ঢাকা, রোববার 22 October 2017, ৭ কার্তিক ১৪২8, ১ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তিন বন্ধুর ত্রাণ বিতরণ

হোসেন মোতালেব : নিয়াজ, নোমান, নওশাদ তিন বন্ধু। তিন জনই একই স্কুলে একই শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। কত আর হবে বয়স বার কিংবা তের। তাদের মধ্যে খুবই দহরম মহরম সম্পর্ক তিন জনই মেধাবী ও আদর্শ ছাত্র। ভালোর সাথে ভালোর সম্পর্ক এটা নাকি ছাত্রদের স্বভাব সুলভ বিষয়। তাছাড়া তিন জনের নামের প্রথম অক্ষরও একই বর্ণ দিয়ে শুরু। এটাও নাকি তাদের ঘনিষ্ট বন্ধুত্বের একটা নিয়ামক। ভালো ছাত্ররা নাকি যে কোন ভালো কাজ করতে আগ্রহী ও সাচ্ছন্দ বোধ করে। এ গল্পটি তারই জাজ্জল্যমান প্রমাণ। ওরা কখনো স্কুলে অনুস্থিত থাকেনা। এ জন্য গত বছর ক্লাসের সর্বোচ্চ উপস্থিতির পুরষ্কার পেয়েছিল ওরা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রতি দিনই অ্যাসেম্বিলি ক্লাসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থী দেরকে দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। ছাত্র-ছাত্রীরাও তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে থাকে আর এ জন্য অন্য স্কুল থেকে এ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা শিষ্টাচার আদব কায়দা তাহজীব তামাদ্দন বিষয়ে অনেকটাই ব্যতিক্রম। শুধু তাই নয়,স্কুলের ফলাফলও অত্যন্ত সন্তোষজনক। স্কুলটি কয়েক বার জেলার শ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে। প্রধান শিক্ষক তার চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী অ্যাসেম্বিলি ক্লাসে উদ্ভোত নতুন সমস্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করলেন। তিনি নিজে যেমন মানবতাবাদী শিক্ষার্থীদেরকেও মানবতাবোধে উজ্জীবিত করতে রোহিঙ্গা বিষয়ে হৃদয় বিদারক ও লোমহর্ষক কিছু ঘটনা বর্ণনা করলেন। যা শুনে কোন শিক্ষার্থী চোখের পানি না ফেলে থাকতে পারেনি। তিনি শিক্ষার্থী দেরকে যার যার সাধ্যমত জামা কাপড়, ঘটিবাটি, টাকা-পয়সা রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য দান করতে আহবান জানান। এ ছাড়া বর্মী বাহিনীর অত্যাচার থেকে রক্ষার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করারও পরামর্শ দেন। স্যারের অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রদত্ত ভাষনে  উজ্জীবিত হয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের জামা-কাপড়, ঘটিবাটি, ইত্যাদি দিতে থাকে রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য। কেউ কেউ আবার টিফিনের নাস্তার টাকা হতে এক টাকা, দু’টাকা, পাঁচ টাকা, দশ টাকা করে জমা দেয়। কিন্তু নিয়াজ নোমান ও নওশাদ ভাবতে থাকে কি করা যায় ওদের জন্য। ক্লাস সেভেনের ছাত্র, কিইবা করার আছে ওদের। হ্যাঁ আছে ভাল ছাত্রদের ভাল দৃষ্টিভঙ্গি থাকাই স্বাভাবিক। আর এ জন্য ওরা তিন বন্ধু বছরের শুরু থেকে ওদের টিফিনের টাকা হতে দু টাকা, পাঁচ টাকা করে জমা করতে থাকে। বছর শেষে তিন জনের জমানো টাকা একটা জনহিতকর কাজে ব্যায় করবে ওরা, এমনটিই ইচ্ছা ওদের। আর সেটা হতে পারে যে কোন জনহিতকর কাজ। তাছাড়া স্কুলের মৌলভী শিক্ষক একদিন ক্লাসে বলে  ছিলেন মানুষের মৃত্যুর পর তার সকল আমলের দরোজা বন্ধু হয়ে যায়। শুধুমাত্র তিনটি আমল ব্যতীত। তার মধ্যে অন্যতম একটি হল যদি কেউ জন কল্যাণকর কাজ করে তার প্রতিফল সে মৃত্যুর পরেও পেয়ে থাকে। স্যারের এ বক্তব্যটি ওদের কে দারুন ভাবে উদ্বুদ্ধ করে। তাই বছরের শুরু থেকে ওরা নাস্তার টাকা থেকে কিছু কিছু করে জমাতে থাকে। তিন জন ভাবে বছর শেষে আমরা হয়তোবা কোননা কোন একটা জন কল্যাণকর কাজ করবো। সে কাজটা নাহয় এখনই করে ফেলি। ওরা ভাবে এখন সব চাইতে  জন কল্যাণকর কাজ হবে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করা। তাই তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত নিল তাদের সঞ্চিত অর্থ একত্র করে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করবে।  নিয়াজ স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে। তার চেহারায় বিষণœতার ছাপ। মাকে কিছু না জানিয়ে অতি সন্তর্পণে ভেঙে ফেলে মাটির ব্যাংকটি। গুনে দেখে তাতে বেশ টাকা হয়েছে। তার মনে আনন্দ আর ধরে না। একই ভাবে নোমান তার পড়ার কক্ষের বাঁশের খুঁটি কেটে তৈরিকৃত ব্যাংকের টাকাগুলো বের করে দেখে তাতেও অনেকগুলো টাকা হয়েছে। অনুরূপ নওশাদেরও ছিল একটি আম আকৃতির মাটির ব্যাংক। যাতে সেও জমিয়েছে অনেকগুলো টাকা।
সব মিলে তিন জনের অনেক গুলো টাকা হল। সাথে অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের টাকা এবং অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে রওয়ানা হলো রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের দিকে। প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে  ত্রাণ বিতরণ করতে থাকে ওরা আর শরণার্থী শিবিরে ঘুরে ঘুরে তাদের হালহকিকতও জানতে থাকে। ওদের বয়সী অনেক ছেলে মেয়ের সাথে কথা হয় ওদের। যারা ওদের মত স্কুলে পড়াশোনা করে। জানতে পারে ওদের উপর বর্মী সেনাদের নির্মম অত্যচারের করুন কাহিনী। যার বর্ণনা দিতে গিয়ে ভাষাহীন কান্নায় ফেটে পরে ওরা। ওদের চোখের সামনেই ঘর বাড়ি সহ পুরো গ্রাম দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দেয়, নিজের মা বাবা ভাই বোনকে করে হত্যা।
শিশুদেরকে নাড়িভুঁড়ি বের করে আছড়িয়ে আছড়িয়ে মেরে ফেলে দেয় নদীতে। কাউকে গুলি করার পর নড়াচড়া করলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। রেহাই পায়নি গর্ভবতী নারীরাও। এহেন অনেক লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা শুনে ওদের কোমল হৃদয় সত্যিই ব্যথিত হয়ে উঠে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ