ঢাকা, সোমবার 23 October 2017, ৮ কার্তিক ১৪২8, ২ সফর ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ব্ল্যাঙ্ক পেপারে দস্তখত ও ছবি নিচ্ছে কথিত তদন্ত টীম!

কামাল হোসেন আজাদ ও শাহনেওয়াজ জিল্লু, কক্সবাজার : উত্তর আরাকানে গত দুই মাস ধরে চলা রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর অব্যাহত সেনাবাহিনীর বর্বরতার লোক দেখানো তদন্ত করছে সেনা কর্তৃপক্ষ। অপরাধী নিজেই অপরাধের তদন্ত করাটা হাস্যকর হলেও, গত বৃহস্পতিবার থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। তদন্তের প্রথম দিনে তথ্যদাতা রোহিঙ্গা মুসলিমদের কাছ থেকে ব্ল্যাঙ্ক পেপারে (সাদা কাগজ) দস্তখত ও তাদের ছবি তুলে নিয়েছে সাদা পোশাকধারী সৈন্যরা।

সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বুথিদং উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে বিভিন্ন বয়সের পাঁচজন করে রোহিঙ্গাকে উপজেলা অফিসে ডেকে নেয়া হয়। এরপর তাদের কাছে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। রোহিঙ্গারা নির্ভয়ে তাদের সাথে যা ঘটেছে তা তুলে ধরে।

রোহিঙ্গারা বলেন, “সেনাবাহিনী আমাদের স্বজনদের হত্যা করেছে, আমাদের মা-বোন ও মেয়েকে ধর্ষণ করছে, ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করছে। লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশ চলে গেছে”।

তদন্ত টীম বিশেষভাবে জানতে চান, তোমাদের জাতিগোষ্ঠীর নাম কি? এর উত্তরে রোহিঙ্গারা বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠি’।

তথ্যদাতাদের বর্ণনা দিয়ে সূত্র আরো জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা যেসব তথ্য তুলে ধরেছে, তদন্ত টীমের সদস্যরা তা লিপিবদ্ধ করেনি। কিন্তু কয়েকটি সাদা কাগজে প্রত্যেকের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়েছে তারা। পরে তথ্যদাতা রোহিঙ্গাদের পৃথক পৃথক ছবি তুলে নেয়।

সূত্র আরো জানিয়েছে, তথ্যদাতাদের কোন প্রকার জোর জবরদস্তি, হুমকি ধামকি ও মিথ্যা বলতে বাধ্য করেনি। 

এ ব্যাপারে বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কথিত তদন্ত করে সেনা কর্তৃপক্ষ পার পেতে চাইছেন। সেনাবাহিনীর অপরাধ তদন্ত করছে সেনাবাহিনী নিজেই। এর ফলাফল কি হবে তা কারো অজানা নয়।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকালে সেনাবাহিনী ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ মেনে চলেছে কিনা তা তদন্তে গত সপ্তাহে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আয়ে উইনের নেতৃত্বাধীন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং।

বুথিদং ছেড়ে গেছে অর্ধ-লক্ষাধিক রোহিঙ্গা

এদিকে অব্যাহত সেনা নির্যাতন থেকে বাঁচতে রাজ্যের বুথিদং উপজেলা থেকে আরোও অর্ধ-লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাংলাদেশের দিকে রওয়ানা দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। প্রায় দুই মাস যাবত মগসেনা-রাখাইন ও বিজিপির ত্রিমুখী নির্যাতন মুখবুজে সহ্য করেও, কোন সুরাহা না হওয়ায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে তাদের স্বাভাবিক জনজীবন। ক্রমশ নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনিশ্চিত ভবিষ্যত দেখে বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে আসছে তারা।

সূত্র জানিয়েছে, বুথিদং এর নারাইংশং, কেপ্রুদং, লাবাদক, তংবাজার, থাম্মিংশং, বুজরাংশং, মগনামা, কোয়াইনডং, জাদীপাড়া, মিনগিছি প্রভৃতি ইউনিয়নের ২৩ টি রোহিঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা একেবারে গ্রামশূন্য করে আশ্রয়ের সন্ধানে ঘর বাড়ি ছেড়েছে। অবশ্য এর আগেও ওসব গ্রাম থেকে অনেকে বাংলাদেশ চলে আসে।

সূত্র আরো জানিয়েছে, গত সপ্তাহ পাঁচেক ধরে এসব গ্রামের রোহিঙ্গাদের অবরুদ্ধ রাখা হয়। তাদের চলাচল বন্ধ কওে দেয়া হয়। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়। প্রশাসনের লোকজন রোহিঙ্গাদের আটক ও আটক পরবর্তী ২ শতাধিক যুবককে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু এসব ঘটনায় কোন নালিশ দেয়ার মতো দপ্তর রোহিঙ্গাদের জন্য নেই। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফলপ্রসূ কোন পদক্ষেপ নিবে এমন প্রত্যাশাও বিফলে যাওয়ায় আশাহত হয়ে ভিটেমাটি ছাড়তে শুরু করছে থেকে যাওয়া বাদবাকী রোহিঙ্গারাও।

সরেজমিন খোজ নিয়ে দেখা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের আনজুমান পাড়া পয়েন্ট দিয়ে একদিনেই ৭০ হাজারের মত রোহিঙ্গা এরপূর্বে আশ্রয়ের আশায় প্রবেশ করেছে। আরো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকতে কুয়ান্সিবং সীমান্তে অপেক্ষা করছে। আশ্রয় সন্ধানী এসব রোহিঙ্গার মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশী। ১৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯ থেকে সকাল ৭ টা পর্যন্ত ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয়ের আশায় প্রবেশ করেছে। ১৬ তারিখ প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করে বাংলাদেশ সীমান্তে। বর্তমানে আরোও ২০ সহ¯্রাধিক রোহিঙ্গা আনজুমানের উত্তর পাড়া সীমান্তে অর্থাৎ নাফ নদীর বেড়ী বাঁধে অবস্থান করছেন।

এদিকে টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ সীমান্ত দিয়েও রাতে নৌকা যোগে প্রায় দেড় হাজারের অধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। এদেও বেশির ভাগ বুথিদং ও রাথিদং এর বাসিন্দা।

এছাড়াও গত রোববার রাতে নাফ নদী পার হতে গিয়ে সাগরের মোহনায় আবারো নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। নৌকা ডুবির ঘটনায় ১৩ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে । মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন স্থানীয়রা। এঘটনায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ২১ জনকে। এঘটনায় আরো অন্তত ২৫জন রোহিঙ্গা নিখোঁজ ছিলো।

আনজিমান পাড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকরা রোহিঙ্গাদের একজন মৃত গনি মিয়ার পুত্র মোঃ ইসমাইল (৬৫)। কোয়াইনদং গ্রামের এ বাসিন্দা জানান, “আরাকানে সহিংসতার পর থেকে তাদের বাজার বন্ধ রয়েছে। কোন কাজ কর্ম করতে দিচ্ছে না মগপ্রশাসন। বাড়ীতে খাদ্য ফুরিয়ে গেছে। পরিবারের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে অনেকদিন ধরে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছি। মগ সেনারা কোথাও দেখলে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়ীতে একপ্রকার অবরুদ্ধ হয়ে আছি। প্রতি মুহুর্ত আতংক আর প্রাণের ভয়। তাই এপাওে আসতে বাধ্য হয়েছি।”

তিনি আরো জানান, গত ৭ দিন যাবৎ পাহাড়ের ঢালা ও বিভিন্ন গ্রাম অতিক্রম করে সীমান্ত পাড়ি দিতে হয়েছে।

লাবাদক এলাকার বদর উদ্দিনের স্ত্রী রহিমা খাতুন (৪৫) জানান, ‘‘এক বিভিষীকাময় ও অবরুদ্ধ পরিবেশ থেকে উদ্ধার হয়ে খোলা আকাশে নীচে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছি। অর্ধাহারে অনাহারে হাঁটতে হাঁটতে শরীর ক্লান্ত ও ব্যথা হয়ে গেছে।”

সরেজমিন ঘুরে আরোও জানা যায়, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অবস্থা খুবই নাজুক ও মানবেতর। অনাহারে অর্ধাহাওে থেকে দূর্বল হয়ে পড়ছে তারা। শিশুরা হাঁউমাউ করে কান্না করছে। অনেকের সারা শরীর কাঁদাময়। হাতে একটা, কাঁধে একটা এবং পিঠে একটা বাচ্চা নিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করছে নারীরা। ঝুড়িতে বসিয়ে অচল বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের কাঁধে করে নিয়ে আসছে তাদের স্বজনরা। সীমান্তে এখন শরণার্থীদের ঢল। এক সাথে এক দিনে এত রোহিঙ্গা ইতিপূর্বে সীমান্ত অতিক্রম করেনি। এ মূহুর্তে তাদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

রাখাইনে উগ্র বৌদ্ধদের রোহিঙ্গা বিরোধী বিক্ষোভ

রাখাইনের জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সে দেশের সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রুৃখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এক প্রতিবাদ বিক্ষোভ আয়োজনের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেওয়া সু চির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেবেন না বলে হুঁশিয়ার করেছেন তারা।

রাখাইনে রোহিঙ্গাবিরোধী বিক্ষোভ ২০১৭ বৃহস্পতিবার রাতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে অং সান সু চি বলেন, রাখাইন থেকে পালিয়ে যাওয়া 'মানুষের' প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দুই বার এই বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সফল অতীতের উপর ভিত্তি করে আমরা তৃতীয়বারের মতো আলোচনা করছি।’ এর কয়েকদিনের মাথায় সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে আল জাজিরা জানায়, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে প্রতিদিন ১০০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনমন্ত্রী উইন মিয়াত আইয়ি আল জাজিরাকে জানান, যাদের পরিচয় মিয়ানমার সরকারের নথিতে থাকবে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। 

রাখাইন প্রদেশের রাজধানী সিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শত শত উগ্রবাদী। ২০১২ সালের সহিংসতার সময় এই সিত্তি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয় হাজার হাজার রোহিঙ্গা। তার আগ পর্যন্ত এই শহরটি ছিল রোহিঙ্গা অধ্যূষিত।বিক্ষোভের আয়োজনকারীদের একজন অং হুতাই। তিনি এএফপিকে বলেন, মিয়ানমারের যে কোনও নাগরিককে তারা রাখাইনে স্বাগত জানাবেন। তবে নাগরিক হওয়ার অধিকার যাদের নেই, তাদের নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কোনভাবেই বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার নব্বই দশকের যে চুক্তিকে উপজীব্য করতে চাইছে, তাতে একটুও ভরসা দেখছেন না শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা। অতীতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে রাখাইনে ফিরে গিয়েছিলেন, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়বারের মতো আসা এমন রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরে যাওয়ার কথা শুনলেই অতীত স্মৃতিতে ‘বিভীষিকার চিহ্ন’ দেখছেন। জাতিগত নিধনযজ্ঞ আর মানবতাবিরোধী অপরাধের দুঃস্বপ্ন নিয়ে পুড়ে যাওয়া গ্রামে ফিরে কী করবেন, এমন প্রশ্ন অনেকের মনে।

চুক্তিকে উপজীব্য করে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়েছে, তাতে যাচাইবাছাইয়ের ক্ষেত্রে বৈধ প্রমাণপত্র হাজিরের শর্ত আছে। পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ফেলে স্রেফ জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন: বৈধ-অবৈধ পরের প্রশ্ন; কাগজপত্র কোথায় পাবে তারা?

কেবল রোহিঙ্গারা নয়, এরইমধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিয়ানমারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নীতিতে নিজেদের আস্থাহীনতার কথা জানিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে ভয়ঙ্কর মানবাধিকার হরণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে জোর করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে ফেরত পাঠানো উচিৎ হবে না বলে মনে করছে সংস্থাটি। জোরপ্র্বূক যেন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো না হয়, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে এই সংস্থা।

রাখাইনে উগ্র বৌদ্ধদের রোহিঙ্গা বিরোধী বিক্ষোভ

রাখাইনের জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সে দেশের সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রুখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এক প্রতিবাদে বিক্ষোভ আয়োজনের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেওয়া সু চির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেবেন না বলে হুঁশিয়ার করেছেন তারা।

রাখাইনে রোহিঙ্গাবিরোধী বিক্ষোভ২০১৭ বৃহস্পতিবার রাতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে অং সান সু চি বলেন, রাখাইন থেকে পালিয়ে যাওয়া 'মানুষের' প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দুই বার এই বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সফল অতীতের উপর ভিত্তি করে আমরা তৃতীয়বারের মতো আলোচনা করছি।’ এর কয়েকদিনের মাথায় সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে আল জাজিরা জানায়, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে প্রতিদিন ১০০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনমন্ত্রী উইন মিয়াত আইয়ি আল জাজিরাকে জানান, যাদের পরিচয় মিয়ানমার সরকারের নথিতে থাকবে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। 

রাখাইন প্রদেশের রাজধানী সিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শত শত উগ্রবাদী। ২০১২ সালের সহিংসতার সময় এই সিত্তি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয় হাজার হাজার রোহিঙ্গা। তার আগ পর্যন্ত এই শহরটি ছিল রোহিঙ্গা অধ্যূষিত।বিক্ষোভের আয়োজনকারীদের একজন অং হুতাই। তিনি এএফপিকে বলেন, মিয়ানমারের যে কোনও নাগরিককে তারা রাখাইনে স্বাগত জানাবেন। তবে নাগরিক হওয়ার অধিকার যাদের নেই, তাদের নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কোনভাবেই বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার নব্বই দশকের যে চুক্তিকে উপজীব্য করতে চাইছে, তাতে একটুও ভরসা দেখছেন না শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা। অতীতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে রাখাইনে ফিরে গিয়েছিলেন, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়বারের মতো আসা এমন রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরে যাওয়ার কথা শুনলেই অতীত স্মৃতিতে ‘বিভীষিকার চিহ্ন’ দেখছেন। জাতিগত নিধনযজ্ঞ আর মানবতাবিরোধী অপরাধের দুঃস্বপ্ন নিয়ে পুড়ে যাওয়া গ্রামে ফিরে কী করবেন, এমন প্রশ্ন অনেকের মনে।

চুক্তিকে উপজীব্য করে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়েছে, তাতে যাচাইবাছাইয়ের ক্ষেত্রে বৈধ প্রমাণপত্র হাজিরের শর্ত আছে। পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ফেলে স্রেফ জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন: বৈধ-অবৈধ পরের প্রশ্ন; কাগজপত্র কোথায় পাবে তারা?

কেবল রোহিঙ্গারা নয়, এরইমধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিয়ানমারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নীতিতে নিজেদের আস্থাহীনতার কথা জানিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে ভয়ঙ্কর মানবাধিকার হরণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে জোর করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে ফেরত পাঠানো উচিৎ হবে না বলে মনে করছে সংস্থাটি। জোরপূবক যেন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো না হয়, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে এই সংস্থা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ