ঢাকা, রোববার 22 October 2017, ৭ কার্তিক ১৪২8, ১ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দরিদ্র মানুষ যেন বনসাই গাছ

শুধু কথায় কাজ হয় না, এ কথা আমরা জানি। আসলে সাফল্যের জন্য ভাল কথার দরকার, দরকার ভাল কাজেরও। অর্থাৎ সমন্বয়েই সাফল্য। এ কথা মেনে নেওয়ার পরও বলতে হয়, কথার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। ভাল কথা শুনতে ভাল লাগে, ভাল কথার ভাল প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান সময়ে আমরা ভাল কথা কতটা শুনতে পাই। এক জায়গায় বসলে আমরা পরচর্চা করি, গীবত করি। এতে ব্যক্তি, সমাজ বা পরিবারের কোনো কল্যাণ নেই। বরং ইহকাল ও পরকালে আছে মন্দ পরিণাম। রাজনৈতিক অঙ্গনতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গন, দায়িত্ববান অঙ্গন। কিন্তু এই অঙ্গনে এখন ভাল কথা কতটা শুনতে পাওয়া যায়? ব্লেমগেম এবং গালাগাল এখন এই অঙ্গনের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। এক সময় এমন ছিল যে, মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনতো। তাঁদের বক্তব্যে বিষয় থাকতো, জ্ঞান থাকতো, সুন্দর ভাষা থাকতো, রসবোধ থাকতো এবং থাকতো যথার্থ পথনির্দেশিকা। শোনার মতো বিষয় থাকতো বলেই মানুষ তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতো। কিন্তু এখন মানুষের আর সেই আগ্রহ নেই। এর কারণ রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের অধঃপতন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অবস্থা তো আরো ভয়াবহ। বড়-বড় দেশের নেতারা এখন আর হুমকি-ধমকি দিয়ে ক্ষান্ত থাকেন না, মাস্তানদের মতো পরস্পরকে খারাপ ভাষায় গালাগালও করেন। আর বর্তমান সভ্যতায় তাদের আচার-আচরণ এতটাই ধ্বংসাত্মক যে, মজলুম মানুষ দাপুটে নেতাদের এখন আর মানুষ নয়, দানব ভাবেন। তাই বিশ্ব-নেতাদের দানবীয় ভাষণ শোনার ব্যাপারে মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রাগ্রসর বর্তমান সময়ের বহু আগে অশিক্ষিত গ্রামীণ সমাজে মানুষের মুখে-মুখে বচন-প্রবচনের যে প্রচলন ছিল, তা এখনও মানুষকে আকৃষ্ট করে। বিষয় ও মর্মগুণেই এর শ্রেষ্ঠত্ব। অথচ বড়-বড় পন্ডিতরা নন, অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণ মানুষের মুখে মুখেই রচিত হয়েছে বচন-প্রবচন। প্রসঙ্গত এখানে খনার বচনের কথা উল্লেখ করা যায়। যেমন ‘কলা রুয়ে না কেট পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।’ অভিজ্ঞতালবদ্ধ এমন বচনে মানুষের জন্য রয়েছে শুধু কল্যাণ এবং কল্যাণ। তাই বলা চলে সুবচন সর্বসময়ের জন্যই কল্যাণকর এবং কাম্যও বটে।
অতীতের মত এখনও ‘সুবচন’ খুবই প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। এখনও মানুষ যে ভাল কথা একেবারে বলে না তা কিন্তু নয়। ভাল কথা এখনও মানুষ শোনে। এমন চিত্র থেকে উপলব্ধি করা যায়, মানুষের সমাজে সুবচনের চাহিদা রয়েছে। প্রসঙ্গত এখানে সাম্প্রতিক সময়ের একটি ‘সুবচনের’ কথা উল্লেখ করতে চাই। শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রতি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’। ওই সাক্ষাৎকারে পত্রিকাটির সাংবাদিক ডেভিড বর্নস্টেইনকে ড. ইউনূস বলেন, ‘দারিদ্র্য দরিদ্র মানুষদের দ্বারা সৃষ্ট হয়নি, আমরা যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছি এটা তারই ফসল।’ তিনি আরও বলেন, ‘দরিদ্র মানুষ হচ্ছে বনসাই গাছের মতো। আপনি বনের সবচেয়ে বড় গাছটার সবচেয়ে ভালো বীজটা নিলেন, কিন্তু আপনি যদি এটা ফুলের টবে রেখে বড় করতে যান তাহলে এর উচ্চতা হবে মাত্র এক মিটার। দোষ বীজের নয়। সমস্যা হচ্ছে পাত্রের আয়তনের। সমাজ দরিদ্র মানুষকে অন্য সবার মতো বেড়ে ওঠার ভিত্তিটা দেয় না। মূল সমস্যাটা এখানেই নিহিত।’ আমরা মনে করি, এমন সুবচন বর্তমান সময়ে খুবই প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ সবসময়ই ভালো কথার প্রয়োজন রয়েছে এবং তা গুরুত্বপূর্ণও বটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ