ঢাকা, রোববার 22 October 2017, ৭ কার্তিক ১৪২8, ১ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হাতেম আলীর সোনার ছেলে

শরীফ আব্দুল গোফরান : মধুমতী নদী। এই নদীর তীরে ছায়া ঘেরা, পাখি ডাকা সবুজ একটি গ্রাম। নাম তার মাঝআইল। এই গ্রামেরই একটি শিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারের সদস্য ছিলেন খান সাহেব সৈয়দ হাতেম আলী। ব্রিটিশ আমল থেকেই সৈয়দ পরিবারের সুনাম সবার মুখে মুখে। তখন সবাই এই পরিবারের লোকদের সম্মান করতো। ইংরেজি জাঁদরেল কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি হিন্দু ব্রাহ্মণরাও এই পরিবারের লোকদের সম্মান করতো।
খান সাহেব সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন একজন প্রতাপশালী পুলিশ ইন্সপেক্টর। তিনি খুবই সৎ ছিলেন। একবার ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর দুর্নীতি ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বিদ্রোহের কারণে তার উপর নেমে আসে সরকারি রোষানল। কিন্তু তার সততা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রমাণ পেয়ে ইংরেজ সরকার শেষ পর্যন্ত তাকে ‘খান সাহেব’ উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয়।
হাতেম আলীর স্ত্রীর নাম বেগম রওশন আখতার। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষিত ও রুচিশীল ভদ্র মহিলা।
১৯১৮ সালের ১০ জুন। রমজান মাসের প্রথম চাঁদের দিন। সারা দুনিয়ার মুসলমানদের জন্য একটি পবিত্র মাস। পুকুর পাড়ে ছেলে- মেয়েদের চিৎকার- চাঁদ উঠেছে, চাঁদ উঠেছে। আজ রাতেই সেহ্রী খেয়ে রোজা রাখতে হবে।
চারদিকে সন্ধ্যা নেমে আসছে। সৈয়দ বাড়ীর দহলিজে বড়রা মেতে উঠেছেন রমজানের খোশ আলাপে। এদিকে বড়রা ঘরে ঘরে বউ-ঝিদের ডেকে বলছে, কই গো তোমরা, শুনছো, চাঁদ দেখা গেছে। আজই সেহ্রী খেতে হবে। কত আনন্দ সবার মনে! রোজা রাখার জন্য সব প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ থেকে ঘরের ছোট শিশুটিও পিছিয়ে নেই।
তার মনেও অনেক ভাবনা। সেও সেহ্রী খাবে, রোজা রাখবে। কিন্তু আম্মু যদি রাতে না ডাকে? তাই তো সে পণ করেছে, রাতে আর ঘুমাবে না। আম্মু এসে বলছেন, আব্বুু ঘুমিয়ে পড়, সেহ্রীর সময় তোমাকে ডাকবো। সে কি আনন্দ!
অনেক রাত। বাড়ির বউ-ঝিরা সেহ্রী আয়োজন করছে। চারদিকে টুংটাং শব্দ। ছোট শিশুরাও জেগে বসে আছে। ওরাও আজ আব্বু-আম্মুর সাথে সেহরী খাবে। কাল রোজা রাখবে।
সারাদিন সিয়াম সাধনার পর এক সময় যখন ইফতারের সময় হবে, তখন টুপি মাথায় দিয়ে বড়দের সাথে বসে ইফতার খাবে, কী মজা!
ঠিক এ দিনই হাতেম আলীর ঘরে এলো চাঁদের ন্যায় একটি শিশু। খুব সুন্দর। রমজানের চাঁদের আলোর সাথে মিশে গিয়ে যেন এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। তার আলোতে পুরো মাঝআইল গ্রাম যেন আলোকিত হয়ে গেছে। দাদী তো খুশিতে আটখানা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে খুশির খবর। সবার মুখে একই কথা, হাতেম আলীর ঘরে নতুন মেহমান এসেছে। আত্মীয়-স্বজন সবাই খুশিতে উল্লাস করতে লাগলো। যথাসময়ে খান সাহেবের কাছে সংবাদ পৌঁছানো হলো। কন্যার পর দ্বিতীয় পুত্রের জন্ম সংবাদ পেয়ে তিনি যেন আত্মহারা হয়ে পড়েন। জায়নামাজ বিছিয়ে দুই রাকায়াত শুকরিয়া নামাজ পড়লেন।
নতুন অতিথি আর তার মাকে নিয়ে ঘরের বউ-ঝিরা সবাই ব্যস্ত। রাতটা যে কিভাবে কেটে গেল কেউ টেরই পেলো না। বাড়ির ছোট-বড় সবাই খোকা খোকা বলে কত আদর করে। বিছানায় একটুও পিঠ ঠেকে না তার। সারা দিন সবার কোলে। চুমুতে চুমুতে ভরে যায় তার গাল। দাদী তো ভেবেই পাচ্ছেন না কি করবেন। সাত দিন পর মৌলানা ডাক নাম রাখবেন।
কিন্তু কি নাম রাখবেন? দাদীর দেরী সহ্যই হলো না। তিনি নাম রেখেই দিলেন। রমজান মাসে জন্ম বলে তিনি আদুরে নাতীর নাম রাখলেন রমজান।
একে একে সাত দিন পার হয়ে গেল। আত্মীয়-স্বজন মেহমানে বাড়ির আঙিনা মুখরিত ধুমধামে চলে আদর-আপ্যায়ন। এবার রমজানের আসল নাম রাখার পালা। বাবাই নাম ঠিক করলেন। নাম রাখা হলো ফররুখ আহমদ। ফররুখ অর্থ হলো সৌভাগ্যবান। আর পিতা-মাতার সৌভাগ্যের ধনই তো হলো আমাদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ।
নয়নের দুলাল ফররুখ পিতা-মাতার আশার আলো। ফুটফুটে চাঁদের মতো ছেলেকে কোলে নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ ভাবনার অন্ত নেই। তাদের ভাবনা এই ছেলে একদিন বড় হয়ে দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করবে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তার নাম। সবাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে তাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ