ঢাকা, শুক্রবার 20 October 2017, ৫ কার্তিক ১৪২8, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কবি ফররুখ আহমদ : আলোর অভিযাত্রী

ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান : কবি ফররুখ আহমদ আপাদ মস্তক ছিলেন একজন আধুনিক কুশলী কবি। তার কবিতা “শিল্পের জন্যে শিল্পের নিরিখেও মানোত্তীর্ণ এবং শিল্প সম্মত এত সন্দেহ নেই আদৌ। কিন্তু পৃথিবীতে যারা শুধু “শিল্পের জন্য শিল্পের ধাঁধায় পড়ে কাব্য চর্চা করেন- তাদের দলের মধ্যে তিনি গণ্য হননি। গণ্য হতে চাননি কোনভাবেই। কারণ তিনি শিল্পের জন্যে শিল্প নামক অভিধাটাই বিশ্বাস করেননি জীবনে। বরং “শিল্পের জন্যে মানুষ কিংবা শিল্পের জন্যে ইসলামকেই প্রাধান্য দিয়ে কাব্য চর্চা করেছেন আজীবন। তার সমকালীন কেউ কেউ প্রথম জীবনে তার পথ ও মতকে গ্রহণ করে তার সহগামী হয়ে কাব্য চর্চা করলেও সেই বন্ধুরা সেই বন্ধুর পথে যাননি। বরং জড়বাদী এবং বস্তুুবাদী চিন্তাচেতনার নিগড়ে বাধা পরে সম্মুখ পানে এগিয়ে গেছেন। নারী ও প্রকৃতি বন্দনার পথ অবলম্বন করে কাব্যের ফসল ফলিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছেন। কিন্তু ফররুখ আহমদ তার পথ ও মতকে কখনও বিসর্জন দেননি সামান্যতমও। বরং আরো কঠিন এবং অনঢ় থেকে লড়েছেন নিজস্ব গতি বিশ্বাসের পথেই। কে কি বললেন কিংবা কে কি মন্তব্য করলেন সেই দিকে তাকানোর তোয়াক্কাই করেননি কখনও। এ এক মর্দে মুজাহিদ, এক সংগ্রামী চেতনার সিপাহসালারেরই অদম্য এবং সুদৃঢ় মনোবৃত্তির বহিপ্রকাশ মাত্র।

সেই চল্লিশ এর দশকে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় স্থির হয়ে বসে যেন আরো কঠিনতম পথে তিনি অগ্রসর হলেন। সংগী সাথীরা সব অন্য পথে গেলেন, সুযোগ সুবিধাও পেলেন। কিন্তু তিনি তার পথ ও মত হতে এক চুলও সরলেন না এবং নরলেন না সামান্যতমও । যেন আরো পাকা পোক্তভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন শাশ্বত সত্যের পথে -মানবতাবাদের সপক্ষে । এজন্যে তাকে কলিজার ঘাম কম ঝরাতে হয়নি। অনেককিছু হারাতে হয়েছে তাকে। তবে হারেননি কারও কাছেই। অনেক বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে- দুঃখ কষ্টের পাহাড় ভেঙে পড়েছে তার ঘাড়ে। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি একটুও। এ যে, এক অকুতোভয় নরশার্দুলের প্রতিচ্ছবিই প্রকাশিত হয় বছরের পর বছর, যুগের পরে যুগ। বিপরীত পথের সহযাত্রিরা থমকে গেলেও তিনি তার অভিযাত্রায় কখনো বিশ্রাম নেননি। সাহিত্যের জগতে এমন বিরল দৃষ্টান্ত সহসা দৃষ্টিগোচর হয়না। প্রগতিবাদীরা কিংবা কলাকৈবল্যবাদী বিজ্ঞজনেরা তাকে প্রগতিবিরোধী অথবা আধুনিকতার প্রবল বিরুদ্ধবাদী বলেই মনে করতেন। অথচ তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে আধুনিক ও প্রগতিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক সর্বাঙ্গ সুন্দর কবি মানুষ। সচ্চরিত্রের মহান প্রতীক। 

‘আধুনিকতা ’ ও ‘প্রগতিবাদ’ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত থাকা অস্বাভাবিক নয় । তিনি কারও মতামতকেই তুচ্চ ভাবেন নি। তবে নিজে ছিলেন একদম স্থির - অটুট। ইসলাম সম্পর্কে ধর্মহীন মানুষেরা ভুলভ্রান্তি পোষণ করে থাকেন। তাই বলে ইসলাম কখনই প্রগতি বিরোধি কিংবা বিজ্ঞান বিরোধী নয় একটুও। 

ইংরেজি সাহিত্যের একজন মেধাবী ছাত্র হয়ে তিনি অনাধুনিকতার পক্ষালম্বনকারী হন কিভাবে কোন্ যুক্তিতে? ফররুখ আহমদ ইংরেজি সাহিত্যের সংস্পর্শে আধুনিকতার এপিঠ ওপিঠ সম্পর্কে ছিলেন বেশ ওয়াকিফহাল। আধুনিকতার সংজ্ঞা ও পরিচয় তাকে বলে দিতে হয়নি। তবে আধুনিকতার নামে যেসব আদিমতার প্রচলনকে সমাজে চালু রাখা হয়েছে- সে সবের সঙ্গে ফররুখ আহমদ এর দূরতম সম্পর্ক থাকারও কথা নয়। তাই সেসব তথাকথিত আধুনিকতাকে ফররুখ আহমদ চরমভাবে ঘৃণা করতেন। আর এই স্থানেই যত্তোসব তাল গোল পাঁক খেয়ে গা গোস্যার সৃষ্টি হতো। তাই ফররুখ আহমদ এসবকে কখনো পাত্তাই দিতেন না। 

তার সম্পর্কে ভুলভ্রান্তির শিকার হয়ে কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্য প্রকাশ করে মনের খেদ-ঝাল মিটিয়েছেন মাত্র। প্রকৃত বিশাল মনের মানুষ মহৎ কবি ফররুখ আহমদকে তারা চিনতে ও বুঝতে ভুল করলেও আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন মহান কবিকে, একজন সর্বাধুনিক মানুষকে আড়াল করা কোনদিন সম্ভব হবে না। বাংলা সাহিত্যে তার যে অবদান তার যে বিশাল সৃষ্টি সম্ভার-সেসবতো কেউ চাইলেই মুছে ফেলা সহজ নয়। তার বিপুল সাহিত্য তার রচনা সমগ্রকে ধামাচাপা দিয়ে নস্যাৎ করবার অপপ্রয়াস-কখনও ফলপ্রসূ হবার নয়। যারা তার সঙ্গে মিশেছেন, তার সান্নিধ্য লাভ করেছেন-তারাই বলতে পারেন তিনি কেমন কবি মানুষ ছিলেন। কেমন আধুনিক চিন্তা চেতনার অধিকারী একজন মহৎ কবি ছিলেন। তার মতো একজন মহান চরিত্রবান মানুষ, একজন আদর্শবাদী মহৎ কবি, একজন নিরাপোষ সত্য নিষ্ট সাহিত্যিক, একজন শতভাগ নির্লোভ সত্য সৈনিক, স্বার্থান্ধনন সামান্যতম - এমন মানুষের দৃষ্টান্ত আজ আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তার সম্পর্কে না জেনে না বুঝে কতোনা কটুমন্তব্য করা হয়েছিল পূর্বে - এখনো তার রেশ কাটেনি বরং একটু যেন বেশি মাত্রা পায় মাঝে মধ্যে। তার রচনাবলীর প্রচার ও প্রসারে বাধা প্রদান অব্যাহত। পাঠ্য পুস্তকে তার স্থান খুবই সামান্য। অথচ নাস্তিক্যবাদী কবি লেখকদের ‘লেখা ’ নির্বিচারে ব্যবহৃত হচ্ছে। এদের লেখা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করবার একটা গোপন প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে মনে হয়। ফররুখ আহমদ এর অসংখ্য অপ্রকাশিত পা-ুলিপি আর দিনের আলো দেখছেনা। এ সীমাহীন দুঃখ আমরা রাখবো কোথায়? যার চারিত্রিক গুণাবলী, আদর্শ নিষ্ঠার দ্বারা জাতি উপকৃত হতো, যার সাহিত্য দ্বারা মানুষ কল্যাণ লাভ করতো - তার কোন ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ হতে দিতে চাচ্ছেন না যেন। তার জন্ম মৃত্যু দিবস নিরবে চলে যায় - কেউ খবরও নেয় না। হায়রে দুর্ভাগা জাতি! পত্রিকাগুলো শুধু তাদের নিয়ে ব্যস্ত যারা দেশ জাতির জন্যে আদর্শ হতে পারেন না। 

কবি ফররুখ আহমদ ইসলামকে তার জীবনের পূর্নাঙ্গ বিধান হিসাবে গ্রহণ করে ভুল করেননি মোটেই। তাকে বাংলা সাহিত্যে ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনের পুরোধা কবি বলে আখ্যায়িত করা হয়। ঝঞ্ঝা-বিক্ষুদ্ধ বিশ্বে ইসলামের শাশ্বত জীবন পদ্ধতির দ্বারা মানব জাতির কল্যাণ তিনি কামনা করেছেন তার কাব্যে, তার সাহিত্যে। মানব রচিত কোন মতবাদে নয় বরং ইসলামের মহান আদর্শের মাধ্যমে জটিল সমস্যা সংকটে বিপর্যস্তু সমগ্র বিশ্বে শান্তি স্বস্তির সমাজ প্রতিষ্ঠার সমর্থন ও আকাংখ্যা তিনি ব্যক্ত করেছেন আজীবন। এ চাওয়া ও প্রত্যাশা করা কোনভাবেই অপরাধ নয়। মানুব রচিত মতাদর্শের বাস্তবায়ন কেউ যদি চায়-তা যেমন অপরাধ বলে গণ্য হয় না। তেমন বিশ্ব নিয়ন্ত্রা কর্তৃক প্রেরিত আদর্শের সফল বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করাও অপরাধ বলে গণ্য হওয়ার কোন কারণ নেই। সুতরাং কবি ফররুখ আহমদ ইসলামের নব জাগৃতি চেয়েছেন বলে তাকে গাল মন্দ করা বা তাকে তুচ্ছ ভাবা এবং অপাংক্তেয় করে পর্দার আড়ালে ঠেলে দেয়াও বড় মনের পরিচয় বহন করেনা। বরং তার লেখা, তার কবিতা মানসম্পন্নকিনা তা দেখাই আসল কথা। মহাকালের অবিশ্রান্ত প্রবাহে তার লেখা টিকে কিনা তা নিরীক্ষণ করাও অত্যাবশ্যক। তা না হলে জাতি হিসাবে আমরা চরম কূপমন্ডুক বলেই বিবেচিত হবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ