ঢাকা, শনিবার 21 October 2017, ৬ কার্তিক ১৪২8, ৩০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কার্তিকেও আবহাওয়ার বর্ষার আচরণ ॥ শীতের আমেজ

সাদেকুর রহমান : কার্তিক মাসের পঞ্চম দিনে রাজধানীবাসী এক রকম বৃষ্টিবন্দী জীবন কাটিয়েছে। হেমন্ত ঋতুর শুরুর দিক হলেও আবহাওয়ার আচরণ বর্ষা মওসুমের মতো। সূর্যের দেখা মেলেনি। সারাদিনই মাঝারি থেকে অতি ভারী বর্ষণ হয়েছে। আর বৃষ্টি মানেই দেশের প্রধান কেন্দ্র নগরীর রাস্তা-ঘাট, অলি-গলি ডুবে যাওয়া। আগের দিন বৃহস্পতিবার থেকে টানা বৃষ্টিতে গতকাল শুক্রবার অনেকটাই থমকে যায় নাগরিক জীবন। রাজপথে যানবাহন কম থাকায় দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে চাকরিপ্রার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ  দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। বৃষ্টির এই ধারা আজ শনিবারও অব্যাহত থাকবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ আভাস দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, স্থল নিম্নচাপে রূপ নিয়ে নিম্নচাপটি গতকাল সকালে ভারতের ওড়িশ্যা রাজ্য ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান করছিল। এটি উত্তর উত্তরপূর্ব দিকে এগিয়ে এসে দুর্বল হয়ে  যেতে পারে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এ জন্য চট্টগ্রাম, মংলা, পায়রা ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর ও  নৌবন্দরগুলোকে ২ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌযানগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে একদিকে বর্ষার আবহ, অন্যদিকে শীতের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। আশ্বিণ মাস থেকেই গা শিন শিন করার কথা থাকলেও কার্তিকে এসেও ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছিল। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ বৃষ্টিতে শীতের আগমন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।
ভারী বৃষ্টির কারণ সম্পর্কে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের অধিক্য বিরাজ করছে এবং গভীর সঞ্চলনশীল মেঘমালা তৈরি অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় ঢাকায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৯৫ মিলিমিটার। একই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে গোপালগঞ্জে ১৪৩ মিলিমিটার। এছাড়া হাতিয়া ১১৩, বরিশাল ১০৩, পটুয়াখালী ১০২, খুলনা ১১১, মংলা ৯৮, সাতক্ষরিা ৯৫ ও যশোরে ৯৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হওেয়ছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও দিনভর বৃষ্টির কারণে ভোগান্তিতে পড়েন রাজধানীবাসী। ফলে কর্মব্যস্ত নাগরিকদের দুর্ভোগের যেন অন্ত নেই। পাশাপাশি যানবাহন সংকটেও গন্তব্য পৌঁছাতে গুণতে হচ্ছে বেশি ভাড়া।
ভারী বর্ষণের কারণে সার্কিট হাউজ রোড, সিদ্ধেশ্বরী এলাকা, বনানী থেকে মহাখালী সড়ক, রামপুরা, মালিবাগ, চৌধুরীপাড়া, মিরপুর, আগারগাঁও, তালতলা, বিজয়সরণি, কাকরাইল মোড় থেকে পল্টন মোড়, মতিঝিল, ফকিরেরপুল, ফার্মগেট, খামারবাড়ি সহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রধান ও সংযোগ সড়কগুলোতে পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও ড্রেনের পানি রাস্তায় এসে জমে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের কারণে কাটাকাটি, খোড়াখুড়িতে বিভিন্ন মহল্লায়ও পানি জমে গিয়ে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বৈরি আবহাওয়ায় খুব বেশি জনমানুষ রাস্তায় বের হয়নি। তবে প্রয়োজনের তাগিদে যারা বের হচ্ছেন তাদেরকে পড়তে হয়েছে সীমাহীন বিড়ম্বনায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় রাস্তায় যানবাহন চলাচল ছিল একেবারেই কম। বৃষ্টিতে রাস্তায় রিকশা, সিএনজি চালিত অটোরিকশাও পাওয়া যায়নি। আর দু’একটি পাওয়া গেলেও ভাড়া হাকান দ্বিগুণেরও বেশি।
সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টির কারণে আইসিটি এক্সপোতে দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল অনেক কম। ছুটির দিনটিতে যারা ভেবে ছিলেন পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে বের হবেন তারা শেষ পর্যন্ত বাসা থেকে বের হতে পারেননি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীজুড়ে অঝোর ধারায় থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। চলন্ত পথচারীরা আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে বিভিন্ন দোকানপাট ও পাশে থাকা সিএনজি পাম্পে।
নিম্নচাপের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট এবং এসব এলাকার চর ও দ্বীপগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১ থেকে ২ ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে ডুবে যেতে পারে। দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, কুমিল্লার ওপর দক্ষিণপূর্ব অথবা পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান জ্ঞান রঞ্জন শীল জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত থেকে মাওয়া-শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ডাম্প ফেরি চলাচল বন্ধ।
বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, মাওয়ায় শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ী নৌপথে চলা ১৬টি ফেরির মধ্যে ১০টি বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্য ফেরিগুলোও ধীর গতিতে চলছে। গতকাল দুপুর থেকে এ নৌপথে লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রয়েছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটেও ফেরিগুলো চলছে ধীরগতিতে।
ঢাকার সদরঘাটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন জানিয়েছেন, ছোট লঞ্চগুলোর চলাচল গতকাল সকাল থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পরে দুপুর থেকে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। হাতিয়া ও রাঙাবালি নৌপথে চলাচল বন্ধ থাকবে। পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এদিকে বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে থেমে থেমে চলা এই বৃষ্টি আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত ঝরবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। তবে আগামীকাল রোববার বৃষ্টি কমে আসবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দেশের সব সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, নিম্নচাপের কারণে উপকূলীয় এলাকায় সাগর উত্তাল রয়েছে। সেই সঙ্গে ঝড়ো বাতাস বইছে। এসব এলাকায় নৌযানগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান গতকাল গণমাধ্যমকে জানান, নিম্নচাপের কারণে আজ ও আগামীকাল সারাদেশে বৃষ্টি থাকবে। আর সন্ধ্যার পর থেমে থেমে বৃষ্টি হবে। তবে আজ মধ্যরাত থেকে আবারো টানা বৃষ্টি হবে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টির এই ধারা অব্যাহত থাকবে। এ সময়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
এটিই মওসুমের শেষ বৃষ্টি কি না জানতে চাইলে আব্দুল মান্নান জানান, এটিই শেষ বৃষ্টি না। কারণ অক্টোবর-নবেম্বর মাসে বড় ধরণের ঘূর্ণিঝড় হয়। সেজন্য বৃষ্টি আরও হবে। বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসের সম্ভাবনা আছে কিনা জানাতে চাইলে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে স্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে। তাই সেখানে পাহাড় ধসের কোনো সম্ভাবনা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ