ঢাকা,বৃহস্পতিবার 19 October 2017, ৪ কার্তিক ১৪২8, ২৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাহত্যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মুসলিম নিধনের অংশমাত্র

[চার]

জিবলু রহমান : এখন আমি দেশব্যাপী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাই। ছাত্ররা হচ্ছেন দেশের সুযোগ্য সন্তান। এরই মধ্যে আন্দোলনে তারা বাস্তব সাহস দেখিয়েছেন। আমার বিশ্বাস, এখন থেকে তাদের নৈতিক ও মানসিক প্রজ্ঞা দেখাতে সক্ষম হবেন। একইভাবে আমি এই তরুণ ছাত্রদের প্রতি ঐক্য ও সমঝোতার পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানাতে পারি না? এই সময়ে ছাত্র সমাজ কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত। আমি আশা করব, এই গ্রুপগুলো একটি অভিন্ন সংগঠনে নিজেদের শামিল করবে। আমি চাই, এ ব্যাপারে তারা খুব শিগগিরই একটি সম্মেলনের আয়োজন করুক। সত্যি সত্যি যদি সে ধরনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তবে তা হবে ছাত্রদের সম্মিলিত প্রয়াস ও ঐক্যের বাস্তব রূপায়ন। ছাত্রদের প্রতি সু চি যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, তারা তা পূরণ করেছিল। মূলত ছাত্রদের দৃঢ় ঐক্যের কারণেই গণআন্দোলন সফল হয়েছিল। কিন্তুু তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি যে সমঝোতার আহবান জানিয়েছিলেন তাতে তারা সাড়া দেয়নি, বরং জনরায়কে বানচাল করতে দমন-পীড়ন চালায়। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে জেলে পাঠায়...।’

সু চির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভীত হয়ে সামরিক জান্তা ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার করে তাকে। সামরিক জান্তার ভাষায় এটা ছিল সু চির জন্য ‘নিরাপত্তা হেফাজত’। অন্যদিকে স্বৈরশাসকদের নির্যাতন উপেক্ষা করে গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তুলেন সু চি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দিশেহারা হয়ে এবং গণঅসন্তেুাষের মুখে ১৯৯০ সালে সরকার বাধ্য হয়ে সাধারণ নির্বাচন দেয়। নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। শতকরা ৬০ ভাগ ভোট পেয়ে ৪৮৫টি আনের মধ্যে ৩৯৩ আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছিল সু চির দল। কিন্তু সামরিক শাসক জনমত উপেক্ষা করে নির্বাচনের ফল বাতিল করে দেয়। এ ঘটনাকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের আচরণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। ইয়াহিয়া-ভুট্টোচক্র ক্ষমতা হস্তান্তরে গরিমসি করে। যার পরিণতিতে একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। সেই মুক্তিযুদ্ধকেও মিয়ানমারের শাসকরা সমর্থন করেনি, পাশে দাঁড়ায়নি নেপাল, শ্রীলংকাও। এসব দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের দখলদারিত্বেকে সমর্থন করেছিল। পাকিস্তানিদের খপ্পরে থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এলেও মিয়ানমারের জনগণ আজও অধিকারহারা। 

এদিকে সু চি আরো দৃঢ় মনোবল নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে সামনের দিকে এগিয়ে নেন। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আপোষহীন নেত্রী হিসেবে। ১৯৯১ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। একই বছর আমেরিকা, বৃটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ অবরোধ চাপানো হয় দেশটির ওপর। বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয় মিয়ানমার।

১৯৮৮ সালে মিয়ানমারে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ছিল ৮ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার এখন প্রায় ১৫০ কোটি ডলার। এসব বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সামরিক সরকারের হাতকে শক্তিশালী করছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশীয় প্রোগ্রামের পরিচালক রবার্ট টেম্পলের কয়েক বছর আগে মতামত দিয়েছিলেন, জেনারেলদের প্রধান উদ্দেশ্যই হল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং তা করার জন্য অর্থও তাদের আছে।

এই যে, বিপুল বিদেশী বিনিয়োগ ও বাণিজ্য-এর সুফল কি মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ পাচ্ছে? অবশ্যই না। ২০০৪ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের রিপোর্টে বলা হয়, সেখানে মানুষ সে শুধু অভাবে আছে তাই নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। বাধ্যতামূলক শ্রমদান, কারাবন্দিদের ওপর নির্যাতন ও মহিলা বন্দিদের ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর বিনিয়োগ সামরিক বাহিনীর বিলাস-বৈভব বাড়িয়ে তুললেও সাধারণ মানুষ কিছুই পাচ্ছে না।

জনগণের দুর্দশার জন্য সামরিক শাসক মার্কিন অবরোধকে দায়ী করেছিল। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে সব পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিলে ৩৫ কোটি ডলারের রফতানি হ্রাস পায়, ৪০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারায়। ২০০৫ সালের আগস্টে পানির দাম বাড়ানো হয়েছে ৮ গুণ। ইয়াঙ্গুনের নগর বাস সার্ভিসের ভাড়া ২০ কিয়াত থেকে ৫০ কিয়াত করা হয়।

মিয়ানমারের মুসলমানরাই কেবল  হতদরিদ্র। অন্যধর্মের অনুসারীদের পোশাক-চেহারা দেখে মনে হয় না তারা খারাপ অবস্থায় আছে। যেকোনো দেশের উন্নতির অন্যতম প্রধান শর্ত শিক্ষা। মিয়ানমারের বয়স্ক শিক্ষার হার ৯২.৬৮%, যুব শিক্ষার হার ৯৬.১০%। প্রতিটি শিশুই বিদ্যালয়ে যায়। ২০১৪ সালের হিসাবে জনসংখ্যা ছয় কোটি। মানসম্মত পানীয় জল ও পয়োনিষ্কাশন-সুবিধা পায় যথাক্রমে ৮৪.১০ ও ৭৭. ৩০% মানুষ। দুটিই বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার .৮৫%, বাংলাদেশে ১.৮%। মিয়ানমারে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ৮০.১৩ জন। বাংলাদেশে এক হাজারের বেশি। জনপ্রতি বার্ষিক আয়ও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১১.৪৪ ডলারে। তবে এ আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যও বেড়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো নারী ও পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যার অনুপাত প্রায় সমান সমান। ছেলেমেয়ের গড় বিয়ের বয়স যথাক্রমে ২৭.৬০ বছর ও ২৬.১০ বছর বয়স। ৬৭% মা-ই মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেন। বাংলাদেশে ৬৫% মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায় ২০ বছরের আগে।

দেশটির দারিদ্র্য অবস্থার কারণ পাঁচ লাখ ১৩ হাজার ২৫০ সদস্যের বিশাল সেনাবাহিনী। তাদের পেছনে রাষ্ট্রকে গুনতে হয় প্রচুর অর্থ। ২০১১ সালে মিয়ানমার আমদানি করে ৩০ হাজার ১০৩ কোটি ডলারের অস্ত্র। মিয়ানমার কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না। তাহলে এ অস্ত্র তারা কার বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে? সব উন্নয়নশীল দেশের শাসকেরাই অস্ত্র কেনার প্রতিযোগিতায় নামেন। আর তার জন্য খেসারত দিতে হয় নিরীহ জনগণকে। তাদের কষ্ট ও শ্রমের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় অপ্রয়োজনীয় সামরিক খাতে।

১ মার্চ ২০১৪ সিনহুয়া জানায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথম ১১ মাসে মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬০ কোটি ডলার (মার্চেই ওদের অর্থবছর শেষ হয়)। এ বিনিয়োগের মধ্যে ৫০% নির্মাণ খাতে, ২০% টেলিযোগাযোগ খাতে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৪০ কোটি ডলার। মিয়ানমার বিনিয়োগ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ১৯৮৮ সাল থেকে মিয়ানমারে যে বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশই করেছে চীন; চার হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মধ্যে এক হাজার ৪১৯ কোটি ডলার। বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে এক হাজার ৯০০ কোটি করা হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে, তেল ও গ্যাস খাতে বিনিয়োগ হয়েছে এক হাজার ৩৬৩ কোটি ডলার।

দেশটিতে বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে, মাত্র ৪৭% মানুষ বিদ্যুৎ-সুবিধা পায়। টেলিযোগাযোগ সুবিধাও অপ্রতুল। ইয়াঙ্গুন থেকে ঢাকায় টেলিফোন কলের জন্য খরচ প্রতি মিনিটে চার ডলার, বাংলাদেশি টাকায় ৩২০ টাকা। লোকাল কলও মিনিটপ্রতি ১০০ কিয়েত, বাংলাদেশি ১২-১৩ টাকা। অবশ্য এটি মাঝামাঝি মানের একটি হোটেলের হিসাব। একটি সিম কার্ডের দাম ১০০ ডলার। 

মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগের কারণ বিদেশিদের আকৃষ্ট করেছে দেশটির অফুরান প্রাকৃতিক সম্পদ, স্বল্প মজুরি, বৃহৎ কৃষি খামার এবং পর্যটনকেন্দ্র। মিয়ানমারের রপ্তানিপণ্যের তালিকার শীর্ষে আছে গ্যাস, মোট রপ্তানির ৩৭%। এরপর আছে পাথর, কাঠ, রাবার, চাল ইত্যাদি। সর্বোচ্চ আমদানিকারক দেশ থাইল্যান্ড, এরপর চীন, ভারত ও জাপান। মিয়ানমারের ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬.৫%, পরের বছর ৭% কাছাকাছি। মূল্যস্ফীতির হারও ৫.৮%। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ২০ মার্চ ২০১৪)

সু চি খুব বেশী মার্কিন ও বৃটেন ঘেঁষা। তিনি লেখাপড়া করেছেন বৃটেনে। বিয়েও করেছেন সেখানে। বার্মার সঙ্গে আছে চীনের দীর্ঘ সীমানা। চীনও চাচ্ছে না বার্মা যাক মার্কিন প্রভাব বলয়ে। চীন পরোক্ষভাবে শক্তি যোগাচ্ছে বার্মার সামরিক বাহিনীকে। চীন-মার্কিন প্রভাব বলয়ে স্থাপনের সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে বার্মায়।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নিপীড়ন সত্ত্বেও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের অবস্থানও মিয়ানমারের পক্ষে। কেননা, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে নৃশংসতা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে উপস্থিত হয়ে সুচি সরকারকে সমর্থন দেন। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সেখানে তিনি দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সুচির উদ্দেশে প্রকাশ্যে বক্তৃতায় বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে উগ্রপন্থী সহিংসতা নিয়ে আমরা আপনার উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করি, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিরপরাধ জীবন যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে।’

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ভারত সরকার ত্রাণ পাঠিয়েছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকবেন বলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে ভারত এখন কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল : ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে চীন ও রাশিয়ার মতো ভারতও মিয়ানমারের সঙ্গে আছে। (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭)

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বর্বরতার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক বসে এবং রাখাইনে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেয়। তবে নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো কড়া পদক্ষেপে যায়নি। কারণ স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়ার ভেটো দেয়ার আশঙ্কা ছিল। 

৫০ বছরের সেনা শাসনকালে মিয়ানমারে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। আবার চীনে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে। রাশিয়ার আছে চেচেন বিদ্রোহী। তাছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বিপরীত অবস্থানের মতো কৌশলগত স্বার্থও চীন ও রাশিয়ার রয়েছে। মিয়ানমারের উদ্দেশ্য হল- রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে একেবারে বের করে দেয়া। কার্যত সেটিই করা হচ্ছে। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মিয়ানমারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন চায় চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেন, মিয়ানমার সরকার তাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যে চেষ্টা করছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তার পাশে থাকা।

১৫ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে।’ এতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়, ‘আমরা মিয়ানমার সরকারের পক্ষে আমাদের সমর্থন প্রকাশ করছি এবং সন্ত্রাসীদের প্ররোচনা এড়িয়ে চলতে সব ধর্মের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

রাশিয়া বা চীন মিয়ানমারের পক্ষে যে ভূমিকা রেখেছে তার একমাত্র কারণ ব্যবসা। ভারতও তাদের সাথে আছে যেমন আছে ইসরাইলের সাথে। ইসরাইলও মুসলমানদের মারছে। একটু ইতিহাস থেকে ব্যাখা করি। ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে প্যালেস্টাইনের একটি ছোট গ্রাম ‘দির ইয়াসিন’ আনন্দ উৎসবের মাঝেই ভোজ অনুষ্ঠান চলছিল। কিন্তু দূর আকাশে যে কারো মেঘ জমেছিল তা হতো তারা দেখতে পায়নি। ইহুদি সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ার আর তান্ডবলীলায় মুহূর্তেই ভোজসভা পরিণত হলো মৃত্যুসভায়। নতুন বর-কনেসহ ৩৩ জনকে এক সঙ্গে হত্যা করা হলো। মাত্র কিছুদিন পরই একটি প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ হবে জাতিসংঘের অধীনে। সে কারণেই দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে যে কোনো উপায়ে। সেই দায়িত্ব বর্তেছে তিনটি ইহুদিবাদী সংগঠন ‘হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং-এর ওপর। তাই তারা মেতে উঠলো গণহত্যায়।

প্রতিদিনই প্যালেস্টাইনের আকাশে বারুদের ধোয়া উঠছে, বোমা হামলায় ধ্বংসস্তুুপে পরিণত হচ্ছে সাজানো বাড়ি। ইহুদিদের হত্যা, সন্ত্রাস আর নৈরাজ্যের শিকার লাখ লাখ আরব ছাড়তে লাগলো প্রিয় স্বদেশ। অবশ্য ঘটনার শুরু এখানে নয়, প্যালেস্টানিয়ানদের নিজ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করার অভিযান শুরু হয় বৃটিশ শাসনের শুরু থেকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির উপকরণ কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান। ফলে আনন্দিত বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন কি ধরনের পুরস্কার তিনি চান। উত্তর ছিল অর্থ নয় আমার স্বজাতির জন্য এক টুকরো ভূমি আর তা হবে প্যালেস্টাইন। ফলে প্যালেস্টাইন ভূখন্ডটি ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুুতি নেয় বৃটেন।

১৯৯৩ সালে প্যালেস্টিনিয়ানদের এক স্বাধীন ভূমির স্বপ্ন দেখিয়ে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে পিএলও ইসরাইল শান্তি চুক্তি হলো যা ‘অসলো চুক্তি’ হিসেবে পরিচিতি। পিএলও চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাত ইরাইলকে স্বীকৃতি দিলেন কিন্তু বিনিময়ে পেলেন না কিছুই। পুরো ঘটনাটি যে একটি প্রহসন ছিল ইসরাইলের ক্রম আক্রমণ এবং প্রতিশোধ স্পৃহা তা প্রমাণ করলো। তার অনুসরণেই প্যালেস্টিনিয়ানদের সামনে মুলো ঝুলিয়ে রেখে।

পরবর্তীতে ইরাইল ২০০টি পরমাণু বোমা তৈরি করলেও এতে আমেরিকাসহ পশ্চিমিরা একেবারেই নীরব। অধিকন্তু ইসরাইলকে এরা অব্যাহতভাবে সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট ১২ ডিসেম্বর ২০০৬ সালে তার দেশের পরমাণু অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

 ১৯৪৮ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পাবার পর থেকেই অস্ত্র ব্যবসা ও উৎপাদন ইসরাইলি অর্থনীতির প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। যদিও ১৯৬০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত ইসরাইল তার অস্ত্রের কারখানা উন্নয়নের ব্যাপারে খুব বেশি একটা মনোযুগী ছিল না তবুও তার অস্ত্রের কারখানা এই দেশটির থেকেও পুরনো। আর এই ধারাটি চলমান যখন থেকে ইহুদিরা তাদের ক্ষমতাহীনতার ব্যাপারে সচেতন হন, এটাই তাদের ইহুদি জাতীয়তা এবং স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। ইহুদিবাদী অগ্রগামী উদ্যোক্তারা অনেক ছোট ছোট গোপন কারখানা গড়ে তোলেন যেখানে বিভিন্ন ধরনের ছোট অস্ত্র তৈরি ও মেরামত, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, সামরিক গাড়ি এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক যন্ত্রাংশ তৈরি করা হতো। এসব সামরিক কারখানাগুলো ১৯৩৩ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেগুলোকে একত্রে ইসরাইলি সামরিক কারখানা বলা হয়। এগুলোর মধ্যে ওগও বা ঞঅ'অঝ ইত্যাদি ফার্ম অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে এবং এগুলোই পরে বৃহৎ সামরিক শিল্পের ভ্রুণ বা নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। ১৯৪৬-৪৮ সালে ইসরাইলী স্বাধীনতার সময়, তাদের সামরিক রফতানিতে আত্মনির্ভরশীলতা এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অনুভূত হয় এবং ১৯৪৮ সালে যখন বৃটিশরা প্যালেস্টাইন ত্যাগ করে, তখন এসব ইসরাইলী ফার্ম প্রকাশ্যেই তাদের কারখানা স্থাপন করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ