ঢাকা, রোববার 22 October 2017, ৭ কার্তিক ১৪২8, ১ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানুষ বিশ্বাস করবে কার কথা? আইনমন্ত্রী? না হাই কমিশনারের?

এই সরকারের একটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল এই যে তারা নিজেরাই সব সময় একটা না একটা ইস্যু সৃষ্টি করবে। তারপর সেই ইস্যু নিয়ে বিরোধী দলকে কয়েক দিন ব্যস্ত রাখবে। বিরোধী দল যখন সেই ইস্যু নিয়ে কিছুটা উত্তাপ সৃষ্টি করতে সমর্থ হবে ঠিক তখনই আরেকটি নতুন ইস্যুর সৃষ্টি করবে, যাতে করে আগের ইস্যুটি আর গরম হতে না পারে এবং পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে। বিগত প্রায় ৯ বছর হলো সরকার এই কৌশলটি এস্তেমাল করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এসেছিল চীফ জাস্টিস এস কে সিনহা ইস্যু। তবে এই ইস্যুটি উত্তপ্ত হতে না হতেই এসে পড়ে রোহিঙ্গা মুসলমান ইস্যু। অবশ্য রোহিঙ্গা ইস্যুটি সরকার সৃষ্টি করেনি। বরং এই ইস্যুটি সরকারে ঘাড়ে চেপে বসেছে। সরকার তো প্রথমে রোহিঙ্গাদেরকে ঘাড়ে উঠতেই দেয়নি। বরং দরজা থেকে তারা অনেক দূরে থাকতেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐ যে কবিতায় একটি লাইন আছে, ‘এই যৌবন জল তরঙ্গ রুধিবে কি দিয়া বালির বাঁধ’? বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল যৌবন জল তরঙ্গ না হলেও ছিল অপ্রতিরোধ্য। সুতরাং এই সরকার তাদেরকে আসতে দিতে না চাইলেও প্রবল জোয়ারকে ঠ্যাকাতে পারেনি। অন্যদিকে মুসলিম জাহান থেকে মিয়ানমারে সামরিক জান্তা এবং সু চির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা এবং রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগত নিধন এবং গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের সোচ্চার আওয়াজের কারণে সরকার সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়। এই দুটি ফ্যাক্টর ছাড়াও আর যে ফ্যাক্টরটি বিশেষভাবে কাজ করেছে সেটি হলো, রোহিঙ্গারা মুসলমান আর বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। সুতরাং বাংলাদেশের মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ দাবি করেছে যে তাদের রোহিঙ্গা মুসলিম ভাইদের ওপর বর্মীরা যে বর্বরোচিত জুলুম চালাচ্ছে সেটা তারা ভাগাভাগি করবে। জনগনের এই অনুভূতি এবং আওয়াজ টের পেয়েও সরকার সীমান্ত খুলে দেয়।
সরকারের কৌশলের কাছে জাস্টিস সিনহার ইস্যুটি অন্যান্য বারের মত মার খাবে এবং মরে যাবে সেটি যেন না হয় সে জন্য এই ইস্যু নিয়ে এখনও লেখার দরকার আছে বলে আমি অনুভব করছি। আর রোহিঙ্গা ইস্যুটি এত তাড়াতাড়ি ডেড হচ্ছে না। কারণ এই ইস্যুটি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার যত না সোচ্চার, তার চেয়ে বেশি সোচ্চার বিশ্ব সম্প্রদায়, বিশেষ করে, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ইরান, জর্ডান, জাতিসংঘের মহাসচিব, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রভৃতি দেশ ও সংস্থা। তাই প্রথমে ঠিক করেছিলাম যে জাস্টিস সিনহা ইস্যুতে এই সপ্তাহে আর কিছু লিখবো না। কিন্তু দেখলাম, আমরা লিখতে না চাইলে কি হবে, সরকারই এমন সব উল্টা পাল্টা কথা বলা শুরু করেছে যে আমরা লিখতে বাধ্য হচ্ছি। তাদের সর্বশেষ পরস্পর বিরোধী কথা বার্তার তিনটি উদাহরণ দিচ্ছি।
॥দুই॥
গত ১৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সাবেক আইন মন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু এমপি বলেছেন যে, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার কাজে আর ফিরতে পারবেন না। তিনি বলেন, বিচারক যদি কখনও বিতর্কিত হন, দুর্নীতির অভিযোগ থাকে, ওনার সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করতে হয়। অন্যান্য বিচারপতির কাছে  বিচারপতি এসকে সিনহা বলেছেন- উনি রিজাইন করবেন। রিজাইন করার পরিবর্তে উনি একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে চলে গেলেন। আবার এসে চেয়ারে বসতে চাচ্ছেন। অন্য বিচারপতিরা বলেছেন, আমরা ওনার সঙ্গে আর বসব না। ওনার আসার আর সুযোগ নেই। আমার মনে হয় এটি সুদূরপরাহত।
বৃহস্পতিবার রাতে চ্যানেল আই টেলিভিশনে প্রচারিত ‘বিবিসি প্রবাহ’ অনুষ্ঠানে মতিন খসরু এসব কথা বলেন। বিবিসির ঐ অনুষ্ঠানে আরো বলা হয়, অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে এক লিখিত বিবৃতিতে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, বিচার বিভাগ যাতে ‘কলুষিত’ না হয় সে জন্য তিনি ‘সাময়িকভাবে’ দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতির’ গুরুতর অভিযোগ তোলেন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মতিন খসরু।
প্রবাহ অনুষ্ঠানে খসরু দাবি করেন, সিনহার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকে পাঁচ কোটি-১০ কোটি টাকার লেনদেন- এটি কোত্থেকে হল? কিন্তু প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তা হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হল না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে খসরু বলেন, আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সময় চলে যায়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেকেই মনে করে, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী রায়ের মাধ্যমে বাতিল করে দেয়ার কারণে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ওপর সরকার অসন্তুষ্ট ছিল। তবে খসরু দাবি করেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের সঙ্গে সিনহার ছুটির কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ ষোড়শ সংশোধনীর রায় প্রধান বিচারপতি একা দেননি।
অন্যদিকে এ্যাটর্নী জেনারেল এ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত করতে কোনো বাধা নেই। গত বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। এ্যাটর্নী জেনারেল বলেন, অপরাধ যদি কেউ করেন, তিনি সাংবিধানিক পদে থাকার পরেও তার বিরুদ্ধে তদন্তচলতে কোনো বাধা নেই বলে আমি মনে করি।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বিচারপতিরা যেভাবে তার সাথে এক বেঞ্চে বসতে অস্বীকার করেছেন এর পর চীফ জাস্টিসের গদিতে এস কে সিনহার প্রত্যাবর্তন সম্ভব বলে মনে হয় না। অন্যদিকে আপিল বিভাগে বর্তমানে যে ৫ জন বিচারপতি কর্মরত রয়েছেন তারা বলেছেন যে চীফ জাস্টিস এস কে সিনহার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১১ দফা অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তারা এক বেঞ্চে তার সাথে বসবেন না। সুতরাং আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে এটি ধরে নেওয়াই স্বাভাবিক যে বিচারপতি হিসেবে সিনহা বাবুর আয়ু শেষ।
কিন্তু এর মধ্যে একজন উচ্চ পদস্থ সরকারি অফিসার ফাটিয়েছেন একটি বোম্ব শেল। তার নাম সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী। তিনি বর্তমানে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। গত ১৬ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যখনই দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত হবেন, তখনই নিতে পারবেন। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তিনি যদি কাল সকালে আবার দায়িত্ব নিতে চান আমার ধারণা, তাতে কোনও সমস্যা হবে না।’ আইনমন্ত্রী যা বলেছেন তার থেকে হাইকমিশনার মোয়াজ্জেম আলীর সুর ভিন্ন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সরকার প্রধান বিচারপতিকে তার পদ থেকে হটিয়ে দিয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। আসলে বিষয়টি তেমন নয়।
তিনি বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই প্রধান বিচারপতি নিজের অসুস্থতার কথা বলছিলেন। তবে হ্যাঁ, সরকারের সঙ্গে কোনও কোনও বিষয় নিয়ে সম্প্রতি তার সংঘাত হয়েছে, এটা সত্যি। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। কাল সকালে প্রধান বিচারপতি যদি ফিরে এসে আবার দায়িত্ব নিতে চান, আমি নিশ্চিত, আদালত তাকে আবার গ্রহণ করে নেবে। তিনি নির্দিষ্ট কয়েকটা দিনের জন্য ছুটির আবেদন করেছেন। ছুটি শেষে ফিরে তিনি যেকোনও সময়ই আবার যোগ দিতে পারেন।’
তবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছুটিতে যাওয়ার ঘটনাকে ভারতে কোনও কোনও সংবাদ মাধ্যম যেভাবে ‘বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু প্রধান বিচারপতির হেনস্থা’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, তার জবাব দিতেই রাষ্ট্রদূত এভাবে গোটা ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
হাইকমিশনার আরও বলেন, ‘এই সমস্যার সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কোনও যোগ নেই। ইনশাল্লাহ, প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সমস্যা আমরা ঠিকই মিটিয়ে ফেলবো। কিন্তু বাংলাদেশে আসা সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর সমস্যা কিভাবে মেটানো যায়, সেটাই আসলে এখন আমাদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা।’
॥তিন॥
প্রিয় পাঠক, সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের চার ব্যক্তির বক্তব্য আমরা ওপরে তুলে ধরলাম। এখন আপনারাই বলুন, মানুষ বিশ্বাস করবে কার কথা? আমি এখনও মনে করি প্রধান বিচারপতি হিসেবে সিনহা বাবুর আয়ু শেষ। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোয়াজ্জেম সাহেব এগুলো বললেন কেন? এগুলো কি বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য? যদি তাই হয় তাহলে আইন মন্ত্রী এবং এ্যাটর্নী জেনারেল যা বলছেন সেগুলো কার বক্তব্য? আমার দ্ব্যর্থহীন মত এই যে, যেহেতু ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক্সটার্নাল ফ্যাক্টর, তাই যেভাবেই হোক, ভারতকে গুড হিউমারে রাখা দরকার। ভারত বিদেশ নীতিতে আগ্রাসী, এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু দেশের মধ্যে তাদের ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, জনমতের কণ্ঠ রোধ তারা করে না বরং জনমতের বেশ কিছুটা গুরুত্ব কেন্দ্রীয় সরকার দেয়। ভারতের এক শ্রেণীর প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া জাস্টিস সিনহার এই ধরণের বিদায়কে সহজ ভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। এটি নিয়ে সেখানে তীর্যক মন্তব্য চলছে। এছাড়া এখানে একটি ধর্মীয় আস্তরণ লাগানো হয়েছে। তাই তাদেরকে প্যাসিফাই করার জন্য হাইকমিশনার মোয়াজ্জেম আলী ঐ বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু কঠিন বাস্তব কি? আসুন, সেটি দেখা যাক।
আপনাদের হয়তো মনে আছে যে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আওয়ামী লীগ যখন সিনহা বাবুর বিরুদ্ধে সাঁড়াশী আক্রমণ চালায় তখন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সামসুদ্দিন মানিক বলেন যে এস কে সিনহা শুধু ছুটিই নেবেন না, তিনি দেশ ত্যাগে বাধ্য হবেন। মানিকের কথা ১০০ ভাগ ফলে গেছে। আর ফলবে নাই বা কেন? তিনি তো আওয়ামী লীগের খুবই ঘনিষ্ঠ। তিনি ক্ষমতার করিডোরের কত কাছের লোক সেটি দেখুন।
মানিক সাহেবকে যখন হাই কোর্ট বিভাগের জজ থেকে আপিল বিভাগের জজ পদে প্রমোশন দেওয়া হয় তখন তিনি হাই কোর্ট বিভাগে জ্যেষ্ঠতার ক্রম অনুসারে ছিলেন ৪০ নম্বরে। তাই হাই কোর্টের ৩৯ জন বিচারপতিকে ডিঙ্গিয়ে সামসুদ্দিন মানিক কে আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। আরো আছে অনেক প্রশ্ন। সেগুলো আলোচনা করতে গেলে আরেকটি কলাম লিখতে হবে। তবে আজকে শুধু একটি প্রশ্ন দিয়ে এই কলাম শেষ করতে চাই। সেটি হলো, যার বিরুদ্ধে ১১টি গুরুতর অভিযোগ আছে, যেসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কোটি কোটি টাকার উৎকোচ গ্রহণ, অর্থ পাচার এবং নৈতিক স্খলন, তেমন একজন অপরাধীকে (তাদের ভাষায়) বিদেশ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো কেন? যদি তর্কের ছলে ধরাও হয় যে তিনি এই সব দোষে দোষী তাহলে তার মত এমন একজন অপরাধীকে (সরকারি মহলের ভাষায়) কেন বিদেশ যেতে দেওয়া হলো? তাহলে সরকারও কি ঐসব অপরাধের পরোক্ষ সাক্ষি গোপাল হলো না? কে বা কারা এর জন্য দায়ী? আবার অন্যদিকে তদন্তে যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন তাহলে নির্ধারিত সময়ের ৪ মাস আগেই তার বিচারপতির ক্যারিয়ার খতম করা হলো কেন? কে বা কারা এর জন্য দায়ী?
কোন সরকারই চিরস্থায়ী নয়। এসব প্রশ্নের জবাব এক দিন না একদিন দিতেই হবে।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ