ঢাকা, শুক্রবার 20 October 2017, ৫ কার্তিক ১৪২8, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জাতিসংঘের

 

 

সংগ্রাম ডেস্ক : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেদেশের সেনাবাহিনীর পুড়িয়ে দেয়া বেশকিছু গ্রাম স্বচক্ষে দেখেছেন জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফ্রে ফেল্টম্যান। একইসঙ্গে তিনি রাখাইনের রাজধানী সিত্তুয়ে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। জাতিসংঘের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর মিয়ানমারে পাঁচ দিনের সফর শেষ করেন জাতিসংঘের এ কর্মকর্তা। সফর শেষে তিনি রাখাইনের গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেকার অনাস্থা ও ভীতি দূর করতে জবাবদিহিতা, বৈষম্যহীন আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মত দিয়েছেন।

আকাশপথে রাখাইনের পরিস্থিতি দেখা জাতিসংঘের এ শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অব্যাহত বৈষম্যমূলক ব্যবস্থায় সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো সকল গোষ্ঠীর জনগণকে ক্ষতির মুখে ফেলেছে। তিনি রাখাইন রাজ্যের জন্য গঠিত আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এক্ষেত্রে মিয়ানমার চাইলে জাতিসংঘ সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে।

মিয়ানমার সফরকালে তিনি স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি, সেনাপ্রধান মিন অং হেইংসহ মিয়ানমারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা ও সংকটকে তুলে ধরেছেন। তিনি রাখাইনে ত্রাণ সরবরাহকারীদের প্রবেশের পাশাপাশি পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সূত্র: ইউএন নিউজ।

সু চি-সেনাপ্রধানের সঙ্গে জাতিসংঘের ‘নিষ্ফল’ বৈঠক

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কোনও গঠনমূলক সিদ্ধান্ত ছাড়াই মিয়ানমারে জাতিসংঘের ৫ দিনের সফর শেষ হয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে রাখাইন সফরকারী কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, তাদের সফরে ‘কোনও বিজয় অর্জিত’ হয়নি। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে মিয়ানমার থেকে শূন্য হাতে ফিরেছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা। মালয়েশীয় সংবাদমাধ্যম স্ট্রেইট টাইমস লিখেছে, জাতিসংঘ কর্মকর্তারা মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চি এবং সেনাপ্রধান মিং অন-এর সঙ্গে বৈঠক করলেও সেই দুই আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কোনও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।

২৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীর নৃশংসতায় রাখাইন থেকে যে পাঁচ লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। এএফপির খবর অনুযায়ী, জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেফ্রে ফেল্টম্যান তাদের বিষয়ে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি ও সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক বলেছেন, ‘পাঁচ দিনের সফরে জেফ্রে ফেল্টম্যান মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের কাছে মহাসচিব গুয়েতেরেসের আহ্বান পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি আক্রান্ত এলাকায় মানবিক সাহায্যকর্মীদের অবাধ প্রবেশাধিকার এবং পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসন দাবি করেছেন।   আমি মনে করি না যে, জেফ্রের ওই সফরে আমরা দ্রুততার সঙ্গে কোনো বিজয় অর্জন করেছি। এটা হলো মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনা।’

সফরকালে বিমানে করে জেফ্রে ফেল্টম্যানকে নিয়ে যাওয়া হয় রাখাইনে। বিমান থেকেই তিনি আগুনে পুড়ে যাওয়া গ্রামের পর গ্রাম দেখতে পান। সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চান, রাখাইনে কেন সাহায্য পৌঁছে দিতে সাহায্যকর্মীদের এখনও বাধা দিচ্ছে মিয়ানমার। জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা একটা মূল্যবান প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মিয়ানমার সরকারের কাছে করতে হবে। আমরা দেখতে চাই যত দ্রুত সম্ভব সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে।’

এর আগে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংগঠন জেনেভায় বলেছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের কাছে অবরুদ্ধ হয়ে আছে ১০ থেকে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের মুখপাত্র আন্দ্রে মাহিকিক বলেছেন, দেশ ছেড়ে যাওয়ার অথবা হত্যার হুমকি থাকা সত্ত্বেও অনেক রোহিঙ্গা এখনও তাদের বাড়িতেই অবস্থান করছেন। তবে যখন তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তখনই তারা দেশ ছাড়ছেন, পালাচ্ছেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। তারা একে জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকেই দায়ী করছে যুক্তরাষ্ট্র

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এজন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে তারা। বুধবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এই ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং বিশ্ব এই হত্যাযজ্ঞে চুপ করে বসে থাকতে পারে না।’ 

মার্কিন এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে তিনি বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারের ঘটনার জন্য দেশটির সামরিক নেতৃত্বকে দায়ী মনে করছি।’ 

গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর দেশটির সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তাদের কাছ থেকে শোনা যায় সেনাবাহিনীর ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের কথা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিসকে টিলারসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বোঝে যে মিয়ানেমারের সরকার সন্ত্রাসীদের নিয়ে একটু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনীকে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে আরও দায়িত্বশীল ও সাবধানী হতে হবে।’ যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে গুরুত্বপূর্ণ উত্থানশীল গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে মনে করে বলেও জানান তিনি।  তিনি বলেন, ‘এখনই তাদের আসল পরীক্ষা। এখন তাদের গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।’

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো, যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ জন আইনপ্রণেতা মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছেন। হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভের রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট সদস্যরা রেক্স টিলারসনকে এক চিঠিতে লেখেন, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এছাড়া  ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান বলে জানান টিলারসন। একইসঙ্গে তাদের প্রতিপক্ষ চীনের সমালোচনাও করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে তাদের সহযোগী মনে করে। পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর করার চেষ্টা করবেন তারা। এরপর ভারত ও চীন নিয়ে তুলনা করে তিনি বলেন, দক্ষিণ চীন সাগরসহ বেশ কিছু বিষয়ে চীন আন্তর্জাতিক ধারার বাইরে কাজ করে।

চীনের বেল্ট এন্ড রোড প্রকল্প নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে একত্রিত হয়ে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাই। এখানে যেন কোনোভাবেই অস্থিতিশীলতা কিংবা সহিংসতা না হয়।’ সামনের সপ্তাহেই প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়া সফরে আসবেন টিলারসন। এসময় ভারত-পাকিস্তান সফর করবেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ