ঢাকা, শনিবার 21 October 2017, ৬ কার্তিক ১৪২8, ৩০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় মাদরাসা ছাত্রদের তাক লাগানো সাফল্য

শিক্ষাঙ্গন রিপোর্ট : এবারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় একটি মাদরাসা থেকেই ৮৪ জন ছাত্রছাত্রী চান্স পেয়েছেন। এ নিয়ে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিবেশ গরম হয়ে উঠেছে। অনেকে বলছেন, মাদরাসা থেকেও ঢাবিতে চান্স পায়? আবার অনেকে বলছেন ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় কবে থেকে আবার মাদরাসা এড হলো?
যারা এসব চিৎকার-চেঁচামেচি ছড়াচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার ছিল -
ব্রিটিশদের হাতে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মাদরাসাই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। শহীদ তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আলী, শওকত আলী, মাওলানা আকরম খাঁ, মওলানা ভাসানী, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের মতো সূর্যসন্তান তৈরি হয়েছিলেন মাদরাসা থেকেই।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদরাসার ছাত্র। বাবা মৌলভি মুহামদ ইয়াসিন খান সাহেবের কাছে গ্রহণ করা দীনী শিক্ষাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বুনিয়াদ। ব্রিটিশরা ভারতে এসে প্রথম যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিল, সেগুলোর অন্যতম ছিল মাদরাসা বন্ধ করা। মাদরাসা বন্ধ হয়নি, কিন্তু ব্রিটিশদের এ অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে।
বিগত ১০ বছরের ঢাবির ভর্তিযুদ্ধের মেধাতালিকার দিকে তাকালে দেখা যাবে, অধিকাংশ বছরই মাদরাসার ছাত্ররা প্রথম স্থানসহ অনেক শীর্ষস্থানই দখল করে রেখেছে।
২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ‘খ’ ইউনিটে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন মাদরাসার ছাত্র আবদুল খালেক। সে বছর মেধাতালিকায় থাকা প্রথম ১০ জনের চারজনই ছিলেন মাদরাসার ছাত্র। ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে প্রথম হন মাদরাসার ছাত্র আবদুল আলীম। দ্বিতীয় হন মাদরাসার ছাত্র সেলিমুল কাদের। তৃতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, দশম, ১৭তম ও ১৮তমও হন মাদরাসার ছাত্র। অন্যদিকে একই বছর ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটে প্রথম হন মাদ্রাসার ছাত্র এলিছ জাহান।
দ্বিতীয় হন মাদরাসার ছাত্র মিজানুল হক। চতুর্থ ও ১১তম হন মাদরাসার ছাত্র। ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে প্রথম স্থান অধিকার করেন মাদরাসার ছাত্র মাসরুর বিন আনসারী। একই বছর ‘ঘ’ ইউনিটে প্রথম হন মাদরাসার ছাত্র আসাদুজ্জামান। তা ছাড়া ‘খ’ ইউনিটে দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ১৬তম, ১৭তম ও ১৮তম হন মাদরাসার ছাত্র। একই বছর ‘ঘ’ ইউনিটে দ্বিতীয় হন মাদরাসার ছাত্র। ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাবির ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় আসনসংখ্যা ছিল দুই হাজার ২২১টি। এর বিপরীতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ৪০ হাজার ৫৬৫ জন ছাত্র। এর মধ্যে মাত্র তিন হাজার ৮৭৪ জন পাস করেন এবং প্রথম হন মাদরাসার ছাত্র আব্দুর রহমান মজুমদার। একই বছর তিনি ‘ঘ’ ইউনিটেও প্রথম হন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়ও তিনি সর্বাধিক নম্বর পেয়েছিলেন। সে বছর ঢাবির মেধাতালিকার প্রথম ১০ জনের তিনজনই মাদরাসার ছাত্র। যেখানে ৩৫ হাজার ২৮০ জন ছাত্র ফেল করেছেন, সেখানে প্রথম ১০ জনের তিনজনই মাদরাসার ছাত্র হওয়ার পরও কি এদের অযোগ্যই বিবেচনা করা হবে? আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, সে বছর ইংরেজিতে ১৫ নম্বর পাওয়ার শর্ত থাকলেও কলেজের মাত্র দুজন শিক্ষার্থী ১৫ পান অথচ আব্দুর রহমান মজুমদারের ইংরেজিতে প্রাপ্ত নম্বর ছিল ২৮.৫০। ‘ঘ’ ইউনিটেও বাংলা ও ইংরেজিতে আব্দুর রহমান মজুমদার ছিলেন শীর্ষে। বিজ্ঞান থেকে আসা কলেজ শিক্ষার্থীদের ইংরেজির সর্বোচ্চ নম্বর যেখানে ২২.৫০, সেখানে আব্দুর রহমানের ইংরেজির নম্বর ছিল ২৮.৫০। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের তিনজনেরই ইংরেজির নম্বর ছিল ১৫-এর ওপর। তবু তাঁরা পছন্দের বিভাগ পাননি।
দুর্বলদের জন্য কোটা চালু করা হয়। কিন্তু (২০১৪ সাল পর্যন্ত) ১০০ নম্বরের বাংলা ও ইংরেজি পড়ার কারণে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজিতে দুর্বল হিসেবে অভিহিত করে তাঁদের জন্য কোটা চালু না করে  আরও কঠিন করে ২০১৫ সাল থেকে দাখিল (মাধ্যমিক) ও আলিমে (উচ্চমাধ্যমিক) ২০০ নম্বরের বাংলা ও ২০০ নম্বরের ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা হলো। অনেকের ধারণা ছিল, এতে মাদরাসার ছাত্ররা ঢাবির ভর্তিযুদ্ধে হেরে যাবেন। তাঁদের জন্য কঠিন করে দেয়ার পরও থেমে নেই অগ্রযাত্রা। হেরে যাওয়ার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায়ও (পাসের হার ৯.৯৮ হওয়া সত্ত্বেও) ‘ঘ’ ইউনিটে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম হন মাদরাসা শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন। একই ইউনিটে মানবিক শাখা থেকেও প্রথম হন আরেক মাদরাসারছাত্র আব্দুস সামাদ। ‘খ’ ইউনিটে দ্বিতীয় হন মাদরাসার ছাত্র  রিজাত হোসেন।
সর্বশেষ ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষেও ঢাবির ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় শীর্ষস্থানটি মাদরাসা ছাত্রের দখলেই। তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ছাত্র আব্দুল্লাহ মজুমদার মেধাতালিকায় প্রথম হন। পাসের হার যেখানে মাত্র ১১.৪৩ শতাংশ, সেখানে প্রথম হওয়ার পরও শুধু ‘মাদরাসার ছাত্র’ হওয়ায় তাঁকে বঞ্চিত করা হয়।
এবারে খ ইউনিটে যে ৮৪ জন ছাত্র চান্স পান তারা সবাই তামিরুল মিল্লাত মাদরাসার ছাত্রছাত্রী। তামিরুল মিল্লাত মাদরাসার মোট চারটি শাখা, মেইন শাখাটি হল ঢাকার যাত্রাবাড়ি। দ্বিতীয় শাখাটি টঙ্গিতে। একই স্থানে রয়েছে মহিলা শাখাও। ঢাকার মাতুয়াইলে রয়েছে ঢাকা শাখার মহিলা শাখা।
প্রতিবছরই এদের রেজাল্ট মন কেড়ে নেবার মতো। বেশিরভাগ সময়েই শতভাগ পাসের রেকর্ড রয়েছে এ মাদরাসাটির।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ