ঢাকা, শনিবার 21 October 2017, ৬ কার্তিক ১৪২8, ৩০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এক ঐতিহাসিক ঘটনা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : গত ১লা জুলাই, ২০১৭ মহাসমারোহে পালিত হয়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এসব অনুষ্ঠানের বিশিষ্টজনদের বক্তৃতা ভাষণে দেশের এই শ্রেষ্ঠতম বিদ্যাপীঠের ৯৬ বছরের নানা গৌরব-গাঁথা যেভাবে উঠে এসেছে, তা থেকে নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু জানতে পারবে নিঃসন্দেহে। তবে যে কঠিন প্রতিকূল পরিবেশে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের এই মহান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠনের সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল, সে ইতিহাসটা যদি নতুন প্রজন্ম জানতে পারত, তাতে তাদের উপকার হতো আরও অনেক বেশি। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত রয়েছে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উত্থান-পতনের বিভিন্ন অধ্যায়। আর যে জাতি তার ইতিহাসের খবর রাখে না, তার পথ চলা হয় অনেকটা অন্ধের পথ চলার মতোই। ইতিহাসকে যে জাতির দর্পন বলা হয়, তার কারণ এটাই।
১৭৫৭ সালে এক ঐতিহাসিক প্রতারণার মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতাসূর্য ছিনিয়ে নিয়েছিল সাতসমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে আসা সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা, একথা আমরা সবাই জানি। ইংরেজরা মুসলমান নবাব সিরাজউদ্দৌলার হাত থেকে শাসনক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল বলে তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল এ দেশে মুসলমানরা যেন আর সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে নব্য শাসকরা প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জমিদারী-আয়মাদারী,বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা-সংস্কৃতি সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে সুপরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের বাদ দিয়ে সেসব স্থানে ইংরেজ-অনুগত হিন্দুদের অধিষ্ঠিত করে। পলাশী বিপর্যয়ের মাত্র ৩৬ বছরের মধ্যে ইংরেজরা ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে নতুন ভূমি ব্যবস্থা প্রবর্তন করে ইংরেজ অনুগত এক নব্য জমিদারগোষ্ঠী গড়ে তোলে যার সিংহভাগই ছিল হিন্দু। এটা যে ছিল সাম্রাজ্যবাদের চির পরিচিত ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতিরই অপরিহার্য দিক, তা সেদিন বুঝতে পারেননি দেশের হিন্দু নেতৃবৃন্দের এক বড় অংশ। এর ফলে এক কালে যাদের মধ্যে দরিদ্র খুঁজে পাওয়া যেত না, সে মুসলমানদের পক্ষে সচ্ছল থাকাই অসম্ভব হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে পলাশী ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দেশে যে বিদেশী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তা একদিনের জন্যও মেনে নিতে পারেনি মুসলমানরা। তারা স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মজনু শাহের ফকির বিপ্লব, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, শরীয়তুল্লাহ দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন থেকে শুরু করে মহিশূরের টিপু সুলতান ও সৈয়দ আহমদ বেরলভীর জেহাদ আন্দোলন হয়ে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত এই একশ’ বছর ধরে মুসলমানরা ইংরেজবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম চালায়। কিন্তু উপমহাদেশের সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় এসব সংগ্রামের বিরোধিতা করায় সব সংগ্রামেই মুসলমানদের পরাজয় ঘটে। শেষ পর্যন্ত সিপাহী বিপ্লবেও মুসলমানদের পরাজয় ঘটলে হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, কবি ঈশ্বরগুপ্ত প্রমুখের লেখায় ইংরেজ স্তুতি ও মুসলিম স্বাধীনতাযোদ্ধাদের প্রতি ধিক্কারের প্রমাণ মেলে।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবেও মুসলমানদের পরাজয়ের পর বিধ্বস্ত মুসলিম সমাজের তদানীন্তন মুসলিম নেতারা সাময়িকভাবে হলেও হিন্দুদের মতো ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি অনুসরণের মাধ্যমে মুসলমানদের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত করে তুলতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশে এই সহযোগিতা যুগের শেষ নেতা ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। এই সহযোগিতা যুগের এক পর্যায়ে ১৯০৫ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে ঢাকায় রাজধানীসহ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামের একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। এতে দীর্ঘ অবহেলিত পূর্ববঙ্গের উন্নয়নের কিঞ্চিৎ সুযোগ সৃষ্টি হয়।
মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের জনগণের এই সামান্য উন্নতির সম্ভাবনাও বরদাস্ত করে উঠতে পারেননি সেকালের পূর্ববঙ্গের কলকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদাররা। তারা বঙ্গভঙ্গ রদ করার দাবিতে বিরাট আন্দোলন সৃষ্টি করে বসেন। দীর্ঘদিনের মিত্র হিন্দু নেতৃবৃন্দের এ অগ্নিশর্মা মূর্তি দেখে ইংরেজ শাসকরাও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে মাত্র ছয় বছরের মাথায় ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় কলকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্য বিধাতা’ হিসেবে অভিনন্দিত হন।
বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণায় কলকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদাররা খুশি হলেও মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বঙ্গের জনগণ বিশেষ করে তাদের তদানীন্তন অবিসংবাদিত নেতা নবাব সলিমুল্লাহ খুবই হতাশ ও বিক্ষুব্ধ হন। তাঁর এ ক্ষোভ প্রশমনের লক্ষ্যে ব্রিটিশ শাসকরা এবার তাঁর অন্যতম দাবি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। কিন্তু এ ঘোষণার বিরুদ্ধেও কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা জোর আন্দোলন শুরু করে দেন। কলকাতায় কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলে সেখানে সভাপতিত্ব করলেন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি।
খলের যেমন ছলের অভাব হয় না এসব কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদেরও ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে যুক্তির অভাব হয় না। বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতার সময় তাদের যুক্তি ছিল বঙ্গভঙ্গ দ্বারা নাকি বঙ্গমাতার অঙ্গছেদ করা হবে। আর এবার তাদের যুক্তি হলো : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে বাঙালি সংস্কৃতিকে নাকি দ্বিখন্ডিত করা হবে এবং শিক্ষার মানের অবনতি হবে। কিন্তু এর সঙ্গে তারা আর একটা যে যুক্তি দিলেন তাতে তাদের মনের আসল কথাটা প্রকাশ হয়ে পড়ল। তারা বললেন, পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান চাষাভুষা, তাই তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই!
তাদের এসব কুযুক্তিভিত্তিক আন্দোলন ও বিরোধিতার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা পিছিয়ে যায়। এই বিলম্বের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল স্বপ্নদ্রষ্টা নবাব সলিমুল্লাহকে এক বুক হতাশা ও বেদনা নিয়ে ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি এই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিতে হয়। অথচ তিনি অনেক আশা করে তার জমিদারী থেকে বিশাল ভূ-খন্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দান করে যান। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে নবাব সলিমুল্লাহর অকাল মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা আবার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ সময় নবাব সলিমুল্লাহর অন্যতম সহযোগী ধনবাড়ির জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে উদীয়মান জননেতা এ কে ফজলুল হকের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় পরিচালিত দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে সরকারের প্রতিশ্রুতি ঘোষণার এক দশক পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই তার যাত্রা শুরু করতে সমর্থ হয়।
এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যারা নানা খোঁড়া যুক্তিতে এর বিরোধিতা করেছিল তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়। ব্যবস্থা করা হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে আবাসিক এবং এর কোনও এফিলিয়েটিভ ক্ষমতা থাকবে না। অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের সব কলেজ ও স্কুল আগের মতোই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্বাধীন থাকবে। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন কলেজ ও স্কুল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি পায় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ১৯০৫ সালের বঙ্গবঙ্গ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা উভয় ঘটনাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় সৃষ্টি করে রেখেছে। এ কারণে এ দুটি ঘটনার গভীর আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ১৯০৫ সালের বঙ্গবঙ্গের বিরোধিতা করতে গিয়ে যারা এই ঘটনাকে বঙ্গমাতার অঙ্গব্যবচ্ছেদ বলে কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণ করেছিল পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে যে, তাদের এ যুক্তি ছিল ষোলআনাই প্রতারণা।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের প্রাক্কালে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বৃহত্তর বাংলা প্রতিষ্ঠার যে দাবি ওঠে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও শরৎচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে, তার প্রতি মুসলিম লীগ হাই কমান্ডের সমর্থন থাকলেও তার বিরোধিতায় মহাত্মা গান্ধী, পন্ডিত জওহরলাল নেহরু, সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল প্রমুখ অবাঙালি নেতাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ছিলেন অধিকাংশ বাঙালি হিন্দুনেতা। জাঁদরেল বাঙালি নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি তো তখন এমন ঘোষণাও দিয়েছিলেন যে, ভারত ভাগ না হলেও বাংলাকে ভাগ করতেই হবে।
যে বঙ্গভঙ্গকে ১৯০৫ সালে বাঙালি হিন্দু নেতৃবৃন্দ বঙ্গমাতার অঙ্গব্যবচ্ছেদ বলে তার তীব্র বিরোধিতায় আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন ১৯৪৭ সালে সেই বঙ্গমাতার অঙ্গ ব্যবচ্ছেদের দাবিতে তারা এভাবে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন কেন? শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যে ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ হতেই হবে বলে দাবি তোলেন তারই বা মাজেজা কী? তাঁর মতে, সাতচল্লিশে বঙ্গমাতার অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ না করলে বাঙালি হিন্দুরা নাকি চিরকালের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের গোলাম হয়ে পড়বে! অর্থাৎ বাঙালি জাতিসত্তা তাদের কাছে আর বড় কথা নয়, হিন্দুত্বই তাদের কাছে বড় কথা। এ লক্ষ্যেই বাঙালিত্বকে বিসর্জন দিয়ে অবাঙালি নেতৃত্বাধীন ভারতের অধীনতা স্বীকার করে নিতেও বাধেনি তাদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের বাহ্যিক যুক্তি ছিল এতে নাকি বাঙালি সংস্কৃতি বিভক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু ওইসব বাহ্যিক যুক্তির আড়ালে যেটি তাদের মনের আসল কথা ছিল তা হলো- পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান চাষাভুষা, তাই তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই! অর্থাৎ মুসলমানরা অশিক্ষিত চাষাভুষা আছে, তাই থাক, তাদের উচ্চশিক্ষার কোনও প্রয়োজন নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকে এক শ্রেণীর হিন্দু বুদ্ধিজীবী এত কুদৃষ্টিতে দেখতেন যে, ঢাকা শব্দটির তৎকালীন ইংরেজি উচ্চারণ উঅঈঈঅ-কে কেন্দ্র করে একে গঊঈঈঅ ইউনিভার্সিটি বলে উপহাস করতেন। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এর প্রথম দু’জন ভাইস চ্যান্সেলরই ছিলেন ইংরেজ এবং প্রথম চারজন ভাইস চ্যান্সেলরের মধ্যে মাত্র একজন (স্যার এএফ রহমান) ছিলেন মুসলমান। যেসব বিভাগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে তার সংখ্যা বার হলেও তার মধ্যে একমাত্র আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ ছাড়া অন্য কোনো বিভাগে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনার সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় বলে উপহাস করা যে কতটা ইসলাম বিদ্বেষের পরিচায়ক, তা নতুন করে ব্যাখ্যা করার অপেক্ষা রাখে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে কলকাতা কেন্দ্রিক যেসব বুদ্ধিজীবী অভিযোগ তুলেছিলেন যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলা সংস্কৃতি দ্বিখন্ডিত ও বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তাদের এ অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছে পরবর্তী কালের ইতিহাস। উনিশশ’ সাতচল্লিশে উপমহাদেশের সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয় যে আন্দোলনের ফলে, সে আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের ছিল ঐতিহাসিক ভূমিকা।
পরবর্তীকালে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার যে আন্দোলন শুরু হয় সে আন্দোলনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল অনন্য ভূমিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তরুণ অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগেই শুরু হয় ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। সে আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেন তাদের মধ্যে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন, ডক্টর নুরুল হক ভুইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শামসুল আলম, নঈমুদ্দিন আহমদ প্রমুখের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয়, ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ বেয়েই দেশে প্রথমে স্বায়ত্তশাসন ও পরে স্বাধিকার চেতনা জোরদার হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পশু বলে সে স্বাধিকার চেতনা ধ্বংস করে দেয়ার যে চেষ্টা চালানো হয় তার প্রতিবাদেই তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের ছাত্র-জনতা সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে ৯ মাসের মধ্যে সারা বিশ্বের মধ্যে একমাত্র বাঙালি শাসিত রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। এই সংগ্রামেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ছিল সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  ৯৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষে জাতীয় ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় অবদান যেমন আমাদের স্মরণ করতে হয় তেমনি যে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে এ ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠের উদ্যোক্তাদের  দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করতে হয়েছে তাও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন আমাদের জাতির ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি এক প্রতিকূল পরিবেশে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাও ছিল জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
-লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ