ঢাকা, শুক্রবার 20 October 2017, ৫ কার্তিক ১৪২8, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ফররুখ আহমদের ‘বন্দরে সন্ধ্যা’

খুরশীদ আলম বাবু

 

 বন্দরে সন্ধ্যা

গোধূলি-তরল সেই হরিণের তণিমা পাটল

অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা শিঙে ভেসে এল চাঁদ

সাত সাগরের বুকে সেই শুধু আলোক-চঞ্চল;

অন্ধকার ধনু হাতে তীর ছোঁড়ে রাত্রির নিষাদ।

আরব সমুদ্র স্রোতে ক্রমাগত দূরের আহ্বান,

তরুণীর মুখ থেকে মুছে গেছে দিনের রক্তিমা,

এদিকে হরিণ আনে বাঁকা শিঙে চাঁদ: রমজান;

ক্ষীণাঙ্গীর প্রতীক্ষায় যৌবনের প্রাচুর্য: পূর্ণিমা।

 

ষোল পাপড়িতে ঘেরা ষোড়শীর সে পূর্ণ যৌবনে

আসিল অতিথি এক বন্দরের শ্রান্ত মুসাফির।

সূর্যাস্তের অগ্নিবর্ণ সেহেলির বিমুগ্ধ স্বপনে,

নিভৃত ইঙ্গিত তার ডেকে নেয় পুষ্পিত গহনে;

অনেক সমুদ্র তীরে স্বপ্নময় হ’ল এ শিশির

তারার সোনালি ফুল ছিটে পড়ে রাত্রির অঙ্গনে। 

                                   (সাত সাগরের মাঝি)

চল্লিশ দশকের শ্রেষ্ঠ কবি ফররুখ আহমদের প্রিয় অভ্যাস ছিলো, তাঁর অন্যতম প্রিয় কবি টি এস এলিয়ট-এর মত একটি কবিতার উপর অবিরাম পরিমার্জনা করা। এমনকি গ্রন্থাকারে প্রকাশের পরও। আমাদরে আলোচ্য কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় “আরেক সন্ধ্যা” শিরোনামে। পরে “বন্দরে সন্ধ্যা” নামে রূপান্তরিত হয়ে সেই সঙ্গে খানিকটা পরিমার্জিত রূপে স্থায়ীভাবে গ্রন্থিত হলো তাঁর প্রথম বহুল আলোচিত “সাত সাগরের মাঝি” কাব্যগ্রন্থে।

 

  ফররুখ আহমদ এখন আর ইহজগতে নেই, তাই ধরে নিতে হবে এটিই এই কবিতার শেষ রূপান্তর। “বন্দরে সন্ধ্যা” কবিতাটি পড়তে পড়তে এক সময় আমার একগুচ্ছ ইংরেজ ইমেজিস্ট কবিদের কথা মনে পড়ছিল। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো এই যে, কবিতাটির পাঠ শেষে সেই মনোভাবও পাল্টাতে দেরী হলো না। কারণ এই কবিতার ভেতরদেশে কেবলমাত্র চরম রোমান্টিকতার শুধু আবরণই নেই, একটু মনোযোগ দিলেই বোঝা যাবে এক ধরনের উদ্দেশ্যবাদী প্রচ্ছন্ন মনোভাব জড়িয়ে আছে। “বন্দরে সন্ধ্যা” সনেটটি অবশ্যই মোহময় স্মরণযোগ্য কবিতার উজ্জ্বল উদ্ধার সন্দেহ নেই। ফররুখ আহমদও একার্থে জীবনানন্দ দাশ ও বিষ্ণু দে’র মত সুন্দর পঙ্তিমালার কবিও বটে, কবিতার সুন্দরতম পঙ্তিমালা তাদের মতন ফররুখ আহমদকে টিকিয়ে রেখেছে।

 ফররুখ আহমদকে কেবলই রোমান্টিক কবি  বললে তাঁর কবিতার অধেয় ও আঁধার চরিত্র বিশ্লেষণ করা সমালোচকদের পক্ষে খানিকটা কঠিন হয়ে পড়ে। 

 সাম্প্রতিক কালের একজন তরুণ সমালোচক সালাউদ্দিন আইউবী (প্রবন্ধটি যখন লিখছিলেন তখন নাম ছিলো সালাউদ্দিন নিযামী) তাঁর একটি ফররুখ কেন্দ্রীক লেখায় ফররুখ  আহমদকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কবিদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। সালাউদ্দিন আইউবীর এই মন্তব্যে আমরা খুব একটা অবাক হই না। কারণটা স্বাভাবিক। রোমান্টিক মানেই কিছুটা হলেও প্রচ্ছন্ন স্বপ্নবাদী তবে আমাদের মানতেই হবে যে, ফররুখ আহমদ তাঁর সমকালীন অন্যান্য ব্যক্তিবাদী কবিদের মতন কেবলমাত্র প্রেমকেন্দ্রিক উন্মাদনায় কবিতা সৃজনে উন্মাতাল হননি। যেমন হয়েছিলেন অরুণ কুমার সরকার, নরেশ গুহ ও ভিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায়, যারা প্রেমের কবিতা ছাড়া অন্যান্য ধারার কবিতা লিখতে গররাজি ছিলেন।

  এই শ্রেণির কবিদের পাশাপাশি আরেকটি ধারা ছিলো যে ধারায় সদা সর্বদা লালিত হচ্ছিল সমাজ সচেতনার চেতনা, নেতৃত্বে ছিলেন দারুল মাস্তুলের কর্মধারের তিরিশের শ্রেষ্ঠ একজন কবি বিষ্ণু দে। ফররুখ আহমদই প্রথম মুসলমান কবি এই প্রবাহমান দুই ধারার সাথে যুক্ত হয়েছিলেন তাঁর আপন কবি প্রতিভাবলে। দুই গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত পত্র-পত্রিকায় (এগুলো হলো যথাক্রমে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘পরিচয়’) তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। ফররুখ আহমদের এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। তবে লক্ষণীয় যে, তাঁর সমকালীন অনেক সমাজবাদী কবিতা থেকে অশিল্প ফররুখ আহমদ আজীবন প্রতীক উপমা ও রূপকের আশ্রয় নিয়ে কবিতা সৃজন করে গেলেন। আর এইভাবে উপার্জিত হলো একজন সফলতম কবির শিরোপা।

 আমাদের আলোচ্য কবিতার পরিবেশ সমুদ্র। সমুদ্রকেন্দ্রিক নামহীন গোত্রহীন একটি বন্দর। বাংলা কবিতার মাহফিলে প্রেমেন্দ মিত্রই সর্বপ্রথম সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কিত কবিতার ¯্রষ্টা। তাঁর দেখানো পথেই এগিয়ে গেলেন কবি ফররুখ আহমদ। আরব্য রজনীর অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র “সিন্দাবাদ” প্রতীকের ভেতর দিয়েই একটি হতাশাগ্রস্থ জাতির আশা আকাক্সক্ষার তালিকা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। আসলে এটিই হলো প্রকৃত কবির কাজ। এই যে আমি জাতির আশা আকাক্সক্ষার কথা বললাম এই কারণে যে ফরররূখ আহমদ বাঙালি মুসলমানদের ক্রান্তিকালের একজন প্রতিভাবান কবি।

চল্লিশ দশকের অন্যতম সিদ্ধি বলে যদি কিছু থাকে তা হলো গীতি কবিতার পূর্ণজীবন। কবি অরুণ কুমার সরকার যখন এই মন্তব্য করেন সেখানেও ফররুখ আহমদের অবদান কিছুটা নির্ধারিত হয়ে যায়। কারণ কবি ফররুখের অনেক কবিতাও গীতি কবিতার মত একটি নির্ধারিত পঙ্তিমালা বারবার ফিরে আসে। বলা বহুল্য এই রীতিগুলো পেয়েছিলেন কীটস্ ও এলিয়টের কবিতা পড়ে। আর ক্লাসিক রীতি নীতির প্রভাব ফেলেছিলেন মাইকেল মধুসুদন দত্তের কবিতা।  

আমাদরে ভুলে গেলে চলবে না ফররুখ আহমদ ছিলেন একজন স্বতন্ত্র জাতির প্রতিভাবান কবি। চল্লিশের অন্যান্য সমাজবাদী কবিদের মতন তাদের সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমত চিন্তিত ছিলেন। আর তিনি নতুন পৃথিবীর একজন ভ্রমণশীল কবি হিসেবে সেটাই আমাদের কাছে কল্পনাতীত মনে হয়। 

 “বন্দরে সন্ধ্যা”  ফররুখ আহমদের অতি পরিচিত প্রবাদতুল্য দীর্ঘ কবিতা নয়, এটি একটি আটোসাটো ধ্বনি ম-িত সফল সনেট। সফল সনেট সৃজন করাটাও ফররুখ আহমদের কবি প্রতিভার বরাবরই উজ্জ্বল আকর্ষণীয় দিকও বটে। কবি জীবনের প্রথম পর্যায় থেকে সফল সনেট লিখেছেন। আবার এও উল্লেখ করার মত তথ্য বটে ফররুখের প্রথম প্রকাশিত কবিতা হলো সনেট- যার নাম “রাত্রি”। অথচ আমাদের অবাক হতে হয় যখন দেখি এই ফররুখ আহমদই এক সময় প্রবল গম্ভীর ভাবে প্যাশনকে ছাড়িয়ে সৃজন করেছিলেন বহুল আলোচিত বেশ কিছু দীর্ঘ কবিতা। যা এখনো আমাদের তীব্র ভাবে আলোড়িত করে। আবার সেই প্যাশনকেই গভীর ভাবের ব্যঞ্জনাকে ঘনীভূত করে মাত্র চৌদ্দটি পঙ্ক্তিমালায় বন্দী করেছিলো যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর মত বিশাল বিপুল শক্তিধর প্রতিভার পক্ষেও সম্ভবপর হয়নি। আর এই সংহতিবোধ ও বুদ্ধির শাসনকে কবিতার মধ্যে প্রয়োগ করার আয়াসসাধ্য ক্ষমতা ফররুখ আহমদের ছিলো স্বভাবজাত। এই ক্ষেত্রে ফররুখ আহমদকে তাঁর অগ্রজ কবি অজিত দত্তের উত্তরাধিকারী হিসেবে ধরে নেয়া যায়; কারণ এই দুইজনই এখন অবধি বাংলা কবিতায় সবচেয়ে সফল সনেট লেখক হিসেবে পরিচিহ্নিত হচ্ছেন। “বন্দরে সন্ধ্যা” কবিতাটির সূচনা অত্যন্ত কাব্যময়। পাঠক মিলিয়ে নিন :

“গৌধূলী তরল সেই হরিণের তনিমা পাটল

অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা শিঙে ভেসে এল চাঁদ

সাত সাগরের বুকে সেই শুধু আলোক-চঞ্চল;

অন্ধকার ধনু হাতে তীর ছোঁড়ে রাত্রির নিষাদ।”

 অক্ষর বৃত্তের আর দশ মাত্রার কাঁটায় কাঁটায় ফরমে এই সনেট কবিতাটিতে ফররুখ আহমদ এক অপূর্ব চিত্রকল্পময় পরিবেশ  আমাদের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। একবার পড়লে বোঝার আগে আমাদের হৃদয়ের ভেতর দেশে মুগ্ধতার সন্নিপাত ঘটায়। টি এস এলিয়ট কথিত আমাদের আলোচ্য কবিতা নিঃসন্দেহে সেই জাতের। সেই সঙ্গে আমাদের এই কবিতার চড়বঃরপ ফরপঃরড়হ সমন্ধেও খানিকটা আলোকপাত করাটা জরুরী। ফররুখের কবিতার চড়বঃরপ ফরপঃরড়হ তৈরি হয়েছে মূলতঃ বেশ কয়েকটি শব্দের পুনঃপুনঃ ব্যবহারের দ্বারা, এগুলো হলো সাগর, মাঝি, বন্দর ও চাঁদ ইত্যাদি। পাশাপাশি কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নক্ষত্র, নীল, নাগেশ্বর গাছ, হরিণ, ইঞ্জিনের শব্দ, তারার আলো দিয়ে আলাদা স্বাতন্ত্রিক জগৎ হয়েছে, তাঁর অনুজ কবি ফররুখ আহমদ আলাদা ভাবে শব্দ কবিতা সৃজনের জন্য সচেতন ভাবেই বেছে নিয়েছিলেন।

 তবে চাঁদের ব্যবহার আমাদের আলোচ্য কবিতা ছাড়াও অন্যান্য কবিতায়ও রয়েছে; এই প্রয়োগও হয়েছে স্বভাবজাত রোমান্টিক মনমানসিকতার কারণে। তার তালিকা মোটামুটি ভাবে করা যাক-

(ক).  চাঁদির তখ্তে চাঁদ ডুবে যায়

       পাহাড়ে পেতেছে জানু

    নতুন আকাশে জীবনের সুর

    জাগাও হাসিন বানু 

           ( শাহ্রিয়ার : সাত সাগরের মাঝি)

(খ). তারার বন্দর ছেড়ে চাঁদ চলে রাত্রির সাগরে,

      ক্রমাগত ভেসে ভেসে পলক মেঘের অন্তরালে,

      অশান্ত ডুবুরী যেন ক্রমাগত ডুব দিয়ে তোলে স্বপ্নের প্রবাল।

           (ডাহুক: সাত সাগরের মাঝি)

(গ). বন্দরে বসে যাত্রীরা দিন গোনে

      বুঝি মৌসুমী হাওয়ায় মোদের জাহাজের ধ্বনি শোনে।

            (পাঞ্জেরী: সাত সাগরের মাঝি)

আমি ইচ্ছাকৃত ফররুখ আহমদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছি, কারণ ফররুখ আহমদই সেই বিরল প্রতিভাধর কবিগোষ্ঠীরদের মধ্যে একজন যারা শুরুতেই পাঠকের মাঝে নিজের বিস্তর চেতনাগত রঙ ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। অন্ততঃ তাঁর বিখ্যাত ‘সাত সাগরের মাঝি’ পড়ে আমার তাই মনে হয়েছে।

 বাংলা কবিতায় সাগরের উপমা মাইকেল মধুসূদন দত্তের যুগান্তকারী কাব্য ‘মেঘনাদবধ’-এর মাধ্যমে শুরু হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে পূর্ণতা পায়। পরবর্তীকালে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, (সমুদ্রের প্রতি কবিতার দিকে লক্ষ্য রেখে) সত্যেন্দ্রনাথ ও মোহিতলাল মজুমদারের কবিতায় ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। আবার কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় সিন্ধু-সমুদ্রের কথা বারবার এসেছে। তবে আধুনিক কবিদের মধ্যে তিরিশের একজন খ্যাতিমান কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রই তাঁর কবিতার মধ্যে প্রথম অতীত দূরাচারী দিন, সমুদ্র বন্দরকে সফলভাবে ব্যবহার করেছেন। এমনকি তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থের নামই হলো ‘বেনামী বন্দর’- আর তাঁর বহুল আলোচিত আকাদেমী ও রবীন্দ্র পুরস্কার প্রাপ্ত কাব্যগ্রন্থের “সাগর থেকে ফেরা”-তেও বন্দর-নদী সাগরকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই সম্পর্কে কবি ও সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দের খানিকটা মন্তব্য শোনা যাক :-

“প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা বিশেষভাবে উদ্বোধিত হয়েছেন ইতিহাস-ভূগোলের শোভাপথ ধরে। রবীন্দ্রনাথের পরে মোহিতলাল মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, নজরুল বাংলা কবিতায় বিষয় বদলের টানেই তাকে সন্ধান দিয়েছিলেন ইতিহাস-ভূগোলের নব নবীন পথে পথে।” [সূত্র : নিরর্থক : প্রেমেন্দ্র মিত্র , বিবেচনা ও পূর্ণবিবেচনা, পৃ. ১৯১]

 হয়তো এই কারণেই ফররুখের কবিতার প্রথম সমালোচক গল্পকার আবু রুশদ ফররুখ আহমদের উপর প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রভাবের কথা বলেছিলেন। আমাদের বিবেচনায় আবু রুশদ সংগত কারণেই সমালোচনার সঠিক জায়গায় আঘাত করেছিলেন, যদিও কবি সমালোচক আবদুর মান্নান সৈয়দ সেই মতামতকে নাকচ করে দিয়েছেন।

 যাইহোক, এবার কবিতার পারিপার্শ্বিক বিষয়বস্তুর উপরে নজর দেয়া যাক। কবিতাটির মোটামুটি গাদ্যিক এই রকম যে, কবি এক বন্দরের তীরবর্তী জায়গায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছেন। আমরা সাধারণত যেভাবে সূর্যাস্ত দেখি এটা অবশ্য সেই রকম নয়। এর ভেতরদেশে আভাসিত হচ্ছে এক অন্য রকম রহস্যময়তা। কবিতাটির নামকরণ যেহেতু “বন্দরে সন্ধ্যা”, সেই ক্ষেত্রে কবিতা বা সনেট যাই বলি না কেন, তার বর্ণনার ভেতরে ফোয়ারার মত এক ধরণের নির্ঝরণী বয়ে যায়। যেমন :-

    গৌধূলী তরল সেই হরিণের তনিমা পাটল

 

পরের পঙ্ক্তিতে যোগাঙ্কিত হয়েছে আরেকটি অসাধারণ চিত্রকল্পময় পঙ্ক্তি; 

     অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা শিঙে ভেসে এল চাঁদ

 

কবিতার এই বর্ণনা আমাদের জানিয়ে দেয় যে দিবস শেষে সন্ধ্যা নেমেছে। গৌধুলি আক্রান্ত আকাশে চাঁদ উঠেছে, সেই চাঁদ আবার হরিণের বাঁকা শিঙের মতন। যেমন সাম্প্রতিককালের কবি শামসুর রাহমানের চোখে:-

    ঘোড়ার নারের মত চাঁদ

    ঝুলে আছে আকাশের বিশাল কপাটে, আমি

    খড়ের গাদায় শুয়ে ভাবি

    মুমুখ পিতার কথা, যার শুকানো প্রায় শব প্রায় অবাস্তব

      (জনৈক শহিসের ছেলে বলছে : বিধ্বস্ত নীলিমা)

কিংবা ইংরেজ কবি পার্শি বিশি শেলির চোখে-

    অহফ ষরশব ধ ফুরহম ষধফু, ষবধহ ধহফ ঢ়ধষব

    ডযড় ঃড়ঃঃবৎং ভড়ঁৎঃয, ৎিধঢ়ঢ়বফ রহ ধ মধুুঁ ুবষষ.

ফররুখ আহমদ অবশ্য কবি শেলির মত বিষণœ রোমান্টিক কবি নন, কারণ তাঁর রোমান্টিকতা খানিকটা বিষন্ন হলেও আসলে বিপ্লবী দৃঢ়তায় ভরপুর। যেমন কবিতাই পাচ্ছি :-

    তরুণীর মুখ থেকে মুছে গেছে দিনের রক্তিমা,

অপর দিকে সেই চাঁদই কবির কাছে আলোকদাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে যখন পড়ি :-

    সাত সাগরের বুকে সেই শুধু আলোক-চঞ্চল;

অনেক কবিতা পাঠকের ধারণা ফররুখের কবিতার ভেতরদেশে কেবলই জাগরণ কিংবা হতাশা নিহিত রয়েছে। আসলে সেটি সঠিক তথ্য নয়, কারণ ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ পরবর্তী অনেক কবিতাতেই আমরা হতাশার সাক্ষাৎ পাই। অবশ্য প্রথম চারটি পঙ্তিমালা পড়ে বন্দরে চাঁদের অবস্থান, আগমন, বন্দরে চাঁদের পরিবেশ ইত্যাদি উপভোগ করা গেল বটে, কিন্তু আরব সমুদ্র ¯্রােতের আহ্বানের কথা কেন এলো? যেমন :-

     আরব সমুদ্র-¯্রােতে ক্রমাগত দূরের আহ্বান,

অধ্যাপক সুনীল কুমার চট্টোপাধ্যায় (ফররুখ আহমদের উপর প্রথম আলোচনা গ্রন্থের লেখক) এ সমস্ত পঙ্তিমালার ভেতরদেশের ইসলামী ঐতিহ্য ও ঘটনাবলীর সন্নিবেশ লক্ষ্য করেছেন। আমরা তার এই মতামতের উপর শ্রদ্ধা রেখেই কয়েকটি জরুরী সূত্র অন্ততঃ এই মুহূর্তে যোগ করতে চাই। সেটি হলো সমুদ্র, রমজান ও বন্দর ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার প্রসঙ্গে।

 ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে ফররুখ জানতেন- ঐতিহ্যকে সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কারণ তাঁর প্রিয় কবি এলিয়টকে যিনি খুব ভালোভাবে পড়ে ছিলেন। এলিয়ট মনে করতেন :-

 “কিন্তু ঐতিহ্য এমন একটা হস্তান্তরযোগ্য ব্যাপর নয়, যা পূর্বজন্মের কাছ থেকে পরবর্তী উত্তরাধিকারীরা তাদের সাফল্যের জন্য অন্ধ ও ভীরু অনুগত্য করার। তাহলে সেই ঐতিহ্যের ধারণা যথার্থ ভাবে নিরুৎসাহিত করা উচিৎ।”

উপরের বক্তব্য মেনে নিয়েই প্রকৃত কবির কি কাজ করা উচিৎ সে সম্পর্কে এলিয়ট আবার বলেছেন :-

“যেটা প্রতিষ্ঠিত কীর্তি আছে সেটা একটা আদর্শ শৃঙ্খলা স্থাপন করে, সেটা শুধু রূপান্তর ঘটে নতুনের সংযোজনের দ্বারা।” (ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত প্রতিভা, টি এস এলিয়ট)

 আমাদের আলোচ্য কবিতাটিতেই ফররুখ আহমদের সেই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে। আসলে বিষয়বস্তু পৃথিবীর যে কোন আদর্শ থেকে আহরিত হতে পারে। শুধুমাত্র আমাদের আলোচ্য কবিতাতেই নয়, ফররুখ আহমদের বেশ কয়েকটি কবিতাতেই রমজান শব্দের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় তবে সেই উপস্থিতিকে অনেক সময় বাস্তবতার ছায়া দ্বারা আক্রান্ত বলেই মনে হয়। আর এটাতো ঠিক যে ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থে ফররুখ আহমদ যতটা স্বাপ্নিক সেই রকম স্বাপ্নিকতার খরতেজ আর কোন কাব্যগ্রন্থগুলোতে দেখা যায়নি। হয়তো পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তার স্বপ্নকে বিঘিœত করেছিলো প্রবলভাবে।

 কিন্তু মুশকিল বেধেছে পরবর্তী পঙ্তিমালায়- যেমন “ষোল পাপড়িতে ঘেরা” ও সেহেলীর বিমুগ্ধ স্বপনে”র মত হৃদয়গত শব্দমালা নিয়ে। কবিতাটি এতক্ষণ এক ধরনের আধ্যাত্মিকতাবোধের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটি একটি প্রেমের কবিতা। যদিও ফররুখ আহমদ খুব বেশি নিবিড় ঘন প্রেমের কবিতা সৃজন করেননি। তাহলে সরাসরি প্রশ্ন উঠতে পারে এর মধ্যে কি ফররুখ আহমদের কোন যৌবনিক প্রেমের স্মৃতি কাজ করছে? এই কারণে সনেট কবিতার কয়েকটি পঙ্তিমালা বিশ্লেষণের সময় আমাদের একটু সর্তকতার সাথে অগ্রসর হতে হবে। পাঠক মিলিয়ে নিন আমাদের সাথে :-

(১) ষোল পাপড়িতে ঘেরা ষোড়শীর সে পূর্ণ যৌবনে

(২) আসিল অতিথি এক বন্দরের শ্রান্ত মুসাফির।

(৩) সূর্যাস্তের অগ্নিবর্ণ সেহেলির বিমুগ্ধ স্বপনে,

(৪) নিভৃত ইঙ্গিত তার ডেকে নেয় পুষ্পিত গহনে;

 তাহলে এই কয়েকটি পঙ্তিমালা পড়ার পর আমাদের কি ধরে নিতে হবে এটি আসলে প্রেমের কবিতা। মনে হওয়া স্বাভাবিক। কবি হিসেবেই এখানে ফররুখের কবিতার জয়জয়কার। বিভিন্ন চিন্তাধারা প্রিজমের মত দিক বিদিক লাল-নীল দ্বীপাবলি আলো হয়ে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমার এ মন্তব্যের অর্থ এই নয় যে, প্রেমমন্ত্র তাঁর কবিতায় ছায়াপাত করেনি। তবে বেশ কয়েকটি অসামান্য প্রেমের কবিতা বাদ দিলে ফররুখের কবিতা মূলতঃ জাগরণকেন্দ্রিক। তাতে রয়েছে পুরোপুরি সমাজ সচেতনতার জামা কাপড় পরানো। অথচ সেখানেই দেশজ-চেতনা বিরোধীর কোন অনুসরণ নেই। ফররুখ আহমদ রোমান্টিক কবি, সেই কারণে রোমান্টিকতার চেতনা সম্পর্কে দু’একটি কথা বলা দরকার।

 রোমান্টিক কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চিত্রকল্প তৈরি করা। ইমেজিস্ট কবিদের কবিতার খাঁচায় অথবা কবিতার পটভূমিতে খোলা আকাশ থেকে প্রান্তর, সমুদ্রকে নির্ধারিত করে রাখেন। তাদের আওতায় যে বস্তুসমূহ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজেদের কার্যক্রম যেমন ফুল, পাখি, লতা, এমনকি ঘোড়াও হয়ে যায় কবিতার উপমা ও প্রতীক। মোদ্দাকথা পরিবেশ বর্ণনার প্রয়োজনে সৃষ্টির পটভূমিতে অসামান্য পরিবেশে রূপান্তরিত হয়ে যায়। অথচ রোমান্টিক কবিরা কোন বস্তু বাদ পড়ার বিরোধীতায় আপ্রাণ লিপ্ত। ফররুখ আহমদের বিখ্যাত “বা’র দরিয়া” শীর্ষক দীর্ঘ কবিতাটি এই শ্রেণির উজ্জ্বল কবিতা, কারণ সেখানে আরবি তেজী ঘোড়া হয়ে যায় কবিতার প্রতীক, উপমা। যাই হোক, পরবর্তী ছয়টি পঙ্তিমালা বোঝার জন্য এই আলোচনাটুকু অত্যন্ত জরুরী ছিলো।

   আমরা আগেই লক্ষ্য করেছি “বন্দরে সন্ধ্যা” সনেটটির ভেতরদেশে রমজান মাসের আগমন ঘোষিত হবে দেখেছেন। কবি এখানে নিজেকে অ্যাখ্যায়িত করেছেন একজন শ্রান্ত মুসাফির হিসেবে। কিন্তু তাঁর আগমন ঘটেছে যৌবনের শিখর চূড়ায়। তারপর  তিনি সূর্যাস্তের অগ্নিবর্ণ সেহেলির বিমুগ্ধ স্বাপ্নের ভেতরদেশে প্রবেশ করতে চাইলেন এক ধরনের পুষ্পিত গহনের অর্থাৎ সভ্য শ্রান্তিময় জীবনের। কিন্তু প্রবেশাধিকারের জন্য নিভৃত ইঙ্গিতের কথা ক্যানো এলো? তবে কি সনেট কবিতার শেষোক্ত ছয়টি পঙ্তিমালার ভেতর কবির কোন আত্মজৈবনিক ঘটনা সংগুপ্ত আছে? থাকলেও থাকতে পারে! কারণ আমরা জানি ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থে কবিতার আনুপূর্বিক বিষয় আশ্রিত হয়েছে ইসলামী পুরানকে কেন্দ্র করে। প্রথম জীবনের কবিতাসমূহ যদিও সৌন্দর্যবাদী রোমান্টিকতার আপ্লুতময় সুরে পরিপূর্ণ। কবি ফররুখ আহমদ তবুও মনোজগৎ আদর্শের সর্বনাশ লক্ষ্য করেছেন। সেখানে শুধু রাঙানো মহলেই দেখছেন না, শ্রান্তিও অনুভব করেছেন। কারণ :-

     অনেক সমুদ্র তীরে স্বপ্নময় হ’ল এ শিশির

এর আগের শব্দ অর্থাৎ অনেক সমুদ্র শব্দটি কি শুধুই উৎপ্রেক্ষার অংশ? ঠিক আমাদের কাছে সঠিক বোধগম্যতার সুর বহন করে না। তবুও রোমান্টিকতার ধারাবাহিক চেতনায় কবিতাটির এই সমস্ত পঙ্তিমালা কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য। হয়তো শেষান্ত শব্দটি আরো বোধগম্য করে দেয় যখন আমরা পড়ি :-  তারার সোনালি ফুল ছিটে পড়ে রাত্রির অঙ্গনে।

তখন আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, কবিতার প্রতীকের আড়ালে আবডালে রয়েছে এক অবিনশ্বর অনিশ্চিত মানব সমাজ। যার কল্যাণ নিশ্চিত করাটা ছিলো তাঁর আজীবন আরাধ্য কামনা।

 রোমান্টিক হৃদয়ের কবিরাও সামাজিক অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। এই কারণেই বিখ্যাত সমালোচক আবু সায়ীদ আইয়ুব তাঁর এক প্রবন্ধে অনেক আগেই আমাদের সর্তক করে দিয়েছিলেন এই বলে :-

There is for greater community emotion between man and thought”

[সূত্র : Bengali Modern poetry : : পথের শেষ কোথায়]

 

আমাদের আলোচ্য কবিতাটি “বন্দরে সন্ধ্যা” নিঃসন্দেহে সেই জাতের সার্থক কবিতা তাতে কোন সন্দেহ নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ