ঢাকা, শুক্রবার 20 October 2017, ৫ কার্তিক ১৪২8, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আগামীকাল কাতালোনিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেবে স্পেন-মারিয়ানো

১৯ অক্টোবর, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, রয়টার্স : বিপুল উত্তেজনা ও চরম সঙ্কটের মাঝে অবশেষে নিজের সার্বভৌমত্ব ঘোষণার শেষ সময়টুকু পার করে ফেলল স্পেনের কাতালোনিয়া। এর আগে স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার মধ্যে কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্লেস পুজদেমনকে স্বাধীনতার ঘোষণা অথবা প্রত্যাহারের আদেশ দেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয়।

 

গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে রাজয় জানিয়েছেন জানায়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাধীনতা প্রত্যাহার করে না নেয়ায় শনিবার কাতালান ইস্যুতে জরুরি বৈঠক নেয়া হবে। ওই বৈঠকে কাতালানের স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় শাসন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।এর আগে কাতালোনিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে সংবিধানের ১৫৫ ধারা অনুযায়ী এটি অবৈধ ঘোষণা করে কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার এবং সরাসরি শাসন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন রাজয়। ১৫৫ নং অনুচ্ছেদ চালু করলেও এটি কার্যকর করতে হলে আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে স্পেন পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এ সময়ের মধ্যে সহজেই স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা দিতে পারে কাতালান স্বাধীনতাপন্থীরা।এর আগে ১ অক্টোবর স্বাধীনতার পক্ষে বিপুল গণভোটের পর কাতালানের নেতা কার্লোস স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে পরে এটি প্রত্যাহার করেন এবং স্পেন সরকারকে আলোচনার আহ্বান জানান। কিন্তু মাদ্রিদ কাতালানকে ৮ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে কাতালানের স্বাধীনতা ইস্যুতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার নির্দেশ দেয়।কিন্তু বুধবার রাতে পুজদেমন নিজ দল কাতালান ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মাদ্রিদের হুমকিতে পিছিয়ে না আসার ঘোষণা দিয়ে বলেন, স্পেন যদি কাতালানের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে তাহলে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে। যদিও কখন, কিভাবে এই ঘোষণা দেয়া হবে, আঞ্চলিক পার্লামেন্টের তাতে স্বীকৃতি থাকবে কি না এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয় নি। 

 

সঙ্কট চরমে : মাদ্রিদ ও কাতালুনিয়ার নেতারা নিজ নিজ অবস্থানে অটল থাকায় কাতালান সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের শীর্ষ নেতারা সমর্থকদের কাছে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করায় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গত শতকের সত্তুরের দশকের শেষ দিকে গণতন্ত্র ফেরার পর এবারই প্রথম স্পেনের কোনো প্রধানমন্ত্রী স্বায়ত্তশাসিত একটি এলাকায় সরাসরি কেন্দ্রের শাসন চাপিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার মধ্যে কাতালুনিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্লেস পুজদেমন গত সপ্তাহে দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা প্রত্যাহার করে না নিলে কাতালুনিয়ায় সরাসরি শাসন চালুর ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন স্পেনীয় প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাখয়।

 

কিন্তু মাদ্রিদের এ হুমকিতে শঙ্কিত দেখাচ্ছে না কাতালান আঞ্চলিক সরকারকে। বুধবার রাতে পুজদেমন নিজ দল কাতালান ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মাদ্রিদের হুমকিতে পিছিয়ে না আসার ঘোষণা দিয়েছেন। স্পেন যদি কাতালুনিয়ার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। কখন এবং কিভাবে এই ঘোষণা দেওয়া হবে, আঞ্চলিক পার্লামেন্টের তাতে স্বীকৃতি থাকবে কি না তা নিশ্চিত না হলেও, স্বাধীনতাপন্থি আইন প্রণয়নকারীদের অনেকেই এই বিষয়ে কাতালান পার্লামেন্টে ভোট ডাকতে চাইছেন যেন স্বাধীনতার ঘোষণাটি আরও পোক্ত হয়।

 

রাজনৈতিক এই অস্থিরতায় ইউরোপের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ স্পেনের প্রবৃদ্ধির হার কমে আসবে বলে পূর্বাভাস বিশেষজ্ঞদের; সঙ্কটের প্রভাব পড়ছে অভিন্ন মুদ্রা ইউরোতেও। এই মাসের শুরুতে হওয়া গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে ৯০ শতাংশের রায় পড়ে বলে ভাষ্য কাতালান সরকারের। স্পেন সরকারের বিরোধিতা ও আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই গণভোটের আয়োজন করা হয়। যদিও ব্যাপক পুলিশি বাধার মুখে সেদিন ৪৩ শতাংশের বেশি ভোট জমা পড়েনি। ওই ফলাফলের ভিত্তিতেই গত সপ্তাহে কাতালান পার্লামেন্টে স্বাধীনতার ‘প্রতীকী ঘোষণা’ দেন পুজদেমন; মাদ্রিদের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখতে ঘোষণার কার্যকারিতা স্থগিত রাখারও আহ্বান জানান তিনি।

 

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী রাখয় স্বাধীনতার ঘোষণা বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান জানাতে এই সপ্তাহের সোমবার পর্যন্ত কাতালান নেতাকে সময় দেন । কাতালুনিয়ার অবস্থান যদি স্বাধীনতার পক্ষে হয়, তা হলে সিদ্ধান্ত বদলাতে দেওয়া হয় ‘আরও চারদিন’। সময়সীমার প্রথম অংশের প্রত্যুত্তরে সোমবার এক চিঠিতে পুজদেমন স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে স্পষ্ট কিছু না জানিয়ে পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে স্পেনের সঙ্গে আলোচনায় বসার ইচ্ছার কথা জানান। স্পেনিশ প্রধানমন্ত্রী ওই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলেন, কাতালান নেতার অবস্থান মাদ্রিদকে সংবিধানের ১৫৫ অনুচ্ছেদ চালুর কাছাকাছি ঠেলে দিয়েছে, যে অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পেন সরকার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের শাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

 

কাতালান সঙ্কটের জন্য মাসখানেক ধরেই একে অপরকে দায়ী করে আসছেন স্পেন ও কাতালুনিয়ার শীর্ষ দুই নেতা। দিন দিন তাদের অবস্থান আগের তুলনায় আরও কঠোর হয়েছে। অস্থিরতা কমাতে কোনো পক্ষকেই সুর নরম করতে দেখা যাচ্ছে না। রাখয় বলছেন, অবৈধ গণভোট আয়োজন ও সেটার ফলের ভিত্তিতে স্বাধীনতার প্রতীকী ঘোষণা দিয়ে একের পর এক আইন ভঙ্গ করে যাচ্ছে কাতালান সরকার। পুজদেমনের ভাষ্য, গণভোটের দিন মাদ্রিদের পাঠানোর পুলিশের সহিংস অবস্থান, আটক-গ্রেপ্তার এবং স্বাধীনতাপন্থি নেতাদের রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে কারাগারে পুরে স্পেন একটি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

 

স্পেন সরকার সংবিধানের ১৫৫ অনুচ্ছেদ চালু করলেও তা কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় আছে বিশ্লেষকদের মধ্যেও। ওই অনুচ্ছেদ চালু করে মাদ্রিদ কাতালুনিয়ার স্থানীয় প্রশাসনকে বরখাস্ত করে নতুন একটি প্রশাসন বসাতে পারবে; অর্থনীতি ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, ডাকতে পারবে নতুন নির্বাচনও। কিন্তু স্বাধীনতার প্রশ্নে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে দূর করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। কাতালান পার্লামেন্টের অনেক সদস্য সংবিধানের এই ব্যাখ্যার ব্যাপারেও প্রশ্ন তুলেছেন; যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, স্পেন ও কাতালুনিয়ার এই মুখোমুখি অবস্থান আরও অনেকদূর গড়াবে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ