ঢাকা, শুক্রবার 20 October 2017, ৫ কার্তিক ১৪২8, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

লাস ভেগাসের হামলার অপরাধটা কার?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : পৃথিবীতে যেমন অনেক জাতির উত্থান হয়েছে তেমনি কালের প্রবাহে তা আবার অজানা গন্তব্যে হারিয়ে গেছে। হাজার বছরের রোমান সা¤্রাজ্য ও সূর্য অস্ত না যাওয়া ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের ইতিহাস আজ কোথায়? উত্থান ও পতনের জোয়ার-ভাটার এই নশ্বর পৃথিবীতে ইসলামী খেলাফতের ভাটা চলেছে প্রায় ২০০ বছর ধরে। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে যারাই অন্যায় জুলুম করে নিপীড়িত মানুষের অধিকার ভূলন্ঠিত করার চেষ্টা করেছে তারাই কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ক্যান্সারের ন্যায় আশরাফুল মাখলুকাতকে ধ্বংস করছে। এমন একটি দেশও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে দেশ ও দেশের নাগরিকরা সন্ত্রাসের ভয়ে আতংকিত নয়! এক কথায় সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল সন্ত্রাসের কারণে বিশ্ব মানবতার শান্তি, নিরাপত্তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একের পর এক সন্ত্রাসী হামলায় মারা যাচ্ছে অগণিত মানুষ। কোথাও যেন এতটুকু জায়গা নেই যেখানে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। বিশ্বের যেখানেই সন্ত্রাসী কমকান্ড কিংবা জঙ্গি তৎপরতা দেখা দিয়েছে, সেখানেই ঘৃণ্য অপকর্মের সাথে মুসলমানদের যোগসূত্র আবিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে সন্ত্রাসের সাথে ঈমানদার মুসলমানদের দূরতম সম্পর্ক নেই। পৃথিবীর যে কোন ভূখ-ে মুসলমানরা যদি স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলন সংগ্রাম করে, তাহলে তাদেরকে সন্ত্রাসী উগ্র-মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। অথচ ইসরাঈল, আমেরিকা, রাশিয়া কিংবা মিয়ানমারের মতো দেশ যখন স্বাধীন ভূখন্ড দখল ও নিরপরাধ মানুষের রক্তে হোলি খেলায় মেতে উঠে তখন তাদেরকে কেউ সন্ত্রাসী কিংবা উগ্র হিন্দুবাদী বা মৌলবাদী বলে না। কিন্তু কেন? এ সকল প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ আলোচনা যা এ ক্ষুদ্র পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। তবে এতটুকু বলা যায় মানবতার ধর্ম ইসলাম ও শান্তিপ্রিয় মুসলিম জাতিকে কলংকিত করার প্রয়াসে ইসলামের দুশমনরা কিছু অশিক্ষিত নামধারী মুসলমানের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। আলকায়দা ও আইএস কার সৃষ্টি এটি বুঝার জন্যে প-িত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালেই সহজে উত্তর পাওয়া যাবে। 

 শোকে স্তব্ধ যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর সব শান্তিকামী মানুষ। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা রাজ্যের লাস ভেগাসে একটি উন্মুক্ত কনসার্টে ৬৪ বছর বয়সী উগ্রবাদী স্টিফেন প্যাডকের নৃশংস হামলায় ৫৯ জন নিহত ও অন্তত ৫২৭ জন আহত হয়েছে। পর্যটন এলাকা হিসেবে লাস ভেগাস বিশ্বব্যাপী পরিচিত । নগ্নতা ও বেহায়াপনার আখড়া হিসেবে অধিক পরিচিত এই লাস ভেগাস। ওই উন্মুক্ত কনসার্টে প্রায় ২২ হাজার মানুষ যোগ দিয়েছিল। গান চলাকালে হঠাৎ বজ্রপাতের ন্যায় বন্দুকের আওয়াজ শোনা যায়। নেভাডার বাসিন্দা স্টিফেন প্যাডক নামের এক বন্দুকধারী পাশের মান্দালে বে হোটেলের ৩২ তলার একটি কক্ষ থেকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে কনসার্টে আসা মানুষকে হত্যা করে। টুইন টাওয়ারের ন্যক্কারজনক হামলার পর সম্ভবত এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বরতম ও ভয়াবহ ন্যাক্কারজনক জঘন্য হামলা। ওই ন্যক্কারজনক হামলার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। ওই হামলার দায় আইএস স্বীকার করলেও তদন্ত কর্মকর্তারা এই ঘটনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কোনো যোগসূত্র পাননি। হামলাকারী স্টিফেন প্যাডক খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী হওয়ার পরও দায়টা তার সম্প্রদায়কে নিতে হয়নি। কিন্ত এই ঘটনায় যদি কোন মুসলিমের নামগন্ধ পাওয়া যেত তাহলে মুহূর্তের মধ্যে জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। অথচ স্টিফেন প্যাডককে সন্ত্রাসী না বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে নিঃসঙ্গ শিকারি। এমনকি ঘাতকের পরিচয় মুছে তাকে নেকড়ে বা পাগল বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ সে মুসলিম নয়! অনেকেই মনে করছেন শ্বেত গাত্রবর্ণের কারণেই প্যাডককে সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে না। 

আমেরিকার জনগণের সাথে আমাদের ধর্ম ও রক্তের কোন সর্ম্পক নেই। এমনকি তারা আমাদের ভাষাভাষি মানুষও নন। তারপরেও তাদের জন্য হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা একজন মুসলিম হিসেবেই হয়েছে। আমরা  হৃদয়ের সমস্ত ঘৃণা দিয়ে এই হত্যার নিন্দা জানাচ্ছি।  নিকট অতীতে ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার নগরীর এরিনা কনসার্ট হলে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে শিশুসহ ২২ জন নিহত এবং ৫৯ জন আহত হয়েছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অন্তত ছয়টি স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় ১৩০ জন নিহত হয়েছে। ভয়াবহ এ হামলায় দুইশতাধিক মানুষ আহত হয়েছিল। ফ্রান্সে বছরজুড়ে বেশকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে বছরের শেষ প্রান্তের সন্ত্রাসী হামলাটি ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত। এর আগে ২০০৪ সালে মাদ্রিদে ট্রেনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলো ১৯১ জন। এক অনুসন্ধানে জানা যায়,২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইউরোপে সন্ত্রাসী হামলাগুলোর মাত্র ২%  ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। ২০১৩ সালের ১৫২টি সন্ত্রাসী হামলার মধ্যে মাত্র ১% ও ২০১২ সালের ২১৯টি হামলার মধ্যে মাত্র ৩% হামলা ধর্মীয় উগ্রবাদের ফসল। ওই সময়ের সংগঠিত আক্রমণগুলোর সিংহভাগই উগ্র জাতীয়তাবাদী অথবা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা সংঘটিত। ২০১৩ সালে ৫৫%  হামলার কারণ উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ২০১২ সালের অধিকাংশ হামলা অর্থাৎ ৭৬% হামলার কারণ জাতীয়তাবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। হিটলারের নাৎসি জার্মান বাহিনী ও এদের দালালদের হাতে নিহত হয় ৬০ লাখ ইহুদি। এ ছাড়া এ গণহত্যার সময় আরো ৫০ লাখ অ-ইহুদিকেও হত্যা করা হয়েছিল। তবে ইতিহাসবেত্তারা নিহতের সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখের কথা উল্লেখ করে থাকেন। এই হত্যাকান্ড চলে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত। এই নৃশংস হত্যা যদি হিটলার না করে কোনো মুসলিম করতেন,তাহলে মুসলিমদের ধরে পাইকারি দরে খুন করা হতো। হিটলার যত মানুষকে খুন করেছেন তার জন্য বিধর্মীরা একটু উচ্চবাচ্য করেননি। কারণ হিটলার তাদেরই স্বগোত্রীয় নেতা ছিলেন। 

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এটা সবচেয়ে বড় হত্যাকান্ড তা কিন্তু নয়! ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে যে এরকম বহু ঘটনা আমেরিকাতে ঘটেছে। আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত ঘটনা ঘটেছিল ২০১৬ সালের জুনে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর সমকামীদের নাইটক্লাবে। ওই নির্মম ঘটনায় ৪৯ জন মানুষ নিহত হয়েছিল। ২০১৭ সালে সংগঠিত কয়েকটি হামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো যা কোন মুসলিম করেনি করেছে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীরা। আগস্টে ওহিও রাজ্যের ২০ বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ যুবক ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে বর্ণবাদ বিরোধী একটি বিক্ষোভে বিক্ষোভকারীদের ভিড়ের মধ্যে তার গাড়ি চালিয়ে দেয়। এতে একজন নারী নিহত হয় এবং কমপক্ষে ১৯জন আহত হয়। গত জুন মাসে ইলিয়ন রাজ্যের ৬৬ বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ সকালের বেসবল অনুশীলনের সময় একজন রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের ওপর গুলি চালায়। ওই হামলায় লুইনিয়ানার রিপাবলিক সদস্য স্টিভ স্ক্যালিসহ বেশ কয়েকজন লোক মারাত্মকভাবে আহত হয়। গত মার্চে ২৮ বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ যুবক কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে বাল্টিমোর থেকে নিউইয়র্ক সিটি আসেন। তিনি ৬৬ বছর বয়সি এক কৃষ্ণাঙ্গকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। পরে নিউইয়র্ক কৃর্তপক্ষ তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে অভিযুক্ত করে। মে মাসে জেরেমি জোসেফ খ্রিস্টিয়ান ৩৫ নামের ওরেগন রাজ্যের একজন শ্বেতাঙ্গ পোর্টল্যান্ডের একটি ট্রেনে মুসলিম কিশোরীদের উত্ত্যক্ত করে। এতে দুইজন পুরুষ বাধা দিলে তাদের ছুরিকাঘাতে হত্যা করে খ্রিস্টিয়ান। নিউ আমেরিকা নামে ওয়াশিংটন ডিসির একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের গবেষণায় দেখা গেছে ২০০১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে আমেরিকায় ইসলামি সন্ত্রাসীদের হাতে যত মানুষ নিহত হয়েছে,তারচেয়ে অনেক বেশি নিহত হয়েছে ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গদের হাতে। একই তথ্য পাওয়া যায় ২০১৭ সালের জুনে সেন্টার ফর ইনভেস্টিগ্যাটিভ রিপোটিং কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণায়।

বিশ্বকে বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে আমেরিকানদের ভূমিকা রয়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবের কারণে দেশটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পথ থেকে মুক্তির দিশা খুঁজে পাচ্ছে না। ইসলাম যে একমাত্র শান্তির ধর্ম তা তারা গ্রহণ করতে পারেনি। যে কারণে দেশটিতে মানবিক মূল্যবোধের ছিটেফোটেও দেখা যাচ্ছে না। যদি দেখা যেত তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কারাবন্দির সংখ্যাটা যুক্তরাষ্ট্রে হতো না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে কারাবন্দির সংখ্যা ২২ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫১ জন। অর্থাৎ প্রতি লাখে ৭১৬ জন কারাবন্দি। স্বদেশবাসীর বন্দুকের গুলিতে যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষ নিহত বা আহত হচ্ছে তত মানুষ পৃথিবীর অন্যকোন দেশে স্বদেশবাসীর হাতে নিহত বা আহত হয়নি। এফবিআইয়ের ভাষ্যমতে শুধুমাত্র ২০১১ সালেই ১১ হাজারের বেশি লোক স্বদেশবাসীর গুলিতে নিহত হয়েছে। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে বন্দুকবাজির ঘটনা ঘটে,তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় নেহায়েত কম। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষ খুন হয়েছে তার ৭৩ ভাগ নিহত হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে। বন্দুকের গুলিতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ৩০ হাজার লোক নিহত হয়। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ নিজের বন্দুক দিয়ে  আত্মহত্যা করে। আমেরিকার ইতিহাসে যত লোক যুদ্ধে মারা গেছে, তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে বন্দুকের গুলিতে। প্রতিদিন ৯২ জন আমেরিকান বন্দুকের গুলিতে মারা যায়। কংগ্রেসে দেয়া প্রথম বক্তব্যে যদিও ট্রাম্প দাবি করেন ৯/১১ এর পর থেকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধসমূহে জড়িত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই আমাদের দেশের বাইরে থেকে এসেছেন। কিন্তু গত ১৫ বছরে ইসলামের নামে পরিচালিত গুরুত্বর মার্কিন সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত অপরাধীদের কেউই ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সাত দেশ থেকে আসেনি। এসব সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ইসলাম কিংবা মুসলিমদের দূরতম সর্ম্পক নেই এটা আবারো প্রমাণিত হলো। আমরা মনে করি যারাই এ ধরনের জগন্যতম অপরাধের সাথে জড়িত থাকুক তাদেরকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি  করা হোক যাতে করে সন্ত্রাসের বিষবৃক্ষ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ