত রেখে জামায়াতকে কার্যত ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। 

গুম, খুন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে বলে মতপ্রকাশ করে ইইউ’র রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ব্লগার ও ধর্মনিরপেক্ষ লোকজনসহ অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। সরকার অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হওয়ায় আইনের শাসন ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এই অবস্থা বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে নেতিবাচক অবদান রাখছে। ওদিকে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়েছে সত্য কিন্তু বিচার বিভাগ সত্যিকারের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেনি। এসবের বাইরে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার ক্রাইমস ডিনায়াল অ্যাক্ট এবং সিটিজেনশিপ অ্যাক্টের মতো আইন ও সেগুলোর বাস্তবায়ন জনগণের বাকস্বাধীনতার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলেও ইইউ’র রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট আরো কিছু বিষয়েও ইইউ’র বার্ষিক এ রিপোর্টে বক্তব্য রাখা হয়েছে, যেগুলোর কোনো একটিও সরকারের পক্ষে যায় না। বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে ইইউ যা বলেছে, তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার তো কোনো সুযোগই নেই। ক্ষমতাসীনরা নিজেরাই এ সুযোগ নষ্ট করেছেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আয়োজিত ডিজিটাল নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধংদেহী অভিযান চালিয়ে এসেছেন। এখনো সে অভিযান বন্ধ হওয়ার লক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন ও একতরফা নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনদের দমন-নির্যাতন বরং কল্পনার সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে। উল্লেখ করা দরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। শুধু তাই নয়, গণতন্ত্রের স্বার্থে সংস্থাটি এমনকি কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি জোট বলেই সচেতন ও বেশি আশাবাদী অনেকে মনে করেছিলেন, ক্ষমতাসীনরা সংস্থাটির ওই প্রতিক্রিয়া ও কার্যক্রম থেকে শিক্ষা নেবেন এবং দেশের ভেতরে গণতন্ত্রের জন্য সুযোগ তৈরি করবেন। অন্যদিকে পরিস্থিতির বরং আরো অবনতি ঘটেছে। অবনতি ঘটছে এখনো। আর সেজন্যই ইইউকে তার বার্ষিক রিপোর্টে সরকারের উদ্দেশে কঠোর বক্তব্য রাখতে হয়েছে। 

গুম ও গুপ্তহত্যার মতো বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ড সম্পর্কে ইইউ’র রিপোর্টে যা বলা হয়েছে সেসবের সঙ্গেও ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কোনো বিষয়েই ইইউ আসলে নতুন কিছু বলেনি। বস্তুত সরকার স্বেচ্ছাচারী ও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার কারণে বাংলাদেশে একদিকে বিরোধী গণতান্ত্রিক দলগুলো আন্দোলন দূরে থাকুক এমনকি সাধারণ কোনো কর্মসূচিও পালন করতে পারছে না, অন্যদিকে এসব দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি আক্রান্ত অন্য সকলের জন্যও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গুম ও গুপ্তহত্যার মতো অপরাধ তো বেড়ে চলেছেই। 

আমরা মনে করি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা অন্য কারো মাধ্যমে উপহাস ও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পরিবর্তে সরকারের উচিত ইইউ’র বার্ষিক রিপোর্টটিকে যথোচিত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া ও মূল্যায়ন করা এবং দেশকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে উদ্যোগী হয়ে ওঠা। বলা দরকার, সরকার সম্প্রতি নতুন পর্যায়ে দমন-নির্যাতন এবং গ্রেফতার ও মামলায় জড়ানোর যে অভিযান শুরু করেছে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত অশুভ গণতন্ত্রের জন্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ