ঢাকা, রোববার 22 October 2017, ৭ কার্তিক ১৪২8, ১ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অস্ট্রেলিয়ার গহীন মরুতে ১৮ শতকের বাংলা পুঁথি উদ্ধার

সেই প্রাচীন পুঁথি

২১ অক্টোবর, বিবিসি : অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলের প্রায় ৫০০ কিলোমিটার গহীন মরুভূমিতে বেশ কয়েক বছর আগে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল একটি প্রাচীন গ্রন্থ। পবিত্র কোরআন শরিফ মনে করে গ্রন্থটি সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। কিন্তু একজন অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশি গবেষক সেখানে গিয়ে দেখতে পান এটি আসলে বাংলা ভাষায় লেখা শত বছরেরও আগের একটি পুঁথি। গবেষক ড. সামিয়া খাতুন এই গবেষণার সূত্র ধরে বিশ শতকের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ায় তৎকালীন বাংলা এবং ভারতবর্ষ থেকে মানুষের অভিবাসনের চমকপ্রদ এক ইতিহাসের সন্ধান পেয়েছেন। এ নিয়ে তার একটি বই শিগগিরই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে লন্ডন থেকে।ড. সামিয়া খাতুন বলেন, ইতিহাসের বইতে যখন তিনি পবিত্র কোরআনের ওই কপিটির কথা পড়েন তখন তিনি তা দেখতে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। তার ভাষায়, ‘পাঁচশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বইটি খুঁজে বের করার পর খুলে দেখি সেটি কোরআন নয়, বাংলা কবিতা’।ড. খাতুন তার গবেষণায় দেখেছেন, বহু জাহাজি সে সময় ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। উটের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিল বহু বাঙালি। অনেক বাঙালি সে সময় আয়ার কাজ করতে সেখানে গিয়েছিলেন বলেও উঠে এসেছে তার গবেষণায়। তিনি বলছেন, এরা সে সময় অস্ট্রেলিয়ার গহীন দুর্গম মরু অঞ্চলে কাজ করতে গিয়েছিলেন। প্রথমে লেখাটি ছাপা হয়েছিল ১৮৬১ সালে। পরে এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে কয়েক বার পুর্নমুদ্রিত হয়ে যে কপিটি আমার হাতে আসে সেটি ১৮৯৫ সালে ছাপা। ড. খাতুন এসব মানুষের কাজ ও বসতির সূত্র ধরে অস্ট্রেলিয়ার ব্রোকেনহিল শহরে তাদের প্রথম অভিবাসী হয়ে আসার আগ্রহব্যঞ্জক তথ্য পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এদের অনেকে উট নিয়ে কাজ করতে করতে সেখানে চলে গিয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি লোক জাহাজে কাজ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিলেন। এরপর যে কোনও একটা কাজ জুটিয়ে নিয়ে মরুভূমি এলাকায় বা অস্ট্রেলিয়ার গহীন অঞ্চলে পৌঁছে যান।’ড. খাতুন বলছেন, সেখানে যে মসজিদগুলো ছিল এই লোকেরা সেই মসজিদগুলোতে ঈদের সময় জড়ো হতেন। এভাবেই ব্রোকেনহিলসহ আশপাশের দুর্গম এলাকাগুলোয় তখন বাঙালিদের একটা বসতি গড়ে উঠে। আঠারো এবং উনিশ শতকে বিশ্বজুড়ে একটা ব্যাপক অভিবাসনের ইতিহাস রয়েছে। দুনিয়ার নানা প্রান্তের মানুষ সে সময় নানা জায়গায় গিয়ে বসতি গড়ে তুলেছেন। ওই সময়ে অস্ট্রেলিয়াতেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি বলছেন, এই বাঙালি অভিবাসীরা তখন অস্ট্রেলিয়ার গহীন এলাকায় পুঁথিপাঠ করতেন। এই বইয়ে যে বাংলা কবিতাগুলো রয়েছে; সেগুলো গান করে অন্যদের পড়ে শোনানো হতো। যেমনটা প্রাচীনকালে পুঁথিপাঠের ধারা ছিল। এ থেকে বোঝা যায়, ওই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে বাঙালিদের মধ্যে পুঁথি পাঠের সংস্কৃতি চালু ছিল।ড. খাতুনের গবেষণায় উঠে এসেছে, অস্ট্রেলিয়ায় ওই সময় একটা বড়সড় বাঙালি জনগোষ্ঠী ছিল বলেই এই পুঁথিপাঠের চর্চা গড়ে উঠেছিল। এছাড়া অন্য দেশ থেকে সেখানে যাওয়া অনেক মানুষ সেই পুঁথিপাঠ শুনতে আসতেন যারা বাঙালি ছিলেন না।
তাদের জন্য অনুবাদ করে এইসব কবিতা শোনানো হতো। সে সময় যেসব বাঙালি ওই দুর্গম অঞ্চলে বসতি করেছিলেন তাদের বংশধররা এখনও আছেন।সে সময় স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে এ রকম অনেক বাঙালির বিয়ে হয়েছিল। তারা অবশ্যই তখন ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে যাওয়া বাঙালি ছিলেন। ফলে তাদের বংশধরদের এখন পাওয়া যায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে। যেহেতু ওই বাঙালিদের মধ্যে অনেক মিশ্র বিয়ের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। ড. সামিয়া খাতুন বলছেন, সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই মিশ্র বিয়ের কারণে ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষায় ঢুকে গেছে বহু বাংলা শব্দ। যেমন চাপাটি শব্দকে ওরা বলে জাপাটি, ট্যাংক হয়ে গেছে টাংকি- এ রকম বহু শব্দ রয়েছে। তারপর উট নিয়ে যেহেতু তারা কাজ করতেন, তাই উটকে তারা উট বলে।তিনি বলছেন, সে সময় যে মসজিদগুলো সেখানে ছিল সেগুলোর কয়েকটা ধ্বংস হয়ে গেলেও কয়েকটা এখনও টিকে আছে। ওই মরু এলাকা খুবই শুষ্ক হওয়ার কারণে যেগুলো টিকে আছে সেগুলোর ভেতরে ‘সবকিছু এখনও খুব ভালভাবেই টিকে আছে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ