ঢাকা, শুক্রবার 20 October 2017, ৫ কার্তিক ১৪২8, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মালিবাগ-মগবাজার উড়াল সেতুর উদ্বোধন ২৬ অক্টোবর

মৌচাক-মালিবাগ-শান্তিনগর উড়ালসড়কের একাংশ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর অন্যতম গুরত্বপূর্ণ স্থাপনা মালিবাগ-মগবাজার উড়াল সড়ক । দীর্ঘ যানজটের কবল থেকে নিস্তার দিতে এই উড়াল সড়ক প্রকল্পটি নির্মাণের কাজে হাত দেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর ( এলজিইডি )। কাজ শুরুর পর নগরবাসী যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে , তা দফায় দফায় প্রলম্বিত হওয়ার কারণে সেই স্বপ্ন ধুসর হয়ে পড়ে । এর মধ্যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নানা তালবাহানায় বাস্তবায়নকারী সংস্থার যোগসাজশে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে দফায় দফায় কাজের গতি কমিয়ে সময়ক্ষেপনের যে অজুহাত তোলা হয় , তাতে প্রকল্পটির আশপাশের বাসিন্দাসহ তৎসন্নিহিত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের মাত্রা বেড়েই চলে । তারপরও আগ্রহের কমতি ছিল না প্রকল্পটিকে ঘিরে স্বপ্ন দেখার । কবে এটির বাস্তবায়ন ঘটবে , যান চলাচল শুরু হবে তার জন্য ছিল অধীর আগ্রহ । অবশেষে যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলছে মগবাজার- মৌচাক-মালিবাগ সমন্বিত উড়ালসড়ক। আগামী ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই উড়ালসড়কের উদ্বোধন করবেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি এটির উদ্বোধন করবেন বলে এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও উড়াল সড়কটির প্রকল্পের পরিচালক সুশান্ত কুমার পাল নিশ্চিত করেছেন।

সরকার প্রধান সময় দেয়ার পর সার্বিক প্রস্তুতিও প্রায় শেষ করে এনেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। উড়াল সড়কের এখন চলছে ধোয়ামোছা, রঙ, বিদ্যুতের খুঁটি ও বাতি লাগানোর মতো শেষ পর্যায়ের কাজ। এছাড়া সমন্বিত এ উড়াল সড়কের নিচের সড়কের সংস্কার কাজও কোনো কোনো স্থানে শুরু হয়েছে। অনেক স্থানে শেষের পথে ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ( ডিএসসিসি ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: আসাদুজ্জামান গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘উড়ালসড়কের নিচের সড়ক ও ফুটপাতের সংস্কারকাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।’

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান , চার লেনের উড়ালসড়কটি ছয়টি মোড় অতিক্রম করেছে। এগুলো হলো সাতরাস্তা, বিএফডিসি, মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর ও মালিবাগ মোড়। এর মধ্যে মগবাজার, মালিবাগ ও কারওয়ান বাজারে রেললাইন অতিক্রম করেছে এই উড়ালসড়ক প্রকল্প।

ওই উড়ালসড়কটি তিন ভাগে করা হয়েছে। একটি অংশ সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল। এটা নির্মাণ করেছে নাভানা কনস্ট্রাকশন। গত বছরের মার্চ মাসে এ অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়।

গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর নিউ ইস্কাটন থেকে মৌচাক পর্যন্ত উড়ালসড়কের এক দিক খুলে দেয়া হয়। এই অংশ নির্মাণ করেছে তমা কনস্ট্রাকশন।

তৃতীয় ধাপে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) মোড় থেকে কারওয়ান বাজার অংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় গত ১৭ মে। এই অংশও তৈরি করেছে নাভানা কনস্ট্রাকশন।

এখন খুলে দেয়ার অপেক্ষায় আছে উড়ালসড়কের মৌচাক-মালিবাগ-শান্তিনগর-রাজারবাগ-মগবাজার অংশ। এটা নির্মাণ করেছে তমা কনস্ট্রাকশন।

এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দৈঘ্যের এই সমন্বিত উড়ালসড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর মধ্যে কয়েক দফায় প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয়।

প্রথমে এই প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরে নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যয় বাড়তে বাড়তে ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার অর্থায়ন করেছে ৪৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ৭৭৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা দিয়েছে সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি)।

  দেশে এখন পর্যন্ত যে কয়টি উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, তার মধ্যে মৌচাক-মালিবাগ উড়ালসড়কটি  দৈর্ঘ্যে দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে আছে ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়ক (গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী)।

শুরু থেকেই বারবার বাধা

দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তির সমাধানে রাজধানীতে উড়াল সড়ক নিমার্ণের উদ্যেগ নেয়া হয়। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি উড়াল সড়কের  নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সবচেয়ে বড় উড়াল সড়কটি নির্মাণ করা হয় গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী এলাকায়। এটির দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটার। এরপরই মগবাজার- মৌচাক ।

২০১১ সালের ৮ মার্চ একনেক এই প্রকল্প অনুমোদন করে। প্রথমে প্রকল্পের আকার ছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরে ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে এক হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা করা হয়। ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়।

২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ৯ কিলোমিটার লম্বা উড়াল সড়কটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। এটি ঢাকা শহরের স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের (এসটিপি) অন্তর্ভুক্ত। এটি রিখটার স্কেলে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে। প্রতিটি পিলার পাইলের গভীরতা প্রায় ৪০ মিটার গভীর। এই উড়াল সড়কটির আটটি মোড় যথাক্রমে- সাতরাস্তা, এফডিসি, মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর, মালিবাগ, চৌধুরীপাড়া ও রমনা থানা। মগবাজার, মালিবাগ ও সোনারগাঁসহ তিনটি রেলক্রসিং অতিক্রম করেছে।

চার লেনের এ উড়াল সড়কে ওঠানামার জন্য ১৫টি র‌্যাম্প রয়েছে। তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা, এফডিসি, মগবাজার, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, বাংলামটর, মগবাজার, মালিবাগ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং শান্তিনগর মোড়ে ওঠানামা করার ব্যবস্থা রয়েছে। 

নির্মাণ ব্যয় দু‘শ ৫৫ শতাংশ !

নির্মাণ ব্যয় দু‘শ ৫৫ শতাংশ বাড়িয়ে নজির স্থাপনকারী প্রকল্পের খাতায় নাম লিখিয়েছে “মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক ” প্রকল্পটি । স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) নেয়া এই প্রকল্পটির নির্মাণকাল দফায় দফায় বাড়িয়ে চার বছরে নিয়ে ঠেকানো হয়েছে । যদিও এই প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় শুরুতে ছিল ৩‘শ ৪৩ কোটি টাকা ও সময় ছিল দু‘বছর । কিন্তু তার কোনটাই নির্ধারিত না থেকে অনির্ধারিত একটি প্রকল্পে রুপ নেয়। যার কারণে এই প্রকল্পটি একদিকে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয় , অপরদিকে জনদুর্ভোগের মাত্রা বাড়ায় । শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পটির শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার পর এখন উদ্বোধনের অপেক্ষা । এর আগে সেটাও দফায় দফায় পরিবর্তনের পর এবার ২৬ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে তৃতীয় দফায । এর আগে দ্বিতীয় দফায়  চলতি মাসের ১৫ তারিখে এটির উদ্বোধনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করে রাখা হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসুস্থতার জন্য ওই তারিখ পেছানো হয় । এর আগে প্রথম দফায় ১০ সেপ্টেম্বর দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছিল । সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২৬ অক্টোবর উদ্বোধনের পরই যান চলাচলের জন্য উড়াল সড়কটি খুলে দেয়া হলে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গতা পাবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা ।

জনদুর্ভোগের জন্য বহু আলোচিত-সমালোচিত মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কের এ পর্যন্ত ৩ ধাপে প্রকল্পের ৩ অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু একমাত্র হলিফ্যামিলি থেকে সাত রাস্তা পর্যন্ত অংশ ছাড়া অন্য দুটি অংশে যান চলাচল কম।এ জন্য দায়ী করা হচ্ছে ডিজাইনের ত্রুটিকে। আশংকা করা হচ্ছে , এ উড়াল সড়কটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বাংলামোটর, সোনারগাঁও হোটেল এবং শান্তিনগরে বড় ধরনের যানজটের সৃষ্টি হবে।

জানা যায়, যানজট নিরসন করে ঢাকাবাসীর নির্বিঘœ চলাচল নিশ্চিত করতে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক প্রকল্প গ্রহণ করা হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে। আর প্রকল্পটি একনেক অনুমোদন করে ২০১১ সালের ৮ মার্চ। ৮ দশমিক ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট এ উড়াল সড়কের প্রথম নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৩৪৩ কোটি টাকা। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে নির্মাণ ব্যয় দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষ ব্যয় বৃদ্ধি করায় আকার দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৯ কোটি টাকায়। যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২৫৫ শতাংশ বেশি। কাজ শুরু করার পর কয়েকবার সংশোধন করা হয়েছে নকশাও। এ ছাড়া একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে কয়েক ধাপে বাস্তবায়নে উড়াল সড়কটির প্রকৃত সুফল থেকে নগরবাসী বঞ্চিত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। যদিও প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। এরপর প্রথম দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করতে না পারায় আবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উড়াল সড়কটির অবশিষ্টাংশ চালুরও ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কাজ শেষ না হওয়ায় সর্বশেষ তিন মাস সময় বাড়ানো হয়। প্রকল্প চলাকালীন সব মিলিয়ে সময় বেড়েছে প্রায় চার বছর।

অভিযোগে প্রকাশ , শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট ঠিকাদার আর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে বিভিন্ন ক্রটি সংশোধনের নামে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতি শুরু হয়। ফলে প্রকল্প এলাকায় দেখা দেয় ভয়াবহ জনদুর্ভোগ। এভাবে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক প্রকল্পে চার বছর সময় ও ২৫৫ শতাংশ ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। যা দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল উড়াল সড়ক বলে সমালোচিত হচ্ছে। বিপুল অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি ধীরগতির কাজের কারণে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হয়েছেন নগরবাসী। অসতর্ক উন্নয়ন কাজের কারণে কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণে মানুষ মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক প্রকল্পকে মানুষখেকো ফাঁদ হিসেবে অবহিত করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার এসব কান্ড সরকারকে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি করে। 

মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এলজিইডির তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুশান্ত কুমার পাল গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, উড়াল সড়কের সর্বশেষ কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য প্রকল্প এলাকা বিশেষভাবে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে রংও করা হচ্ছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী এখনও অসুস্থ । তাই ২৬ অক্টোবর গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এটির উদ্বোধন হচ্ছে । তারপর যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে। এর মাধ্যমেই পুরো উড়াল সড়কটির যাত্রা শুরু হবে ।

প্রকল্পটির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান ভুইয়া মানিক গতকাল জানান,সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২৬ অক্টোবর উদ্বোধন হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ