ঢাকা, শুক্রবার 20 October 2017, ৫ কার্তিক ১৪২8, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার প্রত্যাবর্তন

বিএনপির চেয়ারপারসন, ২০ দলীয় জোটের নেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বুধবার দেশে ফিরে এসেছেন। তার এই ফিরে আসার মধ্যদিয়ে সকল জল্পনা-কল্পনার যেমন অবসান ঘটেছে তেমনি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অসত্য প্রচারণাও। প্রধান একজন জাতীয় নেত্রী বলে শুধু নয়, দেশের একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবেও তিনি দেশে ফিরে আসবেন- এর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা থাকার কথা নয়। কিন্তু  বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণ, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এমন একটি প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, মামলা ও গ্রেফতারের ভয়ে খালেদা জিয়া নাকি চিকিৎসার নাম করে ‘পালিয়ে গেছেন!’ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তো একাধিক উপলক্ষে উপহাস করে একথা পর্যন্ত বলেছিলেন, দেখুন, তিনি আর ফিরে আসেন কি না! অন্য কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতাও ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন। এভাবে সব মিলিয়েই ক্ষমতাসীনরা খালেদা জিয়ার ফিরে আসার সম্ভাবনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি করেছিলেন। 

এটাই অবশ্য স্বাভাবিক ছিল। কারণ, তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা রয়েছে। সেগুলোর কোনো কোনোটিতে নির্ধারিত তারিখে হাজির না হওয়ার অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। মাত্র ক’দিন আগেও একদিকে নোয়াখালিতে গাড়ি পোড়ানোসহ নাশকতার মামলায় তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, অন্যদিকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মামলায় তাকে দেয়া আগাম জামিন বাতিল করেছেন আদালত। ফলে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, সরকার চাইলে তিনি বিমান থেকে নামার পরই পুলিশ খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করতে পারতো। কিন্তু এই একটি বিষয়ে ক্ষমতাসীনরা শুভবুদ্ধির সঙ্গে যথেষ্ট রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি বরং হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থকের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপদে তিনি বাসায় ফিরতে পেরেছেন। অন্যদিকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া নিজেও তার দায়িত্বজ্ঞানের প্রমাণ দিয়েছেন। পরদিন, বৃহস্পতিবারই তিনি আদালতে গিয়ে হাজির হয়েছেন। সেখানে বিচারক তার জামিন মঞ্জুর করেছেন। মামলার নতুন তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ২৬ অক্টোবর।   

সরকারের দিক থেকে দৃশ্যত কোনো সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না করা হলেও খালেদা জিয়ার দেশে প্রত্যাবর্তনকেন্দ্রিক সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ কিন্তু স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ থাকতে পারেনি। তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন ১৫ জুলাই। সে হিসাবে দেশে ফিরে আসতে তিন মাসের বেশি সময় লেগেছে। একই কারণে দলীয় কোনো কর্মসূচি ঘোষিত না হলেও বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নেত্রীকে সংবর্ধনা জানানোর প্রবল আগ্রহ থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। হজরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের উদ্দেশে গেছেনও তারা দলে দলে। গণমাধ্যমের খবরের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের সচিত্র রিপোর্টে হাজার ছাড়িয়ে লাখ লাখ মানুষের কথা বলা হয়েছে। টঙ্গীর আবদুল্লাহপুর ও উত্তরা থেকে বিমান বন্দর, নিকুঞ্জ, খিলক্ষেত ও বনানী হয়ে গুলশানের বাসভবন পর্যন্ত সব রাজপথের বেশিরভাগই চলে গিয়েছিল বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের দখলে। ফলে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, বহু এলাকায় যানজটে নাকাল হয়েছে মানুষ। বিষয়টি অনাকাংক্ষিত ও আপত্তিকর সন্দেহ নেই, কিন্তু বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, বিনা উসকানিতে লাঠিচার্জ করাসহ পুলিশের অযথা বাড়াবাড়ির কারণেই নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ফুটপাথ ছেড়ে রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। আগের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের যদি কেবল ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেয়া হতো তাহলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতো না। কিন্তু উসকানি এসেছিল পুলিশের পক্ষ থেকে। 

ওদিকে দ্বিতীয় একটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বেগম খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ি বিমান বন্দরের প্রধান গেটের গোল চত্বরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরই হঠাৎ করে সকল রোড লাইট নিভিয়ে ফেলা হয়েছিল। ফলে মুহূর্তে ভীতি ও আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। সঙ্গত কারণেই তারা নেত্রীর নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারেননি। অমন অবস্থায় প্রত্যেকে হাতে থাকা মোবাইলের লাইট জ্বালিয়েছেন। যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের মোটর সাইকেলের লাইট জ্বালিয়ে নেত্রী খালেদা জিয়ার গাড়িকে ঘিরে ফেলেছেন। তাকে প্রহরা দিয়ে গুলশান পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। তার বাসভবনে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলে হজরত শাহ জালাল (রহ.) বিমান বন্দরে সাধারণত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে না। কিন্তু খালেদা জিয়া গোল চত্বরে আসার পর সকল রোড লাইটই কেবল নিভিয়ে ফেলা হয়নি, সমগ্র বিমান বন্দরকেও অন্ধকারে ঢেকে ফেলা হয়েছিল। আমরা মনে করি, এমন কর্মকান্ডকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। কারণ, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অনেক অঘটনই ঘটতে পারতো। এমনকি খালেদা জিয়ার ওপরও হামলা চালাতে পারতো দুর্বৃত্তরা। এজন্যই বিষয়টি নিয়ে যথোচিত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমরা দাবি জানাই।

আমরা বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। একই সাথে আশা করতে চাই, অতীতের মতো আগামী দিনগুলোতেও তিনি গণতন্ত্র ও জনগণের স্বার্থে আপসহীন নেত্রীর ভূমিকা পালন করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ