ঢাকা, সোমবার 23 October 2017, ৮ কার্তিক ১৪২8, ২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দুর্বল মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ইবরাহীম খলিল : টেকসই মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর দায় শিকার করেছেন সংশ্লিষ্টারও। তারা বলছেন, বড় বড় শহরগুলোতে অতিরিক্ত জনসংখ্যা হওয়া এই ঝুঁকি বাড়ছে। গতকাল রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সেমিনারে এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন স্বীকার করেছেন যে, বড় শহরগুলোর জন্য মেডিকেল বর্জ্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছেন, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় এক হাজার সাতশ’ বিশেষায়িত ও সাধারণ হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেডিকেল কলেজ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এ মেডিকেল বর্জ্য মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপদজনক। আমরা এ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করছি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বায়োসেফটিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, একটি স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন একটি স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ।
দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিটি করিডোরে রাখা কালো রঙের ডাস্টবিন। হলুদ বা অন্য রঙেরও রাখা আছে কোথাও কোথাও। বর্জ্যের ধরণ অনুযায়ী তা নির্দিষ্ট রঙের ডাস্টবিনে ফেলার কথা। কিন্তু ব্যবহৃত সুচ, সিরিঞ্জ কিংবা রক্তমাখা তুলা সবই ফেলা হচ্ছে একই ডাস্টবিনে। আলাদা করার ব্যবস্থা নেই গজ, ব্যান্ডেজ, ওষুধের শিশি, ব্যবহৃত স্যালাইন কিংবা রক্তের ব্যাগও। জীবাণুমুক্ত না করেই কঠিন এসব চিকিৎসা বর্জ্য চলে যাচ্ছে সাধারণ বর্জ্যে ভাগাড়ে। আর পরিশোধন ছাড়াই নালা-নর্দমা হয়ে তরল বর্জ্য মিশছে নদীতে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নয়, হাতেগোনা কয়েকটি বাদে রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একই অবস্থা। তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার তো নেই-ই, নেই কঠিন বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থাও। পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তার বালাই নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা ত্রুটির কারণে এসব চিকিৎসা বর্জ্য বিষিয়ে তুলছে পরিবেশ। খাদ্য চক্রের মাধ্যমে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করছে; জনস্বাস্থ্যের জন্য যা মারাত্মক ঝুঁকি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কঠিন ও তরল দুই ভাগে ভাগ করা হয় চিকিৎসা বর্জ্যকে। কঠিন বর্র্জ্যরে তালিকায় রয়েছে- ব্যবহৃত সুচ, সিরিঞ্জ, রক্ত ও পুঁজযুক্ত তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, টিউমার, ওষুধের বোতল, ব্যবহৃত স্যালাইন ও রক্তের ব্যাগ। তরল বর্জ্যের তালিকায় রয়েছে রোগীর শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বর্জ্য আলাদা করে ফেলার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। সাধারণ বর্জ্যরে মতো হাসপাতালের বর্জ্যও ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপন্ন ৯২ শতাংশ বর্জ্যই এভাবে রাস্তার পাশের খোলা ডাস্টবিন, নর্দমা কিংবা সংলগ্ন নদীতে ফেলা হচ্ছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ৫০ টন আসছে হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে। আর এ বর্জ্যরে মাত্র ৮ শতাংশ রয়েছে যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েস্ট কনসার্নের গবেষণা থেকে জানা গেছে, ২০০৭ সালে সারাদেশে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপন্ন বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ১২ হাজার টনের বেশি। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১৯ হাজার টন। ২০১৭ সাল নাগাদ উৎপন্ন বর্জ্যে পরিমাণ সাড়ে ২১ হাজার টন ছাড়িয়ে যাবে।
এখনই এসব বর্জ্যরে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করলে আগামীতে রোগ প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, চিকিৎসা বর্জ্যরে ঝুঁকির বিষয়টি সারা বিশ্বেই রয়েছে। তবে উন্নত দেশগুলো যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ বিধিমালায় চিকিৎসা বর্জ্য সংরক্ষণ ও অপসারণের জন্য পাত্র ও তার রঙ নির্দিষ্ট করে দেয়া রয়েছে। সাধারণ বর্জ্যের জন্য কালো, ক্ষতিকারক বর্জ্যের জন্য হলুদ, ধারাল বর্জ্যরে জন্য লাল, তরল বর্জ্যরে জন্য নীল, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে জন্য সিলভার ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ বর্জ্যরে জন্য সবুজ রঙের পাত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, দেশের সব হাসপাতালে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক। তবে দেশের মাত্র চারটি বেসরকারি হাসপাতালে ইটিপি রয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলো হলো- বারডেম, অ্যাপোলো, স্কয়ার ও ইউনাইটেড।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ প্রচার, নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগের অভাব ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে চিকিৎসা বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হচ্ছে না। জীবাণুমুক্ত ও পরিশোধন না করেই যেখানে-সেখানে চিকিৎসা বর্জ্য ফেলছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। পরে তা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। বিস্তার ঘটাচ্ছে হেপাটাইটিস বি, সি, ডিপথেরিয়ার মতো বিভিন্ন রোগের।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষের পাশাপাশি রোগীদের মধ্যেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পরিবেশ অধিদফতরকে এগিয়ে আসতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ