ঢাকা, রোববার 22 October 2017, ৭ কার্তিক ১৪২8, ১ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সড়কে কমছে না মৃত্যুর মিছিল

ইবরাহীম খলিল : প্রতিদিনই ১০ থেকে ১২ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনা পরিবারের জন্য কান্না হিসেবে সামনে আসে। ঝলমলে আনন্দময় সংসারে নেমে আসছে অন্ধকার। কিন্তু সড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিরাপদ সড়ক, ত্রুটিযুক্ত যানবাহন, সড়কে চলাচলকারীদের অসাবধানতা এবং গাড়িচালকদের বেপরোয়াভাব, অনভিজ্ঞতা ও অজ্ঞতার মতো কারণগুলোর সবই সমাধান সম্ভব। এ জন্য অনেক নতুন আইন করতে হবে না। দরকার শুধু যে আইন রয়েছে তার যথাযথ প্রয়োগ। যে আইনগুলো আছে সেগুলোর সঠিক প্রয়োগে কমিয়ে আনতে পারে সড়ক দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর মিছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে  ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু সেই অঙ্গিকার পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ২৪৮ দিনে মারা গেছেন ২ হাজার ২২৩ জন। গড়ে দিনে মারা যাচ্ছেন প্রায় ১০ জন।

অবশ্য পুলিশের হিসেবে সেই সংখ্যা কিছুটা কম। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী  ১১৪ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২ জন। আবার সেতু মন্ত্রী কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন বিভিন্ন সংস্থা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হয়।   

প্রসঙ্গত, গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত তাঁর স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর  দিনটিকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালন করে আসছিলেন বহু বছর ধরে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। 

কিন্তু এই ঘোষণা সড়কপথে মানুষের যাত্রা নিরাপদ করবে কি না, তা নির্ভর করছে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে সরকার কী কী কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, তার ওপর। 

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২ হাজার ৩৭৬ জন। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা ২১ হাজারের বেশি। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দুর্ঘটনার মূলে রয়েছে যানবাহনের অত্যধিক গতি, চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও সড়কের কাঠামোগত দুর্বলতা যানবাহনে প্রশিক্ষিত চালক নিয়োগ, সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক কমিয়ে আনা যেত। 

এনসিপিএসআরআর এক জরিপে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের হিসাব মতে, দশ বছরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ৫০,৬২৭ জন নিহত হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৪,৭১৬টি। আহত হয়েছেন ৮২,১৫২ জন। এ হিসাব ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। প্রতিবেদনের বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪৫৯২টি। এতে নিহতের সংখ্যা ৬৮২৩ জন। আর আহতের সংখ্যা ১৪০২৬ জন। ২০১৪ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৫৯৯৭টি। নিহতের সংখ্যা ৮৭৯৮ জন আর আহতের সংখ্যা ১৮১১৩ জন। ২০১৩ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪৭৫৬টি। ওই বছর নিহতের সংখ্যা ছিল ৬৮১৩ জন। আহতের সংখ্যা ১১৫২৮ জন। ২০১২ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪৮১৭টি। নিহতের সংখ্যা ৫৯৫৪ জন আর আহতের সংখ্যা ছিল ১২৯০৮ জন। ২০১১ সালে দুর্ঘটনার সংখা ৪৯৫৯টি। নিহতের সংখ্যা ৫৯২৮ জন, আহতের সংখ্যা ১১৪৩০। ২০১০ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩১০৭টি। নিহতের সংখ্যা ছিল ২৬৪৬ জন আর আহতের সংখ্যা ছিল ১৮০৩ জন। ২০০৯ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩০৫৬ জন। নিহতের সংখ্যা ছিল ২৯৫৮ জন, আহতের সংখ্যা ৩৪৫৬ জন। ২০০৮ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪৮৬৯টি। নিহতের সংখ্যা ৩৭৬৫ জন আর আহতের সংখ্যা ছিল ৩২৩৩ জন। ২০০৭ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪৭৬৯টি। নিহতের সংখ্যা ৩৭৪৯ জন, আহতের সংখ্যা ছিল ৩২৩৭ জন। ২০০৬ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩৭৯৪টি। নিহতের সংখ্যা ৩১৯৩ জন আর আহতের সংখ্যা ছিল ২৪০৯ জন।

 প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সারাদেশে ২,০৮২টি দুর্ঘটনায় ৩১১ শিশু ও ৩০১ নারীসহ ২,২৪৫ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ৬,০৩১ জন। এনসিপিএসআরআরের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০১৪ সালে। নিহত এবং আহতের সংখ্যার দিক দিয়েও গত এক দশকে ওই বছর ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের ওপর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অব্যাহত চাপও কোনো কাজে আসছে না। এক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলো বড় বাধা।

২০১১ সালের ১৩ই আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা নামক স্থানে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক ও এটিএন নিউজের প্রধান সম্পাদক আশফাক মুনীর (মিশুক মুনীর)। সে সময় কিছুদিন এ নিয়ে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও ক’দিন পর আর থাকে না। সে সময় সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের শাস্তি বাড়ানোর দাবি উঠেছিল। এরপর অবশ্য ক্রটিপূর্ণ যানবাহন ও জাল ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও এক সময় এসে তা ঝিমিয়ে পড়ে। এছাড়া মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অনেক বাঁক চিহ্নিত করে সংস্কারও করা হয়। কোথাও কোথাও সতর্কীকরণ সংকেতও টানিয়ে দেয়া হয়। এত কিছুর পরও সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। 

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসের জন্য ক’টি প্রস্তাব করা হয়। এরমধ্যে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে গঠনমূলক সংবাদ পর, দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে সামাজিক সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও জাল ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিরুদ্ধে অব্যাহত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা ও পুলিশের দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়। এগুলোর কিছু কিছু বাস্তবায়ন হলেও সড়ক দুর্ঘটনা থামছে না থামছে না মৃত্যুর মিছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ